এত সুন্দর সব নাম আমাদের নদীগুলোর! আমার প্রিয় নদীটার নাম আসলে কী?
বান্দরবানের আলীকদম গিয়েছিলাম সেবার। প্ল্যান ছিল প্রথম দিন একটা অফ-ট্র্যাকে যাওয়া। যেখান থেকে ট্রেকিং শুরু হবে, সেখানে গিয়ে দেখা গেল ভ্রাম্যমাণ আর্মি ক্যাম্প বসেছে। কোনোভাবেই ও পথে যাওয়ার উপায় নেই! শেষে, আলীর গুহা ঘুরে ফিরতে হয়েছিল রিসোর্টে। নামধাম কিচ্ছু মনে নেই রিসোর্টের; পাহাড়ের উপর গাছপালাঘেরা রিসোর্ট। রিসোর্টে ফিরে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হতে হতে মনে হয়েছিল এভাবে অহেতুক নষ্ট হবে একটা দিন! তবে, হলো না।
ফিরতে ফিরতেই শুরু হয়েছিল বৃষ্টি। বেলার সঙ্গে বৃষ্টিও বেড়েছিল পাল্লা দিয়ে। পাহাড়ের উপর একটা বাঁশের ছাউনিঘেরা ঘরে বসে, বৃষ্টির মধ্যে একটা নদী নজর কেড়েছিল সেবার। দূরের পাহাড়, মাঝে এঁকেবেকে চলে যাওয়া নদী, নদীর উপর পড়তে থাকা ঝুম বৃষ্টি- সব মিলিয়ে কী অপার্থিব সুন্দরই না লাগছিল নদীটাকে! সেদিনই আমার প্রিয় নদীর তালিকায় যুক্ত হয়েছিল নামটা, ‘মাতামুহুরি’।
সেবার গিয়েছিলাম তেঁতুলিয়া। টানা ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ঘুরে সব এনার্জি শেষ করে সেখানে পৌঁছেছিলাম রাতে। মৌসুমের সময়, আগে থেকে বন্ধুদের বুক করে দেওয়া রিসোর্টে পৌঁছে দেখি যা-তা অবস্থা! ফোন করে জানাতেই আরেক বন্ধু তখনই ব্যবস্থা করে দিয়েছিল তেঁতুলিয়া ইকো ফরেস্টের গেস্ট হাউজে।
ঘুটঘুটে অন্ধকারের কনকনে শীতের রাত। একটা হারিকেন ঝোলানো ভ্যানে পা ঝুলিয়ে বসে কাঁপতে কাঁপতে রওনা হয়েছিলাম আমরা ৩ জন। ওই শীতের রাতে শব্দও জমে গিয়েছিল বোধহয়! ভ্যানের এগিয়ে চলা, আমাদের কাঁপাকাঁপির সঙ্গে একটানা ঝিঁঝিঁর শব্দ ছাড়া অন্য কোনো শব্দই ছিল না! ওদিকে ফরেস্টের কাছাকাছি পৌঁছাতেই ছলছল শব্দ এসেছিল কানে। একই ছন্দে চলতে থাকা শব্দ। কী মিষ্টি, ঘুমপাড়ানি, স্নিগ্ধ সেই শব্দ! শব্দের উৎস দেখতে গিয়ে, সীমান্তের কাঁটাতারের সঙ্গে অসংখ্য হলদে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় দেখেছিলাম জল-ঢেউয়ের উপর অদ্ভুত রঙের খেলা! কী অপার্থিব, কী মায়াবী ছিল সেই দৃশ্য! সেই প্রথম নদীটার সঙ্গে দেখা।
পরের দিন ভোরের আলোর ছটায় স্পষ্ট দেখেছিলাম নদীটাকে। দিনের ঝলমলে রোদে নদীর টলমলে জল দেখেছিলাম। এক ঝলক কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার খুশিতে পা ভিজিয়েছিলাম সেই নদীর জলে। ওই শীতল জল আমার বুকে চেপে ছিল লম্বা সময়। শ্বাসকষ্টে ভুগিয়েছিল। সব ছাপিয়েও আমার প্রিয় নদীর তালিকায় যুক্ত হয়েছিল আরেকটা নতুন নাম। সেই নামও কী অদ্ভুত সুন্দর, ‘মহানন্দা’!
‘পদ্মা সেতু দেখে আসি’ বলে যাত্রা শুরু হলেও আমরা সেবার চলে গিয়েছিলাম প্রসেনজিৎ রায় দাদার বাড়ি, পিরোজপুর। বাস থেকে নেমে রাস্তা পেরিয়ে দাদার বাড়ি পৌঁছাতে আমাদের একটা নদী পার হতে হয়েছিল। নৌকায় দাঁড়িয়ে নদীটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম হা করে। দেখেছিলাম নদীর জলে সন্ধ্যা মিলিয়ে যাওয়ার অপূর্ব দৃশ্য!
পরের দিন সেই নদী ধরেই আমরা আরও নতুন গ্রাম দেখেছিলাম। পেয়ারা বাগান ঘুরে এসেছিলাম। ফিরে, নদীর পারে বসে আড্ডা দিয়েছিলাম। দেখেছিলাম নদীর জলে আমার প্রিয় সবার দাপিয়ে বেড়ানো। দেখেছিলাম আরও একটা নদীকে আমার প্রিয় হয়ে যেতে! প্রথম যখন নদীটার সঙ্গে দেখা, তখনই জেনেছিলাম তার নাম, ‘সন্ধ্যা নদী’।
এই তিনটে ছাড়াও আরেকটা খুব প্রিয় নদী আছে আমার। খুব কাছের নদী। আমার ব্যক্তিগত নদী। নদীটা আমার নিজের মধ্যে থাকে। আমি দেখতে পাই নদীটাকে। অস্থির লাগলে নদীটার কাছে গিয়ে বসি। একা একা গল্প করি। শান্তি লাগে ভেতরে। শান্ত লাগে। নাহ, ময়ূরাক্ষী না। আমার সবচেয়ে প্রিয়, ব্যক্তিগত সেই নদীর নাম ‘শ্রবণা’। আদর করে তাকে আমি ডাকি ‘শ্রবু নদী’ বলে।
সময়ের আলো/মহু