একজন উদ্যোক্তার পথচলা সবসময় পরিকল্পিতভাবে শুরু হয় না। কখনো কখনো নিজের ভালোলাগা আর কাজের প্রতি ভালোবাসাই হয়ে ওঠে বড় একটি সম্ভাবনার সূচনা। গাজীপুরের কাপাসিয়ার শাহনাজ বেগমের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্পটি ঠিক তেমনই ভালোবাসা থেকে শুরু। সেই সঙ্গে সাহসের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়া এবং প্রতিনিয়ত শেখার মধ্য দিয়ে নিজেকে তৈরি করা।
হাতের কাজের প্রতি শাহনাজ বেগমের ভালোবাসা ছোটবেলা থেকেই। তৈরি পোশাক কেনার চেয়ে নিজের হাতে তৈরি পোশাক পরতেই তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। ফ্যাশন ডিজাইন সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও বিভিন্ন ফ্যাশন ম্যাগাজিন এবং আড়ংয়ের নকশা দেখে তিনি নিজের মতো করে ডিজাইন করতেন। ঘরের পর্দা থেকে শুরু করে বিছানার চাদর, ম্যাচিং পর্দা, কুশন, ডাইনিং টেবিল কভার ও রানার, বেড রানার, ফ্রিজ কভার, ওভেন কভার ঘর সাজানোর প্রায় সবকিছুই তৈরি করেছেন নিজের হাতে।
নিজের সাজানো ঘরের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করতেন শাহনাজ। ছবিতে প্রশংসার পাশাপাশি প্রায়ই একটি প্রশ্ন আসত ‘এগুলো কি আড়ং থেকে কেনা?’ তখন তিনি জানাতেন, সবই তার নিজের হাতে তৈরি। অনেকেই তাকে পণ্য বানিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করলেও তখনও ব্যবসা শুরু করার কথা ভাবেননি তিনি।
একের পর এক নতুন ডিজাইনের বিছানার চাদর, পর্দা ও ঘর সাজানোর সামগ্রী তৈরি করতে থাকেন। তার কাজের প্রতি মানুষের আগ্রহ দেখে মেয়ে একটি ফেসবুক পেজ খুলে দেয়। সেখানেও নিজের তৈরি পণ্যের ছবি পোস্ট করতেন তিনি। অর্ডার পাওয়ার পরও সাহস করে কাজ শুরু করতে পারতেন না। মূলধন ছিল না, ধার করে পণ্য তৈরি করার পর ক্রেতা যদি না নেন এই আশঙ্কা তাকে পিছিয়ে রাখত।
পরিবর্তন আসে এক বন্ধুর হাত ধরে। মেয়ের স্কুলের বন্ধুদের মায়েদের সঙ্গে শাহনাজের বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছিল। তাদেরই একজন অনিতা এক দিন তাকে একটি ফাল্গুনের শাড়ি বানিয়ে দিতে বলেন। একটি হলুদ শাড়ির ছবি দেখিয়ে নিজের পছন্দমতো ডিজাইন করে দিতে অনুরোধ করেন। শাহনাজ ভাবলেন, পরিচিত মানুষ বলেই ঝুঁকি নেওয়া যায়। নিজের খরচ হিসাব করে মূল্য নির্ধারণ করলেন। পণ্য তৈরি হওয়ার পর অনিতা তাকে প্রত্যাশার চেয়েও ভালো মূল্য দিলেন। সেই প্রথম তিনি বুঝলেন, নিজের সৃষ্টিশীলতা দিয়েও সম্মানজনক আয় করা সম্ভব।
এরপর একের পর এক অর্ডার আসতে থাকে। বাড়তে থাকে কাজের পরিধি। একসময় একা সব কাজ সামলানো সম্ভব হচ্ছিল না। তখন শাহনাজ অন্য নারীদের কাজ শেখানো ও কর্মী তৈরি করার উদ্যোগ নেন। একই সঙ্গে নিজেকে আরও দক্ষ করে তুলতে শুরু করেন। এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে ফ্যাশন ডিজাইনের প্রশিক্ষণ নেন।
জয়ীতা থেকেও প্রশিক্ষণ নেন এবং একজন জয়ীতা সদস্য হিসেবে রাপা প্লাজার ক্রাফট জোনে নিয়মিত পণ্য দেওয়া শুরু করেন। অনলাইনে যাত্রা শুরু হলেও ধীরে ধীরে অফলাইন বিক্রিতে বেশি সাড়া পান। তার তৈরি পণ্য ইতিমধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মেলায় পৌঁছে গেছে।
শাহনাজের উদ্যোগ এখন শুধু পোশাক বা ঘর সাজানোর সামগ্রীতে সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমানে তিনি অ্যাপ্লিক, হোম ডেকোর পণ্য, হাতে তৈরি আপসাইক্লিং গহনা ও ম্যাক্রাম নিয়ে কাজ করছেন। দুটি প্রতিষ্ঠানে এবং দুটি সংগঠনে ট্রেইনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। শাহনাজের বিশ্বাস, উদ্যোক্তা হতে সবসময় মূলধনের প্রয়োজন হয় না।
শূন্য হাতেও শুরু করা যায়। প্রয়োজন সততা, কাজের প্রতি ভালোবাসা, ধৈর্য এবং পরিশ্রম। তার স্বপ্ন দেশের পাশাপাশি বিদেশের ক্রেতাদের কাছেও বাংলাদেশের হাতে তৈরি পণ্যের সৌন্দর্য ও সম্ভাবনাকে পৌঁছে দেওয়া।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি