জীবনের ডুবসাঁতারে একা চলেছেন নবনীতা

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

তিনি হাসতে হাসতে এক কাপড়ে ট্রাকে চড়ে বসেছিলেন, ছুঁয়ে এসেছিলেন অরুণাচল সীমান্তে ভারত-চিনের ম্যাকমোহন লাইন। আবার হায়দরাবাদে সেমিনারে গিয়ে কুম্ভমেলায়

2026-11-07T20:53:39+00:00
2026-11-07T20:54:04+00:00
 
  শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬,
২৩ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
ফিচার
জীবনের ডুবসাঁতারে একা চলেছেন নবনীতা
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬, ৮:৫৩ পিএম  আপডেট: ০৭.১১.২০২৬ ৮:৫৪ পিএম
স্বাধীনচেতা ও নারীবাদী লেখক নবনীতা দেবসেন । গ্রাফিক : সময়ের আলো
তিনি হাসতে হাসতে এক কাপড়ে ট্রাকে চড়ে বসেছিলেন, ছুঁয়ে এসেছিলেন অরুণাচল সীমান্তে ভারত-চিনের ম্যাকমোহন লাইন। আবার হায়দরাবাদে সেমিনারে গিয়ে কুম্ভমেলায় গিয়েছেন একা। দুরারোগ্য ব্যধিকে উপেক্ষা করে বেরিয়ে পড়েছেন পৃথিবীর দুর্গম পথে। বলছিলাম, ভীষণ স্বাধীনচেতা ও নারীবাদী লেখক নবনীতা দেবসেনের কথা, যিনি তার বিচিত্র অভিজ্ঞতায় বাংলা সাহিত্যে অসংখ্য ফসল ফলিয়েছেন।

১৯৩৮ সালের ১৩ জানুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন নবনীতা। মা রাধারানী ও বাবা নরেন্দ্র দেব দুজনই সাহিত্যিক হওয়ায় নবনীতা বেড়ে উঠেছিলেন শিল্প ও সাহিত্যের পরিসরে। নবনীতার নামটি রেখেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্রও তার একটি নাম রেখেছিলেন- ‘খুকু’। যার মাথার ওপর এত গুণী মানুষের আশীর্বাদ, যার জীবন কেটেছে জ্ঞানীগুণীর সান্নিধ্যে, বিখ্যাত হওয়াটাই যেন তার ভবিতব্য ছিল। 

স্বাধীনচেতা নবনীতা ঘুরে বেড়াতে খুব ভালোবাসতেন। আধুনিক সমাজে দাঁড়িয়েও যেখানে অনেক মেয়ে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পান না, সেখানে নবনীতা সমাজকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন নিজের মতো। ভাগ্যিস তিনি ঘুরে ঘুরে নিজেকে আরও বেশি সমৃদ্ধ করেছেন, তাইতো আমরা বাংলা সাহিত্যে এত সমৃদ্ধ কিছু লেখা পেয়েছি। ঘোরাঘুরির প্রসঙ্গে নবনীতা একবার বলেছিলেন- ‘এই যে এত ঘুরি, অনবরত ঘুরে বেড়াই, এ দেশ-ও দেশ-, এ তীর্থ-ও কনফারেন্স, কোথাও কি কোনওই সম্ভাব্য প্রেমিক লুকিয়ে থাকতে পারত না আমার জন্যে? খুব পারত। কিন্তু আমার স্বভাবদোষেই তা পারে না। এখন কথা হচ্ছে গিয়ে, কোনটা বেশি জরুরি? স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ানো না পরাধীনভাবে প্রেম করা?’

মা-বাবার সঙ্গে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন ইউরোপ ও ভারতজুড়ে। মাত্র ১২ বছর বয়সে নরওয়েতে মধ্যরাতে সূর্য দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। তিনি গিয়েছেন দুর্গম তাওয়াংয়ে, থেকেছেন তিব্বতি মোম্পা লামাদের গ্রামের বাড়িতে। কোথায় না পদচিহ্ন পড়েছে তার। এ স্বভাবের জন্য ছোট থেকেই নবনীতাকে শুনতে হতো জংলি, বুনো, খ্যাপাটে, অসভ্য এসব তকমা। নবনীতার অবশ্য এসব নিয়ে মাথাব্যথা ছিল না। তিনি সারাজীবন ‘উঠল-বাই-তো-কটক-যাই’ স্বভাবের মুক্ত মানুষ হিসেবে জীবন কাটিয়েছেন।

চার দশক আগে কীভাবে তিনি এমন একলা ঘুড়ি হয়ে উঠেছিলেন, তা অবাক করারই ব্যাপার বটে। এখনকার মতো তখন ভ্রমণ এত সহজ ছিল না। না ছিল স্মার্ট ফোন, গুগল ম্যাপ, অনেক হোটেল, মসৃণ সুন্দর রাস্তা কিংবা পথেঘাটে ওয়াশরুমের সুব্যবস্থা। তবুও তিনি পথে নেমেছিলেন, কেননা সুদিনের অপেক্ষায় জীবন থেমে থাকবে না। নবনীতা বলতেন, ভ্রমণের নেশা এক তীব্র নেশা, প্রায় কৃষ্ণপ্রেমের মতো!

তবে নবনীতার ভাষ্য, তিনি কখনো একা ভ্রমণ করতেন না। অপরিচিত যেসব মানুষের সঙ্গে পথে দেখা হতো কিংবা যারা হতো তার একই পথের যাত্রী, সবাইকে নিজের সঙ্গীই ভাবতেন তিনি। নবনীতা বলেছিলেন- ‘কে বলেছে আমি একা ট্রাভেল করি? কক্ষনও নয়। সপরিবারে। সর্বদা সপরিবারে। মানুষের পরিবার কি একটা?’ পথের মানুষকে এভাবে নিজের ভাবতে পারার ক্ষমতা সবার থাকে না। তিনি ভাবতে পেরেছিলেন বলেই তার সাহিত্য আরও সমৃদ্ধ হয়েছে।

তার লেখকজীবনের হাতেখড়ি হয় কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম প্রত্যয়’ দিয়ে। তারপর একে একে উপন্যাস, গদ্য, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, প্রবন্ধ, রম্যরচনা- সাহিত্যের প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রেই অবাধ বিচরণ করেছেন তিনি। ভারত-চিনের ম্যাকমোহন লাইন ছুঁয়ে আসার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লিখেন ভ্রমণকাহিনি ‘ট্রাকবাহনে ম্যাকমোহনে’। হায়দরাবাদে কুম্ভমেলায় একা একা ঘোরার অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেন ‘করুণা তোমার কোন পথ দিয়ে’। ‘নটী নবনীতা’ নামে আত্মজীবনীমূলক রম্যরচনাও লিখেন তিনি, যা ১৯৯৯ সালে তাকে ভারতের সাহিত্য একাডেমী সম্মানে ভূষিত করে, পরের বছর একই বইয়ের জন্য ভারত সরকার তাকে দেন ‘পদ্মশ্রী’ সম্মান। সাহিত্য সাধনা তাকে আরও এনে দেয় বিদ্যসাগর, দেশিকোত্তমসহ নানা পুরষ্কার।


নবনীতা দেবসেন লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ থেকে প্রেসিডেন্সি কলেজ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় (পিএইচডি) থেকে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষা এবং গবেষণা করেছেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সুদীর্ঘকাল (১৯৭৫-২০০২) অধ্যাপনার পাশাপাশি আমেরিকার কলোরাডো কলেজে মেটাগ প্রফেসর থেকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে রাধাকৃষ্ণণ স্মারক লেকচারার- সর্বত্র বিদ্যাচর্চায় নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েই আত্মতৃপ্ত হননি তিনি, স্বভাবসুলভভাবেই নিজেকে আরও উন্নত, আরও সমৃদ্ধ করেছিলেন তিনি। হিন্দি, ওড়িয়া, অসমীয়া, সংস্কৃত, জার্মান, হিব্রু এবং ইংরেজি প্রভৃতি ভাষায় নবনীতা ছিলেন বিদুষী।

তার প্রেম ছিল নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের সঙ্গে। সেই প্রেম বিয়েতে গড়ায় ১৯৫৯-এ এবং সতেরো বছরে ১৯৭৬-এ বিবাহবিচ্ছেদও ঘটে। তবে, তাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অটুট ছিল আজীবন। ১৯৯৮ সালে অমর্ত্য সেন নোবেল পুরস্কার পেলে তিনি প্রবন্ধ লিখেন। আবার সে-সময়ের প্রেক্ষিতে একটি ছোটগল্পও লেখেন ‘জরা হটকে, জরা বাঁচকে, ইয়ে হ্যায় নোবেল মেরি জান’ নামে। 

আজীবন নিজের মতো বাঁচা এই লেখকের আজ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৯ সালের আজকের দিনে মারা যান নবনীতা। তিনি সাহিত্যজগতে আলো ছড়িয়ে যাবেন যুগের পর যুগ।

সময়ের আলো/মহু

  বিষয়:   জীবন  ডুবসাঁতার  একা  চলেছেন  নবনীতা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: