সুনামিতে নিখোঁজ স্ত্রী, স্বামীর ১৫ বছরের সমুদ্রযাত্রা

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

২০১১ সালের ভয়াল সুনামি কেড়ে নিয়েছিল তার স্ত্রীকে। সাগরের বুকে হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষটির মরদেহও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু

2026-11-05T12:54:32+00:00
2026-11-05T12:59:01+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬,
২১ কার্তিক ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
ফিচার
সুনামিতে নিখোঁজ স্ত্রী, স্বামীর ১৫ বছরের সমুদ্রযাত্রা
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম  আপডেট: ০৫.১১.২০২৬ ১২:৫৯ পিএম
ইয়াসুও তাকামাতসু। ছবি : সংগৃহীত
২০১১ সালের ভয়াল সুনামি কেড়ে নিয়েছিল তার স্ত্রীকে। সাগরের বুকে হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষটির মরদেহও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু ১৫ বছর পেরিয়েও স্ত্রীর খোঁজ ছাড়েননি জাপানের ইয়াসুও তাকামাতসু। প্রতি মাসে দুবার সাগরের গভীরে ডুব দেন তিনি। তার বিশ্বাস, কোনো একদিন হয়ত সাগরের নিচেই দেখা মিলবে হারিয়ে যাওয়া ইউকোর।

ছোট্ট একটি মাছ ধরার নৌকায় চড়ে উপকূল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে সাগরে যান ইয়াসুও তাকামাতসু। মিয়াগি প্রিফেকচারের ওনাগাওয়া বন্দর থেকে শুরু হয় তার এই যাত্রা। সঙ্গে থাকে মাস্ক, এয়ার ট্যাংক ও ওয়েট বেল্ট। নৌকাটি নির্দিষ্ট দূরত্বে পৌঁছালে ঠান্ডা পানিতে ঝাঁপ দেন তিনি। এভাবে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে একই পথে সাগরের গভীরে ডুব দিচ্ছেন ইয়াসুও। 

সুনামিতে সেদিন যে ব্যাংকের ছাদে কাজ করছিলেন ইউকো, সেখান থেকেই বিশাল ঢেউ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সুনামির পানি উপকূল থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করে। পথে থাকা সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। 

ইয়াসুও তাকামাতসুর স্ত্রী ইউকো ও তাদের দুই সন্তান। ছবি : সংগৃহীত

ইয়াসুও তাকামাতসুর স্ত্রী ইউকো ও তাদের দুই সন্তান। ছবি : সংগৃহীত


সুনামির সতর্কসংকেত বেজে উঠলে ইউকো ও তার ১২ সহকর্মী ভবনের ছাদে আশ্রয় নেন। সেখান থেকেই স্বামীকে একটি বার্তা পাঠান ইউকো, ‘তুমি কি নিরাপদ আছো? আমি বাড়ি যেতে চাই।’

বার্তাটি পড়ে ইয়াসুও ভেবেছিলেন, স্ত্রী নিশ্চয়ই নিরাপদে আছেন। কিন্তু পরদিন বেঁচে যাওয়া মানুষদের আশ্রয়স্থল পৌর হাসপাতালে গিয়ে ইউকোকে খুঁজে পাননি তিনি।

ইয়াসুও বলেন, ‘আমাকে বলা হয়েছিল, সুনামি তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এরপর আমি আর উঠে দাঁড়াতে পারছিলাম না। আমার সমস্ত শক্তি যেন ভেসে গিয়েছিল।’

সুনামির পানি নেমে যাওয়ার পরের দিনগুলোতে জাপানের উপকূল থেকে হাজার হাজার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে, ইউকোর মতো অনেকের সন্ধান আর মেলেনি। তাদের মধ্যে ছিলেন ইয়াসুওর স্ত্রীও।

দুই বছর ধরে জাপানের উপকূলরক্ষী বাহিনীর ডুবুরিদের সাগরে তল্লাশি চালাতে দেখেছেন ইয়াসুও। তারা মরদেহের পাশাপাশি বিভিন্ন জিনিসপত্র ও স্মৃতিচিহ্ন উদ্ধারের চেষ্টা করছিলেন। একপর্যায়ে নিজেই ডুব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

ইয়াসুও তাকামাতসুর ডাইভ দেওয়ার প্রথম দিকের ছবি। ছবি : সংগৃহীত

ইয়াসুও তাকামাতসুর ডাইভ দেওয়ার প্রথম দিকের ছবি। ছবি : সংগৃহীত


ইয়াসুও বলেন, ‘আমি ডুব দিতে শিখলাম। আমার মনে হতো, যতদিন ডুব দেওয়া চালিয়ে যাব, একদিন তার সঙ্গে আমার দেখা হবে।’

পঞ্চাশের কোঠায় থাকা ইয়াসু এরপর থেকে নিয়মিত ডুব দিয়ে চলেছেন। এ পর্যন্ত তার ডুবের সংখ্যা ৭৬০ ছাড়িয়েছে।

জাপানে নানা আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মৃত স্বজনদের স্মরণ করার প্রচলন রয়েছে। বিশ্বাস করা হয়, মৃত্যুর পরও প্রিয়জনেরা অন্যদের জীবনের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত থাকেন। বৌদ্ধধর্মের কুয়ো প্রথায় মৃত ব্যক্তির শান্তি ও মঙ্গল কামনায় কবর বা বেদির পাশে নৈবেদ্য দেওয়া এবং প্রার্থনা করার মতো আচার রয়েছে। কিন্তু ইউকোর মরদেহ কখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ফলে, কোনো কবরের পাশে দাঁড়িয়ে স্ত্রীকে স্মরণ করার সুযোগও নেই ইয়াসুওর। তাই স্ত্রীর খোঁজে শুরু করা ডুব দেওয়াই ধীরে ধীরে তার কাছে স্মরণ ও সংযোগের নিজস্ব এক রীতিতে পরিণত হয়েছে।


ইয়াসুওর ভাষায়, ‘বারবার ডুব দেওয়ার পর আমার মনে হতে লাগল, সে হয়ত আশপাশেই আছে। এটা কবরে গিয়ে স্মরণ করার চেয়ে একটু আলাদা। কারণ, সে কবরে নেই। বরং মনে হয়, যেন আমি তার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি।’

ডুব দিতে যাওয়ার সময় ইয়াসুওকে বেশ হাসিখুশি ও বন্ধুত্বপূর্ণ দেখায়। হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেখা হলে, আমার মনে হয় অবাক হয়ে সে-ই হয়ত আমাকে প্রথমে বলত, তোমার বয়স হয়ে গেছে।’

সমুদ্রের গভীরে ডুব দিয়ে বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ দেখেন তিনি। ইয়াসুও বলেন, ‘যখন ধ্বংসস্তূপগুলোর দিকে তাকাই, তখন ভাবি, এসবের মধ্য দিয়ে তার পক্ষে উপরে উঠে আসা সম্ভব ছিল না। আর যখন এটা ভাবি, তখন সত্যিই আমার কান্না চলে আসে।’

জাপানের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের তোহোকু অঞ্চলে বসবাস করেন ইয়াসুও। সেখানে ভূমিকম্প ও সুনামি নতুন কোনো ঘটনা নয়। ইউকোর সঙ্গে পরিচয়ের অনেক আগে থেকেই এই সমুদ্রের পাশে বড় হয়েছেন ইয়াসুও। এই পানিতেই সাঁতার কাটা ও মাছ ধরা শিখেছেন। তার জীবনের অনেক স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই সমুদ্র।

সুনামির ১৫ বছর পরও ইয়াসুওর জীবনে শোক রয়ে গেছে। রয়ে গেছে সেই সমুদ্রও। তার কাছে সমুদ্রই এখন স্ত্রীর কাছাকাছি যাওয়ার পথ।

সূত্র : বিবিসি

সময়ের আলো/মহু



  বিষয়:   সুনামি  জাপান  নিখোঁজ  ইয়াসুও তাকামাতসু  ইউকো  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: