কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ ও পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রেখে চলেছেন নারীরা। নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে নীরবে পরিবারকে আগলে রাখা, সন্তান লালন-পালন এবং পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় তাদের অবদান অপরিসীম। দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও সীমিত সুযোগের মধ্যেও তারা ধৈর্য, সাহস ও আত্মপ্রত্যয়ের পরিচয় দিয়েছেন। গ্রামীণ নারীদের জীবনসংগ্রাম ও দারিদ্র্য নিরসনে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের দিকে তাকালে দেখা যায়, নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাদের টিকে থাকা, ঘুরে দাড়ানো এবং এগিয়ে যাওয়ার গল্প আশার আলো দেখায়।
গ্রামীণ নারীদের প্রারম্ভিক জীবন
বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীদের প্রাথমিক জীবন সাধারণত কষ্টের। অল্প বয়স থেকেই গ্রামাঞ্চলের মেয়েরা আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ থাকে। অনেকের কাছে শিক্ষা অনেক দূরের স্বপ্ন। স্কুলে যাওয়ার পরিবর্তে তারা গৃহস্থালির কাজ, খামারের কাজ এবং দায়িত্বের বোঝার নিচে চাপা পড়ে, যা তাদের পুরুষ (জীবনসঙ্গী) দ্বারা খুব কমই ভাগাভাগি হয়। ব্র্যাকের (অক্টোবর ২০২০) একটি প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশের গ্রামীণ মেয়েদের ৩৯ শতাংশেরও বেশি ১৮ বছর বয়সের আগে বিয়ে হয়, তাদের পড়ালেখা শেষ হয় না এবং তারা মাতৃত্ব ও দারিদ্র্যের জীবনে পা রাখে।
শিক্ষায় সীমিত প্রবেশাধিকারের কারণে গ্রামীণ নারীর স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি ও সঠিক স্যানিটেশন সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব দেখা দেয়, যা তাদের ঠেলে দেয় জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যার দিকে। বাল্যবিবাহ, মাতৃমৃত্যু এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা গ্রামীণ নারীদের ক্রমাগত জর্জরিত করে রাখে, দারিদ্র্যের একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়; যার ধারা প্রজন্মের পর প্রজন্মে বইতে থাকে। গ্রামীণ বেশিরভাগ নারীর জন্য দারিদ্র্য থেকে পালানোর সুযোগ প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়। তবে, গত দুই দশকের পরিবর্তনগুলো তাদের জীবনে ধীর কিন্তু স্থির রূপান্তর ঘটিয়েছে।
পরিবর্তনের সুবাতাস
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি গ্রামীণ নারীদের জন্য আশার বাতিঘর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সরকার, অসংখ্য এনজিও এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্রামীণ বাংলাদেশে দারিদ্র্যের শৃঙ্খল ভেঙে নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। সবচেয়ে ফলপ্রসূ উদ্যোগগুলোর মধ্যে একটি হলো ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির প্রবর্তন।
ক্ষুদ্রঋণ একটি গেমচেঞ্জার হয়ে উঠেছে। এটি গ্রামীণ নারীদের ছোট ঋণের অ্যাক্সেস প্রদান করে, যা তাদের ব্যবসা শুরু করতে, পশুপালন করতে বা কৃষিতে বিনিয়োগ করতে সক্ষম করে তোলে। গ্রামীণ ব্যাংক এবং ব্র্যাকের মতো সংস্থাগুলো আর্থিক ভাগ্য নিয়ন্ত্রণে নারীদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছে। ক্ষুদ্রঋণ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ)’র ২০২৪ সালের তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ৯১ শতাংশ ঋণগ্রহীতা নারী এবং তাদের অনেকেই এই কর্মসূচির মাধ্যমে চরম দারিদ্র্য কাটিয়ে উঠেছেন। ক্ষুদ্রঋণ তাদের শুধু দারিদ্র্য থেকেই বের করেনি, বরং তাদের কমিউনিটির নেতৃত্বদানে সক্ষম করে তুলেছে।
এছাড়া, ভালনারেবল গ্রুপ ডেভেলপমেন্ট (ভিজিডি) উদ্যোগের মতো সামাজিক সুরক্ষার কর্মসূচির প্রবর্তনও গ্রামীণ নারীদের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুযোগের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
উন্নতির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হলো শিক্ষা। মেয়েদের শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি ও বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তকের মতো সরকারি কর্মসূচি পরিবারগুলোকে তাদের মেয়েদের শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে উৎসাহিত করেছে। ইউনিসেফের মতে, ঝরে পড়ার হার বড়া সত্ত্বেও মেয়েরা এখন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫ অনুযায়ী, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা সমাপ্ত করছে ৭৬ শতাংশ মেয়ে। যদিও আরও বহু পথ এগোতে হবে, তবুও অনেক গ্রামীণ নারীর জন্য শিক্ষা এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তবতা, যা তাদের ঐতিহ্যগত লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকা থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়।
এ ছাড়া, স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিকের প্রবর্তন, সেই সঙ্গে মা ও শিশু স্বাস্থ্য কর্মসূচি মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়েছে এবং গ্রামীণ নারীদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও ভালো থাকা উন্নত করেছে। ২০২৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার এক লাখে ১২৩, যা ১৯৯০ সালে ছিল ৫৬৯ জন। এটি একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।
সমতার পথে রয়েছে আরও অনেক চ্যালেঞ্জ
যদিও এই উন্নতিগুলো উল্লেখযোগ্য, কিন্তু লিঙ্গসমতা এবং টেকসই দারিদ্র্য হ্রাসের বাকি এজেন্ডা দীর্ঘ। বাংলাদেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে গ্রামীণ নারীরা রয়েছেন। ক্ষুদ্রঋণ ও অন্যান্য অর্থনৈতিক উদ্যোগের সাফল্য সত্ত্বেও অনেক নারী এখনো উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হয়। যেমন- দুর্বল বাজার অবকাঠামো, বৈষম্যমূলক সম্পত্তি আইন এবং সীমিত সামাজিক গতিশীলতা।
তদুপরি, জলবায়ু পরিবর্তন গ্রামীণ জীবনযাত্রার জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকির সৃষ্টি করে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও ক্রমবর্ধমান সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নারীদের প্রভাবিত করে, বিশেষ করে যারা তাদের আয়ের জন্য কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অনেকের কাছে জলবায়ুর এই পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য সম্পদের অভাব রয়েছে।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, অবৈতনিক শ্রমের সাংস্কৃতিক নিয়ম। অর্থনীতিতে তাদের অবদান থাকা সত্ত্বেও গ্রামীণ নারীদের বাড়িতে এবং পারিবারিক খামারে কাজ অস্বীকৃত ও অবমূল্যায়ন করা হয়। ইউনাইটেড নেশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউএনডিপি) অনুসারে, বাংলাদেশে নারীরা প্রতিদিন গড়ে ৪ দশমিক ৫ ঘণ্টা অবৈতনিক পরিচর্যা কাজে ব্যয় করে, যেখানে পুরুষদের জন্য তা মাত্র ১ দশমিক ৫ ঘণ্টা। এই ভারসাম্যহীনতা অনেক নারীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পূর্ণভাবে অংশগ্রহণ করতে বা শিক্ষা ও ব্যক্তিগত উন্নয়নের সুযোগগুলো নিতে বাধা দেয়।
গ্রামীণ নারীদের জীবনকে আরও উন্নত করতে বহুমুখী পদ্ধতির প্রয়োজন। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও বৈষম্যমূলক আইনি কাঠামোর মতো পদ্ধতিগত বাধাগুলো মোকাবিলায় মনোযোগ প্রয়োজন। একটি প্রতিশ্রুতিশীল সমাধান হলো- গ্রামীণ এলাকায় ডিজিটাল প্রযুক্তির অ্যাক্সেস বাড়ানো, যা শিক্ষা, উদ্যোক্তা এবং সামাজিক সংযোগের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
পরিবারের মধ্যে এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীদের সম্পৃক্ত করার ওপর অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। স্থানীয় সরকার, সমবায় এবং ব্যবসায় নেতৃত্বের ভূমিকা নেওয়ার জন্য নারীর ক্ষমতায়ন শুধু লিঙ্গগত স্টেরিওটাইপগুলো ভেঙে ফেলতে সাহায্য করবে না, বরং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায়সংগত উন্নয়নে অবদান রাখবে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীদের জীবনসংগ্রাম সহনশীলতা, সাহস, ধৈর্য ও আশার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। নানা চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেলেও দারিদ্র্য বিমোচন, নারীশিক্ষার প্রসার এবং গ্রামীণ জীবনমান উন্নয়নে অর্জিত অগ্রগতি অস্বীকার করার উপায় নেই। শিক্ষা, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও স্বাস্থ্যসেবায় ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের অগ্রযাত্রা আরও বেগবান করা সম্ভব। এর ফলে তারা নিজেদের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন। বাংলাদেশের সামগ্রিক অগ্রগতির ধারাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে গ্রামীণ নারীদের মতামত, অধিকার ও অবদানকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। তবেই দারিদ্র্য বিমোচন ও সবার ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার পথে প্রকৃত সাফল্য অর্জন সম্ভব হবে।
সময়ের আলো/মহু