মেয়েকে বাঁচাতে না পারার আক্ষেপ থেকে বাবা তৈরি করলেন রক্তদানের অ্যাপ

প্রভা নাওয়ার

ফিচার

পাঁচ বছর আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মেয়ে আদিফাকে বাঁচাতে পারেননি বাবা আব্দুল আলিম। সেই শোককে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগে রূপ দিতে

2026-11-05T20:20:51+00:00
2026-11-05T20:23:16+00:00
 
  শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬,
২২ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
ফিচার
মেয়েকে বাঁচাতে না পারার আক্ষেপ থেকে বাবা তৈরি করলেন রক্তদানের অ্যাপ
প্রভা নাওয়ার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬, ৮:২০ পিএম  আপডেট: ০৫.১১.২০২৬ ৮:২৩ পিএম
মেয়েকে বাঁচাতে না পারার আক্ষেপ থেকে বাবা তৈরি করলেন রক্তদানের অ্যাপ। গ্রাফিক : সময়ের আলো
পাঁচ বছর আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মেয়ে আদিফাকে বাঁচাতে পারেননি বাবা আব্দুল আলিম। সেই শোককে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগে রূপ দিতে ২০২২ সালে তিনি গড়ে তোলেন ‘আদিফা মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’। তারপর এ বছর আদিফার পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতে কিছু শুভাকাঙ্খীদের সহযোগিতায় তিনি তৈরি করেন ‘আদিফা ব্লাড ডোনেশন’ অ্যাপ। জরুরি সময়ে রক্তপ্রত্যাশীদের সঙ্গে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের দ্রুত যুক্ত করা এবং দুস্থ মানুষের পাশে থাকাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
 
রক্তের প্রয়োজন হলে অনেক সময় উপযুক্ত দাতা খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হয়। এই প্ল্যাটফর্মে কাজটি সহজেই করা যায়। জেলা ও স্থানীয় এলাকার ভিত্তিতে রক্তদাতা খোঁজার সুযোগ থাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী কাছাকাছি দাতার সন্ধান পাওয়া যায়। রক্তের গ্রুপ ও অবস্থান মিলিয়ে দেখা যায় দাতার তথ্যও।

শুধু রক্তদাতা খোঁজাই নয়, নিজের কিংবা অন্য কারও জন্য রক্তের অনুরোধও জানানো যায় অ্যাপটির মাধ্যমে। সেই অনুরোধে সাড়া দিতে পারেন নিবন্ধিত রক্তদাতারা। ফলে, রক্তের প্রয়োজন হলে দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়।

এ ছাড়া, কেউ রক্ত দিলে নিজের দানের তথ্য ও বর্তমান অবস্থা হালনাগাদ করতে পারবেন। পরবর্তী সময়ে আবার রক্ত দিতে পারবেন কি না, সেটিও জানিয়ে রাখার সুবিধা রয়েছে। এতে দাতার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সহজ হয় এবং প্রয়োজনের সময় উপযুক্ত দাতার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। 


এটি অ্যান্ড্রয়েডভিত্তিক অ্যাপ এবং বিনামূল্যে ব্যবহার করা যায়। স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করা এবং জরুরি সময়ে রক্ত পাওয়া সহজ করাই অ্যাপটির উদ্দেশ্য। বিশেষ করে জেলা ও স্থানীয় এলাকার ভিত্তিতে দাতা খোঁজার সুবিধাটি দ্রুত যোগাযোগের ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে।

আদিফার বাবা আব্দুল আলিম বলেন, ‘আমি আসলে আমার পরিবারের সবচেয়ে বড় শোককে শক্তিতে পরিণত করে সমাজ ও রাস্ট্রের কল্যাণে আমার সীমাবদ্ধতার মধ্যে যা যা করা সম্ভব, তা ই করে যাচ্ছি। এখানে শুধু আমার স্বপ্ন নয়, এক ঝাঁক স্বপ্নবাজ বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।’

তেমনই একজন শুভাকাঙ্খী খন্দকার যোবায়ের। মূলত অ্যাপটি তার ধারণারই ফসল। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমরা আরএমজি সেক্টরে কাজ করি। এই সেক্টরের অনেকে বিভিন্ন সময় রক্তের জন্য আমাদের নক করতেন। একপর্যায়ে দেখলাম, ম্যানুয়ালি ডাটাবেজ দিয়ে রক্ত পাওয়াটা কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তখন ভাবলাম, এর বিকল্প কী হতে পারে? এই ভাবনা থেকেই অ্যাপটি তৈরি করা হয়।’

আরেকজন শুভাকাঙ্খী মো. লোকমান হোসেন লাভলু, যিনি নিজে আদিফাকে রক্ত দিয়েছিলেন এবং রক্ত নিয়ে আদিফা মেমোরিয়াল ট্রাস্টে সবচেয়ে বেশি কাজ করেন। এই মানবিক কাজে যুক্ত থাকার ব্যাপারে তার অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনুভূতি খুব ভালো। এ পর্যন্ত আমি ১৮ বার প্লাটিলেট দেওয়াসহ মোট ৪১ বার রক্ত দিয়েছি। আদিফা ব্লাড ডোনেট গ্রুপ ছাড়াও আমাদের গ্রামেও ব্লাড ডোনেটের একটি গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত আছি। যে যখনই আমার কাছে রক্ত চায়, যত রাতই হোক আমি ছুটে চাই। সারাজীবন আমি এই মানবিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চাই।’


আব্দুল আলিম বলেন, ‘এখনো আমাদের বহুদূর যাওয়া বাকি। সারাদেশে রক্তদাতা বা রক্তগ্রহীতারা অ্যাপটি ব্যবহার করলেও, ঢাকাতেই ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেশি, অন্য জেলাগুলোতে কম। আশা করি, সংখ্যাটা সামনে আরও বাড়বে।’

তিনি জানান, বিভিন্ন সময় ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প করা হয় আদিফা মেমোরিয়াল ট্রাস্টের পক্ষ থেকে। কখনো চলে ডেঙ্গু সচেতনতা বাড়ানোর কার্যক্রম, কখনো আবার ছুটে যাওয়া হয় শ্রমজীবী মানুষদের কাছে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে, কখনো পোশাক শ্রমিকদের দেওয়া হয় বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা। 

কথাপ্রসঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্নের কথাও জানান তিনি। আব্দুল আলিমের ইচ্ছে, একদিন তিনি আদিফা মেমোরিয়াল ট্রাস্টের অধীনে একটি শিশু হাসপাতাল গড়ে তুলবেন, যেখানে শুধু গার্মেন্টস কর্মীদের শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হবে।

নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করেন তিনি। অ্যাপটি সম্পর্কে বিশেষ প্রচারণা নেই, অনেক অর্থও নেই, তবু তিনি স্বপ্ন বুনে চলছেন প্রতিনিয়ত। নিজের মেয়েকে বাঁচাতে না পারলেও আরও অনেক মানুষকে বাঁচাতে চান আব্দুল আলিম। রক্তের জন্য যেন কারও মৃত্যু না হয়, তার নিরলস কাজ করে যাবেন বলে জানান তিনি।

সময়ের আলো/মহু


  বিষয়:   আদিফা মেমোরিয়াল ট্রাস্ট  আদিফা ব্লাড ডোনেশন  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: