ছবি : সংগৃহীতপাহাড়ঘেরা মনোরম পরিবেশ, সামনে স্বচ্ছ হ্রদ, চারপাশে সবুজ প্রকৃতি—দেখলে মনে হবে কোনো বিলাসবহুল অবকাশযাপন কেন্দ্র। কাঠের তৈরি বিশাল স্থাপনাটিও দেখতে অনেকটা হোটেলের মতো। তবে এখানে মানুষের থাকার ব্যবস্থা নেই। বরং পিঁপড়া, মৌমাছি, গুবরে পোকা, প্রজাপতি আর লেডিবার্ডের মতো ক্ষুদ্র প্রাণীদের জন্যই তৈরি হয়েছে এই বিশেষ আবাসন।
স্কটল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলে গ্লেনকোর কাছে ডুরোর এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোকামাকড়ের হোটেল। পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক সংগঠন হাইল্যান্ড টাইটেলসের উদ্যোগে তৈরি এই স্থাপনাটি জায়গা করে নিয়েছে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে।
৭ হাজার ঘনফুটেরও বেশি আয়তনের এই হোটেল নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে কাটা সিটকা স্প্রুস গাছের কাঠ, বাঁশের কঞ্চি, ইট, কাঠের গুঁড়া, বনের গাছের বাকল, মাটির পাইপ ও স্ট্রবেরি চাষে ব্যবহৃত জাল। এসব উপকরণ দিয়ে পোকামাকড়ের বসবাস ও আশ্রয়ের উপযোগী নানা ধরনের জায়গা তৈরি করা হয়েছে।
হোটেলটি অবস্থিত হাইল্যান্ড টাইটেলসের ২২০ একর আয়তনের একটি প্রাকৃতিক সংরক্ষিত এলাকায়। লক লিনের দিকে মুখ করে থাকা এ জায়গা থেকে দেখা যায় স্কটল্যান্ডের পাহাড়ি প্রকৃতির অপূর্ব দৃশ্য। মানুষের জন্য কোনো হোটেল হলে এমন মনোরম পরিবেশে থাকতে অনেকেই বিপুল অর্থ খরচ করতে চাইতেন।
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের একজন প্রতিনিধি সরেজমিনে স্থাপনাটি পরিদর্শন করে রেকর্ডের স্বীকৃতি দেন। এর আগে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোকামাকড়ের হোটেলের রেকর্ড ছিল পোল্যান্ডের ওয়ারশতে। সেটির আয়তন ছিল ৩ হাজার ১৫৭ ঘনফুট। স্কটল্যান্ডের নতুন স্থাপনাটি আগের রেকর্ডের দ্বিগুণেরও বেশি আয়তনের।
গাছ কাটার পর সেই কাঠেই প্রকৃতির আশ্রয়
হাইল্যান্ড টাইটেলসের প্রধান নির্বাহী ডগলাস উইলসনের মতে, এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য শুধু রেকর্ড গড়া নয়; বরং পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া।
তিনি জানান, ২০০৬ সালে সংগঠনটি জমিটি কেনার সময় সেখানে বাণিজ্যিকভাবে সিটকা স্প্রুসের বাগান ছিল। গাছগুলো স্কটল্যান্ডের স্থানীয় প্রজাতি নয়। আশির দশকের শেষ দিকে জীববৈচিত্র্যের বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়েই সেখানে এসব গাছ লাগানো হয়েছিল।
উইলসন বলেন, প্রকৃতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সেই গাছগুলো দিয়েই পোকামাকড়ের আবাস তৈরি করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এটি বদলে যাওয়া সময়ের প্রতীক। তাঁদের আশা, এই উদ্যোগ অন্যদেরও প্রকৃতির জন্য কাজ করতে অনুপ্রাণিত করবে।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে হোটেলটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। সাত সদস্যের একটি দল নির্মাণকাজে অংশ নেয়। ২০২২ সালের মার্চের শুরুতে পোকামাকড়ের জন্য খুলে দেওয়া হয় এর দরজা।
অতিথি হবে পিঁপড়া, মৌমাছি, প্রজাপতি
হোটেলটিতে ইতিমধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির পোকামাকড়ের বসবাস শুরু হয়েছে। কর্তৃপক্ষের আশা, সময়ের সঙ্গে এখানে পিঁপড়া, লেডিবার্ড, গুবরে পোকা, মৌমাছি ও প্রজাপতির আনাগোনা আরও বাড়বে।
এসব ক্ষুদ্র প্রাণী শুধু নিজেদের আবাসস্থলই পাবে না, সংরক্ষিত এলাকার অন্য প্রাণীদের খাদ্যের জোগানেও ভূমিকা রাখবে। বাদুড়, সজারু, পাখি ও ব্যাজারের মতো প্রাণীর খাদ্যশৃঙ্খলে পোকামাকড়ের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
সংরক্ষিত এলাকার ব্যবস্থাপক স্টুয়ার্ট বোরল্যান্ড জানান, ২০১৯ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ১০ হাজারের বেশি দর্শনার্থী ওই এলাকায় এসেছিলেন। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারির কারণে দর্শনার্থীর সংখ্যা অনেক কমে যায়।
তিনি আশা করছেন, নতুন পোকামাকড়ের হোটেল এবং সাইকেল চালানোর জন্য তৈরি নতুন পথ পর্যটকদের আবারও সেখানে আসতে উৎসাহিত করবে। ভ্রমণ ও পর্যটন স্বাভাবিক হয়ে আসায় দর্শনার্থীর সংখ্যাও বাড়বে বলে প্রত্যাশা তাঁদের।
পোকামাকড়ের সংকট মোকাবিলায় উদ্যোগ
স্কটল্যান্ডে পোকামাকড়ের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রবণতা শুধু ওই অঞ্চলের সমস্যা নয়; বিশ্বজুড়েই একই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা একে পৃথিবীর ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির অংশ হিসেবে দেখছেন।
পোকামাকড়ের সংখ্যা কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যের পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭০ সালের পর থেকে পৃথিবীতে স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, মাছ ও সরীসৃপের সংখ্যা ৬০ শতাংশ কমে গেছে। একই প্রতিবেদনে বিশ্বে পোকামাকড়ের জীববৈচিত্র্যের ‘ভয়াবহ অবস্থা’র কথাও তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, প্রায় অর্ধেক পোকামাকড়ের প্রজাতির সংখ্যা দ্রুত কমছে এবং এক-তৃতীয়াংশ বিলুপ্তির হুমকিতে রয়েছে।
অথচ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় পোকামাকড়ের ভূমিকা অপরিসীম। বাস্তুতন্ত্র ও খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ তারা। পুষ্টি উপাদান পুনর্ব্যবহার, উদ্ভিদের পরাগায়ন এবং অসংখ্য মেরুদণ্ডী প্রাণীর খাদ্য জোগানোর মতো অপরিহার্য কাজ করে পোকামাকড়।
তাই স্কটল্যান্ডের ডুরোরে তৈরি এই হোটেল কেবল একটি বিশ্বরেকর্ড নয়; এটি প্রকৃতি সংরক্ষণেরও একটি উদ্যোগ। আয়োজকদের আশা, ক্ষুদ্র প্রাণীদের জন্য তৈরি এই বিশাল আবাসন অন্য সংরক্ষিত এলাকা ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোকেও একই ধরনের উদ্যোগ নিতে উৎসাহিত করবে।
সময়ের আলো/জেডি