ছোট-বড় প্রায় সব নদীর গতিপথেই দেখা যায় অসংখ্য বাঁক। ছবি : সংগৃহীত পৃথিবীর কোনো নদীই পুরোপুরি সরলরেখায় প্রবাহিত হয় না। ছোট-বড় প্রায় সব নদীর গতিপথেই দেখা যায় অসংখ্য বাঁক। অনেকের ধারণা, নদীর পথে পাহাড় বা অন্য কোনো বাধা থাকায় এমন আঁকাবাঁকা পথ তৈরি হয়। কিন্তু সমতল ভূমিতেও নদীকে এঁকেবেঁকে চলতে দেখা যায়। যেখানে চোখে পড়ার মতো কোনো বাধা নেই, সেখানেও নদী কেন সরল পথে না গিয়ে সর্পিল গতিপথ তৈরি করে?
পাহাড়, উঁচু ভূমি কিংবা বরফাচ্ছাদিত অঞ্চল থেকে বৃষ্টির পানি ও বরফগলা পানি ঢাল বেয়ে নিচে নামতে থাকে। ছোট ছোট পানির ধারা একত্র হয়ে তৈরি করে নদী। এরপর সেই নদী ভূমির ঢাল অনুসরণ করে সাগর কিংবা অন্য কোনো জলাশয়ের দিকে প্রবাহিত হয়।
নদীর বড় বড় বাঁক সাধারণত সমতল বা সামান্য ঢালু অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। এসব এলাকায় পানির প্রবাহ তুলনামূলক ধীর হয়। ফলে, নদীর তলদেশ ও দুই পাড়ের মাটির সঙ্গে পানির ক্রমাগত মিথস্ক্রিয়ায় গতিপথে বাঁক তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। নদীর এই আঁকাবাঁকা গতিপথ এক দিনে তৈরি হয় না। দীর্ঘ সময় ধরে পানির স্রোত নদীর তলদেশ ও পাড়ের মাটিতে পরিবর্তন ঘটায়। এভাবেই ধীরে ধীরে ছোট বাঁক বড় হতে থাকে।
নদীর আঁকাবাঁকা গতিপথ তৈরির পেছনে প্রধানত দুটি প্রক্রিয়া কাজ করে। একটি হলো মাটির ক্ষয়, অন্যটি পলি জমা।
নদীর কোনো বাঁকের বাইরের দিকে পানির স্রোত তুলনামূলক বেশি শক্তিশালী থাকে। ফলে, পানির ধাক্কায় ওই অংশের মাটি ও পাথর ক্ষয় হতে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে এই ক্ষয় চলতে থাকলে বাঁকের বাইরের অংশ আরও প্রশস্ত ও গভীর হয়ে যায়।
অন্যদিকে, বাঁকের ভেতরের দিকে পানির গতি তুলনামূলক কম থাকে। ফলে নদীর সঙ্গে ভেসে আসা বালু, কাদা ও পলি সেখানে জমা হতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে পলি জমে ওই অংশে নতুন ভূমি তৈরি হয়।
এভাবে বাঁকের বাইরের দিকে মাটি ক্ষয় এবং ভেতরের দিকে পলি জমার প্রক্রিয়া চলতে থাকে। ফলে, নদীর বাঁক আরও স্পষ্ট ও বড় হয়ে ওঠে। একসময় নদীর গতিপথে তৈরি হয় দীর্ঘ সর্পিল আকৃতি।
নদী কতটা আঁকাবাঁকা পথে প্রবাহিত হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে পানির বেগ ও ভূমির ঢালের ওপর। খাড়া ঢাল থাকলে পানি দ্রুত নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। এ কারণে পাহাড়ি অঞ্চলের নদীগুলো সাধারণত বেশি সোজা ও দ্রুতগতির হয়।
অন্যদিকে, সমতল কিংবা সামান্য ঢালু এলাকায় পানির প্রবাহ তুলনামূলক ধীর হয়। সেখানে পানির স্রোত নদীর এক পাশের মাটি ক্ষয় করে এবং অন্য পাশে পলি জমায়। এভাবেই ধীরে ধীরে নদীর গতিপথে বাঁক তৈরি হয়।
তবে শুধু ঢাল বা পানির বেগই নয়, নদীর তলদেশের গঠন, মাটির ধরন এবং পানির সঙ্গে বয়ে আসা পলির পরিমাণও এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নদীর বাঁক তৈরি হওয়ার পরও ক্ষয় ও পলি জমার প্রক্রিয়া চলতে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে এই পরিবর্তনের ফলে কোনো কোনো বাঁক এতটাই বড় হয়ে যায় যে, নদী একসময় নতুন পথ তৈরি করে নেয়।
কখনো নদীর বাঁকের দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী দূরত্ব কমতে কমতে পানি বাঁক ঘুরে যাওয়ার পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত সোজা পথে প্রবাহিত হতে শুরু করে। এতে পুরোনো বাঁকটি মূল নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অর্ধচন্দ্রাকার জলাশয়কে বলা হয় ‘অক্সবো হ্রদ’।
প্রকৃতিতে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের এটি একটি পরিচিত উদাহরণ। সময়ের সঙ্গে এসব হ্রদের আকৃতি ও পানির পরিমাণেও পরিবর্তন আসতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন নদীর আঁকাবাঁকা গতিপথ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি, আফ্রিকার জাম্বেজি, ইউরোপের দানিউব এবং মিসরের নীলনদ এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
নদীর বাঁক ও আশপাশের প্লাবনভূমি নানা উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল তৈরি করে। এসব এলাকায় পলি জমে উর্বর কৃষিজমিও গড়ে ওঠে। পাশাপাশি নদী মানবসভ্যতার কৃষি, বাণিজ্য ও পানির চাহিদা পূরণে দীর্ঘকাল ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
সূত্র : টিএম পার্কস ফাউন্ডেশন ও ইন্ডিয়ানা পাবলিক মিডিয়া
সময়ের আলো/মহু