বেশি জেলা ঘোরা হয়নি বলে মন খারাপ না করে নতুন পরিকল্পনা সাজান। ছবি : এআই
ফেসবুক খুললেই চোখে পড়ছে বাংলাদেশের মানচিত্র। কোথাও কয়েকটি জেলা রঙিন, কোথাও অর্ধেকের বেশি দেশজুড়ে ছড়িয়ে আছে ভ্রমণের চিহ্ন। আবার কারও ম্যাপে দেখা যাচ্ছে ৬৪ জেলার প্রায় সবই ঘোরা শেষ। নিজের ভ্রমণ অভিজ্ঞতার হিসাব দিতে তৈরি করা এসব ‘ট্রাভেল ম্যাপ’ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ সাড়া ফেলেছে। কিন্তু সবার এত ঘোরাঘুরির চিত্র দেখে নিজের ম্যাপের দিকে তাকিয়ে অনেকেরই হয়ত মনে হচ্ছে, ‘ইশ, এত কম জায়গা ঘুরেছি!’ এতে শুরু হতে পারে এক ধরনের আফসোস কিংবা নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা।
কিন্তু সত্যিই কি কম জেলা ঘোরা মানে কম ভ্রমণ? একেবারেই নয়। বরং এই ট্রেন্ডকে নিজের সঙ্গে অন্যের প্রতিযোগিতা না বানিয়ে নতুন করে বাংলাদেশকে চেনার একটি সুযোগ হিসেবে দেখাই হতে পারে সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার।
ফেসবুক খুললেই চোখে পড়ছে বাংলাদেশের মানচিত্র। ছবি : সংগৃহীত
৬৪ জেলার হিসাব কেন হঠাৎ এত আকর্ষণীয়?
বাংলাদেশ ছোট আয়তনের দেশ হলেও বৈচিত্র্যে ভীষণ সমৃদ্ধ। একই দেশের মধ্যে রয়েছে পাহাড়, সমুদ্র, হাওর, নদী, বন, প্রত্নস্থাপনা, জমিদারবাড়ি, মসজিদ-মন্দির, চা-বাগান, চরাঞ্চল ও অসংখ্য গ্রামীণ জনপদ। ফলে, ‘আমি বাংলাদেশের কতটা দেখেছি?’-এই প্রশ্নটির একটি দৃশ্যমান উত্তর পাওয়া বেশ আনন্দের।
সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া অনলাইন ট্রাভেল ম্যাপে ৬৪ জেলার মধ্যে যে জেলাগুলো ঘোরা হয়েছে, সেগুলো নির্বাচন করলেই ব্যক্তিগত ভ্রমণ মানচিত্র তৈরি হচ্ছে। কোনো কোনো প্ল্যাটফর্মে জেলা নির্বাচনের পর মোট হিসাব, যেমন ১০/৬৪ বা ৩০/৬৪, দেখানোর পাশাপাশি ম্যাপটি পিএনজি, জেপিজি কিংবা পিডিএফ হিসেবেও সংরক্ষণ করা যাচ্ছে।
কিন্তু আপনার ম্যাপে যদি রং কম থাকে?
ধরা যাক, অন্য একজনের ম্যাপে ৪০টি জেলা রঙিন। আপনার ম্যাপে মাত্র ৮টি। মন খারাপ করার মতো কিছু কি ঘটেছে? না। কারণ, ভ্রমণের সৌন্দর্য সংখ্যায় মাপা যায় না।
একজন মানুষ হয়ত চাকরির কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। কেউ আবার পড়াশোনা, পরিবার, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা কিংবা সময়ের অভাবে নিজের জেলার বাইরেই খুব কম যেতে পেরেছেন।
কেউ হয়ত ২০টি জেলা ঘুরেছেন, কিন্তু প্রতিটি জায়গায় দু-তিন দিন করে থেকেছেন। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন, খাবার খেয়েছেন, নদীর পাড়ে বসেছেন, গ্রামের পথে হেঁটেছেন। অন্যদিকে কেউ হয়তো ৫০টি জেলা ঘুরেছেন, কিন্তু অধিকাংশ জায়গাই দেখেছেন কয়েক ঘণ্টার জন্য। দুজনের অভিজ্ঞতা তাই একই ধরনের নয়।
আপনার ম্যাপে যেসব জেলা রঙিন হয়নি, সেগুলোকে ব্যর্থতার চিহ্ন হিসেবে দেখার দরকার নেই। বরং সেগুলোই হতে পারে আপনার পরবর্তী ভ্রমণের তালিকা।
ধরা যাক, আপনার ম্যাপে সিলেট, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও ঢাকা রঙিন। তাহলে, এবার নতুন করে বেছে নিতে পারেন- পাহাড় দেখতে বান্দরবান বা খাগড়াছড়ি, হাওরের স্বাদ নিতে কিশোরগঞ্জ বা সুনামগঞ্জ, ইতিহাসের খোঁজে বাগেরহাট বা রাজশাহী, নদী ও গ্রামীণ প্রকৃতির জন্য বরিশাল কিংবা ভোলা, উত্তরের প্রকৃতি দেখতে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও বা দিনাজপুর এবং ময়মনসিংহ বিভাগের প্রকৃতি ও সংস্কৃতি দেখতে ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা বা শেরপুর।
৬৪ জেলার ভ্রমণ গাইডগুলোতেও একেক জেলার জন্য আলাদা আলাদা দর্শনীয় স্থান ও ভ্রমণ পরিকল্পনার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ, আপনার ‘বাকি’ জেলাগুলো আসলে আপনার ভবিষ্যৎ ভ্রমণের সম্ভাবনা।
একসঙ্গে ৬৪ জেলা ঘোরার দরকার নেই
ট্রাভেল ম্যাপ দেখে অনেকে হয়ত মনে করতে পারেন, ‘আমাকেও দ্রুত ৬৪ জেলা শেষ করতে হবে।’ এই মানসিকতাই বরং ভ্রমণের আনন্দ নষ্ট করতে পারে।
৬৪ জেলা কোনো পরীক্ষার সিলেবাস নয়। এক বছরে ১০টি জেলা ঘুরতে পারলে ১০টিই যথেষ্ট। দুই বছরে ১৫টি হলে সেটিও দারুণ। বরং ছোট ছোট লক্ষ্য তৈরি করতে পারেন।
প্রথম লক্ষ্য : নিজের বিভাগের সব জেলা।
দ্বিতীয় লক্ষ্য : কাছাকাছি বিভাগের কয়েকটি জেলা।
তৃতীয় লক্ষ্য : বছরে অন্তত ৪-৬টি নতুন জেলা।
এভাবে পাঁচ বছরে ২০-৩০টি নতুন জেলা দেখা সম্ভব, কোনো তাড়াহুড়া ছাড়াই।
ভ্রমণের সময় শুধু ‘এই জেলায় গিয়েছি’-এটুকু মনে রাখার চেয়ে আরও কিছু সংরক্ষণ করুন। প্রতিটি নতুন জেলার জন্য রাখতে পারেন ৫টি জিনিস- জেলার সবচেয়ে মনে রাখার মতো মুহূর্তটির ছবি সংরক্ষণ করুন। একটি স্থানীয় খাবার কোথায় খেয়েছেন, কেমন লেগেছে, সেটিও লিখে রাখুন। ভ্রমণের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি অনেক সময় কোনো দর্শনীয় স্থান নয়, একজন মানুষের সঙ্গে কয়েক মিনিটের কথোপকথন। তাই একজন স্থানীয় মানুষের গল্প লিখে রাখুন। গুগলে বা ফেসবুকে বহুল পরিচিত নয়, এমন কোনো অচেনা জায়গার কথা লিখে রাখুন। একটি বাক্যে অভিজ্ঞতা লিখুন। যেমন-‘এই জেলায় গিয়ে প্রথমবার ভোরের কুয়াশায় নৌকায় উঠেছিলাম।’
কয়েক বছর পর আপনার ভ্রমণ ম্যাপ তখন শুধু রঙিন একটি ছবি থাকবে না, প্রতিটি জেলার সঙ্গে যুক্ত থাকবে একটি করে স্মৃতি।
ভ্রমণের বাজেট কম? তাতেও সমস্যা নেই
অনেকেরই ভ্রমণের ইচ্ছা আছে, কিন্তু বড় বাজেট নেই। সেক্ষেত্রে দূরের গন্তব্য দিয়ে শুরু করার প্রয়োজন নেই। নিজের শহরের কাছাকাছি জেলা দিয়ে শুরু করুন। একদিনের ছোট ভ্রমণও হতে পারে চমৎকার অভিজ্ঞতা।
এছাড়া, বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে যাতায়াতের খরচ কমানো যায়। গণপরিবহন ব্যবহার করা যায়। বিলাসবহুল হোটেলের বদলে নিরাপদ ও সাধারণ থাকার ব্যবস্থা বেছে নেওয়া যায়। তবে, বাজেট কমানোর নামে নিরাপত্তা বা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির সঙ্গে আপস করা ঠিক নয়।
ট্রেন্ডটি আপনাকে একটি ভালো প্রশ্ন করতে পারে। ‘অন্যরা কত জেলা ঘুরেছে?’-এই প্রশ্নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে ‘আমি পরেরবার কোথায় যেতে চাই?’ এই একটি প্রশ্নই আপনার ভ্রমণের মানসিকতা বদলে দিতে পারে।
আজ আপনার ম্যাপে হয়ত ৬৪টির মধ্যে মাত্র ৫টি জেলা রঙিন। কাল সেটি ৬ হবে। এক বছর পর ১২। কয়েক বছর পর হয়ত ২৫। কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় বিষয় হলো, এই প্রতিটি রঙের সঙ্গে যোগ হবে আপনার জীবনের একটি নতুন গল্প।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা সাধারণত মানুষের ভ্রমণের সেরা মুহূর্তটাই দেখি। সমুদ্রের সামনে হাসিমুখের ছবি দেখি, পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ানো ছবি দেখি, সুন্দর রিসোর্ট দেখি। দেখি না সেই ভ্রমণের জন্য কতদিন টাকা জমাতে হয়েছে, কত ছুটি নিতে হয়েছে, কত পরিকল্পনা করতে হয়েছে। তাই অন্যের ৫০/৬৪ দেখে নিজের ৮/৬৪ কে ছোট মনে করার কোনো কারণ নেই। কারও ভ্রমণ শুরু হয়েছে ১০ বছর আগে। আপনারটা হয়ত শুরু হচ্ছে আজ।
আজই বানিয়ে ফেলুন নিজের ম্যাপ
এই ট্রেন্ডের সবচেয়ে মজার দিক হলো, নিজের ঘোরা জেলাগুলোর হিসাব একবার চোখের সামনে দেখলে অনেক পুরনো স্মৃতিও ফিরে আসে। কোন জেলায় প্রথম গিয়েছিলেন, কোন জেলায় পরিবারের সঙ্গে গিয়েছিলেন, কোন জেলায় বন্ধুদের সঙ্গে রাতভর বাসযাত্রা করেছিলেন, কোথায় গিয়ে সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছিল কিংবা কোন জেলাটি এখনো আপনার ‘ড্রিম ডেস্টিনেশন’?
ফাঁকা জায়গাগুলো নিয়েই তো ভবিষ্যৎ
একটি ভ্রমণ ম্যাপে সবচেয়ে সুন্দর অংশ হয়ত রঙিন জেলাগুলো নয়, বরং ফাঁকা জেলাগুলো। কারণ, রঙিন জায়গাগুলো অতীতের গল্প বলে। আর ফাঁকা জায়গাগুলো বলে-‘এখানে এখনো যাওয়া হয়নি।’ তাই আপনার ম্যাপে যদি অনেক জেলা সাদা পড়ে থাকে, মন খারাপ করবেন না। বরং একটি ব্যাগ গোছানোর পরিকল্পনা করুন। ক্যালেন্ডারে একটি ছুটির দিন চিহ্নিত করুন। বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে কথা বলুন। কাছের কোনো নতুন জেলা দিয়ে শুরু করুন। হয়ত আপনার পরের ভ্রমণ খুব দূরের কোনো পাহাড়ে নয়, নিজের দেশের এমন একটি জেলায়, যার নাম এতদিন শুধু মানচিত্রেই দেখেছেন। একদিন যখন সেই জেলাটিও আপনার ম্যাপে রঙিন হবে, তখন বুঝবেন- ভ্রমণের আসল আনন্দ ৬৪/৬৪ পূরণ করায় নয়; প্রতিটি নতুন রঙের সঙ্গে নিজের জীবনে একটি নতুন গল্প যোগ করায়।