এক দিনের খাবারে বিষক্রিয়া। কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন ভোগান্তির পর সাধারণত মানুষ সুস্থ হয়ে ওঠে। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে গল্পটা এত সহজ নয়। কারও কারও ক্ষেত্রে সেই সংক্রমণ সেরে যাওয়ার পরও পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া কিংবা কখনো কখনো কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর চলতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে বলা হয় পোস্ট-ইনফেকশন ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম অর্থাৎ কোনো অন্ত্রের সংক্রমণের পর দেখা দেওয়া আইবিএস। গবেষকদের ধারণা, অন্ত্রের একটি সংক্রমণ শুধু সাময়িকভাবে হজমের গোলযোগ ঘটায় না; কোনো কোনো মানুষের ক্ষেত্রে তা অন্ত্রের জীবাণুসমাজ, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, অন্ত্রের আবরণ এবং স্নায়ুতন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
বিষক্রিয়ার পর নতুন সমস্যা :
একটি অন্ত্রের সংক্রমণের পর অন্তত প্রতি ১০ জনে একজনের মধ্যে পোস্ট-ইনফেকশন আইবিএস দেখা দিতে পারে বলে কিছু গবেষণায় ধারণা করা হয়েছে। পরজীবী ও ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের পর এর ঝুঁকি ভাইরাসজনিত সংক্রমণের তুলনায় বেশি বলে মনে করা হয়।
এসব জীবাণুর সংক্রমণের পর দীর্ঘস্থায়ী অন্ত্রের সমস্যার সম্পর্ক সবচেয়ে ভালোভাবে নথিবদ্ধ হয়েছে। তবে কোন ব্যক্তি সংক্রমণের পর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবেন আর কার ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা তৈরি হবে, তার উত্তর এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি।
এমনকি আইবিএস ছাড়াও সংক্রমণের পর কারও কারও ফাংশনাল ডিসপেপসিয়া হতে পারে। এতে পেটের ওপরের দিকে ব্যথা, অল্প খাবারেই পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি কিংবা খাওয়ার পর অস্বস্তিকর ভারী লাগার মতো উপসর্গ দেখা দেয়।
অন্ত্রের ভেতরের ‘জীবাণুসমাজ’ যেভাবে বদলে যায় :
আমাদের অন্ত্রে কোটি কোটি অণুজীব বসবাস করে। এদের সম্মিলিতভাবে বলা হয় গাট মাইক্রোবায়োম। হজম, রোগপ্রতিরোধ এবং অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে এদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কোনো সংক্রমণ এই অণুজীবসমাজকে অনেকটা ঝড়ের মতো এলোমেলো করে দিতে পারে।
সাধারণত কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মাইক্রোবায়োম আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। কিন্তু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে হারিয়ে যাওয়া অণুজীবের সব আর ফিরে আসে না। গবেষকরা মনে করছেন, এই পরিবর্তন পরবর্তীতে অন্ত্রে নানা ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ অন্ত্রের কিছু ব্যাকটেরিয়া কমে গেলে প্রোটিন ভাঙার সঙ্গে যুক্ত কিছু এনজাইমের কার্যকলাপ বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে অন্ত্রের স্বাভাবিক পরিবেশ আরও বদলে যেতে পারে।
রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থারও ভূমিকা আছে :
আরেকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো— সংক্রমণ চলে যাওয়ার পরও শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে না। গবেষণায় কিছু রোগীর অন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ী, মৃদু প্রদাহের লক্ষণ পাওয়া গেছে। কোথাও সংক্রমণের বিরুদ্ধে কাজ করা কিছু কোষের সংখ্যা বেড়েছে, কোথাও কমেছে। আবার প্রদাহ নিয়ন্ত্রণকারী বিভিন্ন রাসায়নিক সংকেতও স্বাভাবিক ছন্দ হারাতে পারে। অর্থাৎ জীবাণুটি শরীর থেকে চলে গেলেও তার বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া প্রতিরোধ-প্রতিক্রিয়ার কিছু প্রভাব হয়তো থেকে যেতে পারে।
ব্যথা কি আসলে অন্ত্রের অতিসংবেদনশীলতার ফল? :
অন্ত্র শুধু খাবার হজম করে না; সেখানে অসংখ্য স্নায়ুও রয়েছে, যা অন্ত্রের নড়াচড়া ও ব্যথার অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষকদের একটি ধারণা হলো, সংক্রমণের পর এই স্নায়ুতন্ত্রে পরিবর্তন ঘটতে পারে। ফলে অন্ত্রের স্বাভাবিক নড়াচড়াও অস্বাভাবিকভাবে ব্যথাদায়ক মনে হতে পারে।
সাধারণত অন্ত্রের পেশির ছন্দময় সংকোচন— যাকে পেরিস্টালসিস বলা হয়, আমরা টেরই পাই না। কিন্তু পোস্ট-ইনফেকশন আইবিএস আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে সেই স্বাভাবিক নড়াচড়াই ব্যথা হিসেবে অনুভূত হতে পারে।
তা হলে কি সমস্যাটা মস্তিষ্কেও? :
এখানেই বিজ্ঞানীদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে। এই গাট-ব্রেইন অ্যাক্সিস বা অন্ত্র-মস্তিষ্ক সংযোগের মাধ্যমে অন্ত্রের সংকেত মস্তিষ্কে যায়, আবার মস্তিষ্কের মানসিক অবস্থা অন্ত্রের কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, কেউ সংক্রমণের সময় উদ্বেগ বা বিষণ্নতায় ভুগলে পরবর্তীতে দীর্ঘস্থায়ী অন্ত্রের সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর অর্থ এই নয় যে রোগীর উপসর্গ ‘মনের ভুল’। বরং মস্তিষ্ক অন্ত্র থেকে আসা সংকেতকে কীভাবে প্রক্রিয়া করছে, সেটিও উপসর্গের তীব্রতা ও স্থায়িত্বে ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে কিছু গবেষক মনে করেন, মূল সমস্যার সূত্রপাত অন্ত্রেই— মস্তিষ্ক পরে সেই সংকেতের প্রভাব অনুভব করে। বাস্তবে দুটি ব্যাখ্যা একে অন্যের বিরোধী না-ও হতে পারে। সংক্রমণ অন্ত্রে সমস্যার সূচনা করতে পারে, আর মস্তিষ্ক সেই সমস্যার অনুভূতি ও স্থায়িত্বকে প্রভাবিত করতে পারে।
কেন একজনের হয়, অন্যজনের হয় না? এটাই এখনও সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি। একই ধরনের খাবার খেয়ে বা একই সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েও একজন কয়েক দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান, অথচ অন্যজন বছরের পর বছর পেটের সমস্যায় ভুগতে পারেন।
সম্ভবত এর পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করে— অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের পরিবর্তন, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া, অন্ত্রের আবরণের দুর্বলতা, স্নায়ুর অতিসংবেদনশীলতা এবং মস্তিষ্কের সঙ্গে অন্ত্রের যোগাযোগ। তাই পোস্ট-ইনফেকশন আইবিএসকে একটি একক রোগ হিসেবে না দেখে বিভিন্ন ধরনের অন্তর্নিহিত প্রক্রিয়ার সমষ্টি হিসেবেও দেখা হতে পারে।
যেভাবে চিকিৎসা নিতে হবে :
বর্তমানে পোস্ট-ইনফেকশন আইবিএসের চিকিৎসা সাধারণত আইবিএসের অন্যান্য ধরনের চিকিৎসার মতোই করা হয়। তবে গবেষকরা এই বিশেষ রোগীদের জন্য আরও নির্দিষ্ট চিকিৎসা খুঁজছেন। কিছু গবেষণায় অন্ত্রের জীবাণুসমাজ পরিবর্তনের জন্য নির্দিষ্ট দাতার কাছ থেকে ফিকাল ট্রান্সপ্লান্ট বা মল প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। আবার একটি গবেষণায় গ্লুটামিন গ্রহণে উপসর্গ কমার এবং অন্ত্রের আবরণ শক্তিশালী হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
অন্ত্রনির্ভর হিপনোসিসও কিছু রোগীর ব্যথা কমাতে সাহায্য করতে পারে। ডায়রিয়াসহ আইবিএসের জন্য ব্যবহৃত রিফ্যাক্সিমিন নামের অ্যান্টিবায়োটিকও কিছু ক্ষেত্রে দেওয়া হয়। তবে এসব চিকিৎসা সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর— এমন সিদ্ধান্তে এখনও পৌঁছানো যায়নি।
আশার জায়গাও আছে :
দীর্ঘদিন ধরে পেটের সমস্যায় ভোগা মানুষের জন্য হয়তো সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক তথ্য হলো— সময় অনেক ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে। একটি আট বছরব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, সংক্রমণের পর আইবিএসে আক্রান্ত প্রায় অর্ধেক মানুষ পরবর্তী সময়ে আর রোগটির নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করেননি। অর্থাৎ সবার ক্ষেত্রে এই সমস্যা আজীবন থাকে না। তবে অন্যদের ক্ষেত্রে উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাই খাবারে বিষক্রিয়ার পর ডায়রিয়া বা পেটের অস্বস্তি সাময়িকভাবে সেরে গেলেও যদি বারবার পেট ব্যথা, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য বা খাওয়ার পর অস্বস্তি ফিরে আসে, বিষয়টিকে একেবারে উপেক্ষা করা ঠিক নয়।
একবারের খাদ্য বিষক্রিয়া, দীর্ঘদিনের প্রভাব :
খাবারে বিষক্রিয়াকে আমরা সাধারণত কয়েক দিনের একটি দুর্ভোগ হিসেবেই দেখি। কিন্তু গবেষণা বলছে, কিছু মানুষের শরীরে সেই সংক্রমণের প্রভাব অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। কোনো একটি জীবাণুকে দায়ী করে পুরো ঘটনাটি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। বরং অন্ত্রের জীবাণুসমাজ, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, অন্ত্রের আবরণ, স্নায়ু এবং মস্তিষ্ক— সব মিলিয়েই হয়তো তৈরি হয় এই জটিল সমস্যা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি