অনেকেই অ্যালার্ম ছাড়া ঘুম থেকে উঠতে পারেন না। রাতে দেরি করে ঘুমানো, বিছানায় যাওয়ার আগে দীর্ঘসময় ফোন ব্যবহার এবং অনিয়মিত জীবনযাপনের কারণে নির্দিষ্ট সময়ে স্বাভাবিকভাবে ঘুম থেকে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে, ঘুমের কিছু অভ্যাস ঠিক করা গেলে শরীরের নিজস্ব ‘অ্যালার্ম ঘড়ি’কে ধীরে ধীরে সক্রিয় করা সম্ভব।
নিজের ঘুমের ছন্দ বুঝতে হবে
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথমেই বুঝতে হবে নিজের শরীরের কতক্ষণ ঘুম প্রয়োজন। সাধারণভাবে একজন প্রাপ্তবয়স্কের ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। তবে, কারও ৭ ঘণ্টা ঘুমই যথেষ্ট, আবার কারও ৯ ঘণ্টাও প্রয়োজন হতে পারে।
প্রয়োজনীয় ঘুমের সময় বুঝে প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ওঠার অভ্যাস করতে হবে। নিয়মিত রুটিন শরীরের জৈবঘড়িকে নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।
সকালের আলো গুরুত্বপূর্ণ
শরীরের ঘুম ও জাগরণের ছন্দ নিয়ন্ত্রণে আলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ঘুম থেকে ওঠার পরপরই পর্দা খুলে প্রাকৃতিক আলো ঘরে ঢুকতে দেওয়া বা কিছুক্ষণ বাইরের আলোতে থাকা শরীর ও মনের জন্য উপকারী। সকালের আলো শরীরকে দিনের শুরু সম্পর্কে সংকেত দেয় এবং জেগে ওঠার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করে।
ঘুমানোর আগের রুটিনমাফিক কাজ
ঘুমানোর এক থেকে দুঘণ্টা আগে ঘরের আলো কমিয়ে শান্ত পরিবেশ তৈরি করুন। এতে শরীর ঘুমের প্রস্তুতি নিতে পারে। ঘুমের আগে পোশাক বদলানো, দাঁত ব্রাশ করা, ত্বকের যত্ন নেওয়ার মতো কাজগুলো নির্দিষ্ট রুটিনে করলে শরীরও ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে যে এবার ঘুমের সময়।
ঘরের তাপমাত্রাও আরামদায়ক রাখা দরকার। রাতে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবেই কমে আসে। অতিরিক্ত গরম পরিবেশে ঘুমাতে বা ঘুম ধরে রাখতে সমস্যা হতে পারে।
ফোন থেকে দূরে থাকতে হবে
ঘুমের অন্যতম বড় বাধা স্মার্টফোন। ফোনের নীল আলো রাতে মস্তিষ্কে দিনের আলোর মতো সংকেত দিতে পারে। তবে শুধু আলো নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘসময় স্ক্রল করার অভ্যাসও ঘুমের ক্ষতি করে। তাই ঘুমের আগে ফোন ব্যবহার কমানো জরুরি। প্রয়োজনে অ্যাপ ব্যবহারে সীমা নির্ধারণ করা বা ফোনের ডিসপ্লে সাদাকালো করে রাখা যেতে পারে। এতে ফোনের প্রতি আকর্ষণ কিছুটা কমে।
এ ছাড়া প্রতিদিন একই সময়ে খাবার খাওয়া, ঘুমানোর অন্তত ৩ ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করা এবং ঘুমের আগে অ্যালকোহল এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। অ্যালকোহল দ্রুত ঘুম আনলেও পরে ঘুমের মান নষ্ট করতে পারে।
এক সপ্তাহের পরীক্ষায় যা দেখা গেল
পুরস্কারজয়ী লেখক ও সাংবাদিক অ্যালি হির্শল্যাগ নিজের ওপর এক সপ্তাহের পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন, নিয়মিত রুটিন মেনে চললে অ্যালার্মের ওপর নির্ভরতা কমানো যায় কি না।
প্রথম রাতে তিনি রাত সাড়ে ১১টার মধ্যে ঘুমানোর লক্ষ্য নিলেও ঘুম আসতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। দ্বিতীয় রাতেও একই সময়ে ঘুমাতে যান। তৃতীয় রাতে রাত ১১টার দিকে ঘুমিয়ে সকাল ৭টা ১০ মিনিটে স্বাভাবিকভাবেই ঘুম ভেঙে যায়। চতুর্থ রাতে মধ্যরাতের আগেই ঘুমিয়ে পড়েন এবং সকালে দরজার ঘণ্টায় ঘুম ভাঙে। পরে আরও এক ঘণ্টা ঘুমান।
পঞ্চম রাতে সাড়ে ১১টায় ঘুমিয়ে সকাল ৮টা ১২ মিনিটে ওঠেন। ষষ্ঠ রাতে জন্মদিনের কারণে সাড়ে ১২টায় ঘুমাতে গেলেও সকাল ৯টায় ঘুম ভাঙে। সপ্তম রাতে সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে সহজেই ঘুমিয়ে পড়েন এবং পরদিন সকাল ৮টা ৫ মিনিটে অ্যালার্ম ছাড়াই ঘুম ভাঙে।
পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরও প্রায় একই সময়ে তার ঘুম ভাঙতে থাকে। তিনি নিয়মিত খাবারের সময় এবং ঘুমের আগে ফোন ব্যবহারের অভ্যাস নিয়ন্ত্রণে রাখেন। পরে দেখেন, অন্তত ৮ ঘণ্টা ঘুম হলে অ্যালার্ম ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে ঘুম থেকে উঠতে পারছেন।
ধীরে ধীরে অভ্যাস বদলাতে হবে
অ্যালি হির্শল্যাগের অভিজ্ঞতায় তার শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি পুরোপুরি নিখুঁত হয়ে যায়নি। তবে, নিয়মিত ঘুমের সময় এবং রাতে স্ক্রিন ব্যবহার কমানো সবচেয়ে বেশি কাজে দিয়েছে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘুম বিশেষজ্ঞ হেলেন বার্গেসের মতে, জৈবঘড়ির ছন্দ খুব দ্রুত পরিবর্তন করা যায় না। তাই প্রতিদিন ঘুমানো ও ওঠার সময় প্রায় আধা ঘণ্টা করে এগিয়ে এনে ধীরে ধীরে কাঙ্ক্ষিত সময়ে পৌঁছানো উচিত।
সময়ের আলো/মহু