দ্বীপে আশ্রয় নেওয়া ‘হিরো কাউ’। ছবি : সংগৃহীত কসাইখানার ট্রাকে ওঠার আগমুহূর্তে লোহার বেড়া ভেঙে ছুট! এরপর হ্রদের পানিতে ঝাঁপ দিয়ে নির্জন দ্বীপে আশ্রয়। প্রায় এক মাস মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যায় গরুটি। সাহসী এই পলায়নের কারণে তার নাম হয় ‘হিরো কাউ’। কিন্তু এত লড়াইয়ের পরও শেষ পর্যন্ত বাঁচার স্বপ্ন পূরণ হয়নি তার।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৮ সালের ২৩ জানুয়ারিতে। পোল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বুকভ গ্রামের একটি খামার থেকে গরুটিকে কসাইখানায় নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। স্থানীয় পশু সংগ্রহকেন্দ্রের কর্মীরা তাকে ট্রাকে তোলার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ধরা দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না গরুটির। হঠাৎ লোহার বেড়া ভেঙে ছুটে পালিয়ে যায় সে।
পালিয়ে গরুটি সোজা চলে যায় কাছের নিসা হ্রদে। এরপর সাঁতরে আশ্রয় নেয় হ্রদের ছোট এক দ্বীপে। কর্মীরা পেছনে ধাওয়া করেও তাকে ধরতে পারেননি। শুরু হয় গরুটিকে ফিরিয়ে আনার নানা চেষ্টা। কিন্তু মানুষের হাত এড়িয়ে বারবার পালিয়ে যায় সে।
প্রথমে গরুটির মালিক নিজেই তাকে ধরার চেষ্টা করেন। দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও সফল না হওয়ায় ডাকা হয় দমকলকর্মীদের। তারাও উদ্ধার অভিযানে যোগ দেন। কিন্তু নৌকা নিয়ে কেউ কাছে গেলেই গরুটি পানিতে নেমে সাঁতরে অন্য দ্বীপে চলে যেত। কখনো তীরের কাছাকাছি এলেও মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে আবার পানিতে ঝাঁপ দিত।
এভাবে কয়েক সপ্তাহ মানুষের নাগালের বাইরে কাটিয়ে দেয় গরুটি। পরে মালিক দ্বীপে তার জন্য খাবার পৌঁছে দিতে শুরু করেন। এরই মধ্যে গরুটির পালিয়ে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়ে পোল্যান্ডের গণমাধ্যমে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয় আলোচনা। অনেকেই তার সাহস ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ের প্রশংসা করেন। সেখান থেকেই পরিচিতি পায় ‘হিরো কাউ’ নামে।
গরুটির গল্প নজর কাড়ে পোলিশ রাজনীতিবিদ পাওয়েল কুকিজের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি প্রাণীটিকে বাঁচানোর পক্ষে প্রচার শুরু করেন। তার বক্তব্য ছিল, সাহসিকতার জন্য গরুটিকে পুরস্কার হিসেবে শান্তিতে বেঁচে থাকার সুযোগ দেওয়া উচিত।
এদিকে, দেশটির একটি চিড়িয়াখানাও গরুটিকে আশ্রয় দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। তবে সে সময়ের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু নিয়মের কারণে সেখানে তাকে নেওয়া সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিজের খামারে গরুটিকে আশ্রয় দেওয়ার প্রস্তাব দেন। পরিকল্পনা ছিল, কসাইখানার বদলে সেখানেই নিরাপদে বাকি জীবন কাটবে তার।
২০১৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গরুটিকে ধরতে আবারও অভিযান শুরু হয়। এতে অংশ নেন একজন শিকারি, দুজন পশুচিকিৎসক ও তাদের সহকারীরা। কয়েক ঘণ্টার চেষ্টার পর নিসা হ্রদের কাছে তার সন্ধান পাওয়া যায়। নিয়ন্ত্রণে আনতে গরুটিকে ৩ বার চেতনানাশক প্রয়োগ করতে হয়। এরপর তাকে ট্রাকে তুলে নতুন আশ্রয়ের উদ্দেশে রওনা হন উদ্ধারকারীরা।
কিন্তু নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানো আর হলো না। গন্তব্যে যাওয়ার পথেই ট্রাকের মধ্যে মারা যায় গরুটি। ঠিক কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দীর্ঘদিন পালিয়ে বেড়ানো, শারীরিক দুর্বলতা ও তীব্র মানসিক চাপকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে সে সময়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধরার আগে পশুচিকিৎসকেরা গরুটিকে শারীরিকভাবে ভালো অবস্থায় দেখেছিলেন।
এত এত চেষ্টার পরও ‘হিরো কাউ’ পেল না স্বাধীনতার স্বাদ, মুক্ত বিহঙ্গের জীবন। তার এই পরিণতি কাঁদিয়েছিল অনেক মানুষকে।
সূত্র : স্কাই নিউজ, ফক্স নিউজ
সময়ের আলো/মহু