গবেষণায় উঠে এসেছে, অটিস্টিক নারীরা মেনোপজের লক্ষণগুলোর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ কম অনুভব করেন। ছবি : সংগৃহীত অটিস্টিক নারীরা মেনোপজ বা রজোনিবৃত্তির সময় অন্য নারীদের তুলনায় বেশি তীব্র লক্ষণের মুখোমুখি হতে পারেন। এর প্রভাব পড়তে পারে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানে। নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমন তথ্য। গবেষকদের মতে, মেনোপজ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকা এবং লক্ষণগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ কম অনুভব করার সঙ্গে এই অভিজ্ঞতার সম্পর্ক রয়েছে।
অটিজম ইন অ্যাডাল্টহুড সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সী ৯০১ জন অংশ নেন। তাদের মধ্যে ৪৭৬ জন অটিস্টিক এবং ৪২৫ জন নিউরোটিপিক্যাল বা অটিজমবিহীন ব্যক্তি। অংশগ্রহণকারীরা মেনোপজের পর্যায়ে ছিলেন অথবা মেনোপজ শেষ করেছিলেন। টানা পাঁচ সপ্তাহ ধরে তারা প্রতি সপ্তাহে অনলাইন প্রশ্নের উত্তর দেন।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মেনোপজ সম্পর্কে ধারণা, লক্ষণের তীব্রতা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান মূল্যায়ন করা হয়। পাশাপাশি বয়স, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যগত অভ্যাসের মতো বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, পাঁচ সপ্তাহজুড়েই অটিস্টিক অংশগ্রহণকারীরা অন্যদের তুলনায় মেনোপজের বেশি তীব্র লক্ষণের কথা জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের মাত্রাও বেশি ছিল। একই সঙ্গে তাদের জীবনযাত্রার মান তুলনামূলক কম পাওয়া গেছে।
বিশেষ করে মেজাজের পরিবর্তন ও মানসিক কষ্টের মতো মনস্তাত্ত্বিক লক্ষণ অটিস্টিক নারীদের মধ্যে বেশি তীব্র ছিল। মেনোপজের সময় এবং পরবর্তী পর্যায়- দুই ক্ষেত্রেই এই পার্থক্য দেখা গেছে।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, অটিস্টিক নারীরা মেনোপজের লক্ষণগুলোর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ কম অনুভব করেন। শরীরে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটছে, সে সম্পর্কেও তাদের মধ্যে স্পষ্ট ধারণার ঘাটতি থাকতে পারে।
গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, মেনোপজ সম্পর্কে দুর্বল ধারণা এবং লক্ষণ নিয়ন্ত্রণে অসহায় বোধ করার বিষয়টি অটিজমের সঙ্গে তীব্র লক্ষণ ও খারাপ মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক আংশিকভাবে ব্যাখ্যা করে। বয়স বা জীবনযাত্রার মতো বিষয় দিয়ে এই পার্থক্য পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায়নি।
গবেষকদের মতে, পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে অসুবিধা, সংবেদনশীলতার সমস্যা এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ সংকেত বুঝতে না পারার মতো অটিজম-সংশ্লিষ্ট বৈশিষ্ট্য মেনোপজের অভিজ্ঞতাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ফলে, এ সময়ে নিজেদের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর অনুভূতি এবং লক্ষণ নিয়ে বিভ্রান্তি বাড়তে পারে।
সিলভিয়া ব্রাফম্যান মেন্টাল হেলথ সেন্টারের মেডিকেল ডিরেক্টর এবং গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ড. লিন্ডা ডোলিন বলেছেন, অটিস্টিক নারীদের মেনোপজের লক্ষণ নীরবে সহ্য করার প্রয়োজন নেই। বরং ঘুম, মেজাজ, সংবেদনশীলতা ও কর্মশক্তির পরিবর্তন নিয়মিত লিখে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
তার মতে, এসব তথ্য চিকিৎসকের সঙ্গে শেয়ার করলে লক্ষণগুলোর ধরন বুঝতে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা নির্ধারণে সুবিধা হয়। চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী মেনোপজকালীন যত্নের পরিকল্পনাও তৈরি করা যেতে পারে।
ডোলিন বলেন, ‘দৈনন্দিন জীবনে নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি, সংবেদনশীলতার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেওয়া এই পরিবর্তনের সময়কে সহজ করতে পারে।’
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত নন, এমন মনোবিজ্ঞানী ড. শ্যানন ফ্র্যাঙ্কলিনও দৈনন্দিন রুটিনে ছোটখাটো পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, মেনোপজ ও অটিজম- দুই বিষয়েই অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘নারীদের নিজেদের সুস্থতার ওপর বিভিন্ন পরিবর্তনের প্রভাব ব্যাখ্যা করার এবং চিকিৎসা ও সহায়তার বিষয়ে জানার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। জীবনের পরিবর্তনের সঙ্গে কেবল মানিয়ে নেওয়া নয়, বরং নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী তা সামলানোর পথ তৈরি করাও জরুরি।’
গবেষকদের মতে, অটিস্টিক নারীদের মেনোপজ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা, উপযুক্ত চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এ সময় তাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হতে পারে।
সূত্র : মেডিকেল নিউজ টুডে
সময়ের আলো/মহু