কথা বলতে বলতে হঠাৎ মেজাজ খারাপ হয়ে যাওয়া, সামান্য বিষয়ে বিরক্তি প্রকাশ কিংবা কাছের মানুষের ওপর অপ্রত্যাশিতভাবে রেগে যাওয়া- এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অনেক নারীর জীবন চলছে। অনেক সময় নিজের কাছেও মনে হয়, ‘এতটুকু ঘটনায় এত রাগ হলো কেন?’ বিষয়টি শুধু স্বভাব বা মেজাজের ব্যাপার নয়। এর পেছনে থাকতে পারে মানসিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি, শারীরিক ক্লান্তি, হরমোনের পরিবর্তন কিংবা দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভিমান।
জমে থাকা মানসিক চাপ
নারীর দৈনন্দিন জীবনে একসঙ্গে অনেক দায়িত্ব সামলাতে হয়। সংসার, সন্তান, কর্মক্ষেত্র, পড়াশোনা কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের দেখাশোনার চাপ ধীরে ধীরে মানসিক ক্লান্তি তৈরি করতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে চাপের মধ্যে থাকলে ধৈর্য কমে যায়। তখন ছোট কোনো ঘটনাও বড় বিরক্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। ব্যাংক কর্মকর্তা ফারজানা আইরিন বলেন, অনেক সময় রাগ মূল সমস্যা নয়, বরং অন্য কোনো অস্বস্তির বহিঃপ্রকাশ। দুশ্চিন্তা, হতাশা, মানসিক ক্লান্তি বা নিজের প্রয়োজনকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করার ফল হিসেবেও রাগ প্রকাশ পেতে পারে।
হরমোনের পরিবর্তন
নারীর জীবনে বিভিন্ন পর্যায়ে হরমোনের ওঠানামা মেজাজে প্রভাব ফেলতে পারে। মাসিকের আগে অনেকের মধ্যে খিটখিটে মেজাজ, অস্থিরতা বা আবেগের ওঠানামা দেখা যায়। গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মের পরের সময় এবং মেনোপজের সময়ও হরমোনের পরিবর্তনের কারণে ঘুম, মন-মেজাজ ও আবেগে পরিবর্তন আসতে পারে।
ঘুমের অভাব ও ক্লান্তি
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে যারা রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না বা দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ক্লান্তিতে ভোগেন, তাদের মধ্যে বিরক্তি ও রাগের প্রবণতা বাড়তে পারে। ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত খাবার না খাওয়া, শরীরে পানিশূন্যতা কিংবা অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণও অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
অব্যক্ত অভিমান
অনেক নারী নিজের কষ্ট বা চাহিদা সরাসরি প্রকাশ না করে চুপ করে থাকেন। বারবার নিজের অনুভূতি চেপে রাখলে তা একসময় ক্ষোভে পরিণত হতে পারে। ফলে সামান্য কোনো ঘটনায় হঠাৎ বড় ধরনের রাগ প্রকাশ পায়। পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতার অভাব, মূল্যায়ন না পাওয়া কিংবা ব্যক্তিগত সময়ের অভাবও এই ক্ষোভ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
গণমাধ্যমকর্মী তাসলিমা বেগম বলেন, আমি হাসিখুশি থাকতে পছন্দ করি। কিন্তু যখন কেউ বিনা কারণে আমাকে আঘাত দিয়ে কথা বলে তখনই আমার মেজাজ গরম হয়ে যায়। খুব রাগ ওঠে। সে সময় আমি রেগে যাই এবং একদম চুপ হয়ে থাকি।
কী করবেন
হঠাৎ রেগে গেলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে কিছুক্ষণ নিজেকে সময় দেওয়া ভালো। গভীর শ্বাস নেওয়া, পানি পান করা, কিছুক্ষণ হাঁটা বা পরিস্থিতি থেকে সাময়িকভাবে দূরে সরে যাওয়া উপকারী হতে পারে। নিয়মিত ঘুম, পরিমিত খাবার, শারীরিক সক্রিয়তা এবং নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখাও জরুরি। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. রাশেদুল হক বলেন, ‘রাগ মানুষের স্বাভাবিক আবেগ। কিন্তু কখন, কেন এবং কীভাবে রাগ হচ্ছে, সেটি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
বারবার অল্প বিষয়ে অতিরিক্ত রেগে যাওয়া, রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা কিংবা রাগের কারণে সম্পর্ক ও দৈনন্দিন কাজে সমস্যা তৈরি হলে বিষয়টিকে অবহেলা করা উচিত নয়। নিজের অনুভূতিকে চেপে না রেখে কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলা উচিত।’
রাগকে তাই শুধু ‘মেজাজ খারাপ’ বলে এড়িয়ে না গিয়ে এর পেছনের কারণ বোঝা দরকার। কখনো এটি বিশ্রামের প্রয়োজনের সংকেত, কখনো মানসিক চাপের বহিঃপ্রকাশ, আবার কখনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সাহায্য নেওয়াই সুস্থভাবে আবেগ সামলানোর প্রথম ধাপ।
সময়ের আলো/মহু