চাইনিজ মানি প্ল্যান্টের পাতায় নগর পরিকল্পনার গাণিতিক নকশা। ছবি : সংগৃহীত
বাড়ির টবে থাকা ছোট্ট একটি গাছের গোলাকার সবুজ পাতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে শহরের রাস্তা, স্কুল কিংবা হাসপাতালের অবস্থান নির্ধারণের গাণিতিক নকশা। এ বছর বিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় চাইনিজ মানি প্ল্যান্টের পাতায় এমনই এক বিস্ময়কর মিল খুঁজে পাওয়া গেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, চাইনিজ মানি প্ল্যান্টের পাতার প্রধান শিরাগুলোর বিন্যাস অনেকটা ভোরোনয় ডায়াগ্রামের মতো। এটি এমন একটি গাণিতিক পদ্ধতি, যার সাহায্যে কোনো নির্দিষ্ট এলাকার বিভিন্ন স্থানকে নিকটতম কেন্দ্রের ভিত্তিতে ভাগ করা হয়। নগর পরিকল্পনাসহ নানা ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ন্যাচার কমিউনিকেশনস-এ। গবেষকদের ধারণা, এই আবিষ্কার উদ্ভিদবিজ্ঞানের পাশাপাশি প্রকৌশল, নগর পরিকল্পনা ও নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভোরোনয় ডায়াগ্রাম কী? বিষয়টি সহজভাবে বোঝা যায় একটি শহরের স্কুলের উদাহরণ দিয়ে। ধরা যাক, একটি শহরে কয়েকটি স্কুল রয়েছে। এখন পুরো শহরকে এমনভাবে বিভিন্ন এলাকায় ভাগ করা হলো, যাতে প্রতিটি এলাকার শিশুরা নিজেদের সবচেয়ে কাছের স্কুলে যেতে পারে। অর্থাৎ, দূরত্বের ভিত্তিতে প্রতিটি স্কুলের জন্য নির্দিষ্ট সেবা এলাকা তৈরি করা হলো। এই ধরনের গাণিতিক বিন্যাসই ভোরোনয় ডায়াগ্রাম।
চাইনিজ মানিপ্ল্যান্ট। ছবি : সংগৃহীত
শুধু নগর পরিকল্পনা নয়, মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক, আবহাওয়ার বিশ্লেষণ, রোবটের চলাচল এবং কম্পিউটার গ্রাফিক্সেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
গবেষণার প্রধান লেখকদের একজন এলাইজা ব্লুম কয়েক বছর আগে বিষয়টি প্রথম লক্ষ্য করেন। যুক্তরাষ্ট্রের কোল্ড স্প্রিং হারবার ল্যাবরেটরিতে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করার সময় তিনি নিজের বোনের চাইনিজ মানি প্ল্যান্টের যত্ন নিচ্ছিলেন। তখনই গাছটির পাতার শিরাগুলোর সঙ্গে ভোরোনয় ডায়াগ্রামের মিল তার চোখে পড়ে। বিষয়টি তিনি তার তত্ত্বাবধায়ক কম্পিউটার বিজ্ঞানী সাকেত নাভলাখাকে জানান। এরপর শুরু হয় বিস্তারিত গবেষণা।
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা পাতার শিরা ও হাইডাথোড নামের ক্ষুদ্র ছিদ্রগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক পরীক্ষা করেন। হাইডাথোড হলো পাতার এমন বিশেষ ছিদ্র, যার মাধ্যমে গাছ অতিরিক্ত পানি বাইরে বের করে দেয়।
কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে গবেষকরা দেখতে পান, পাতা বড় হওয়ার সময় অক্সিন নামের উদ্ভিদ হরমোন প্রতিটি হাইডাথোড থেকে চারদিকে তরঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে। একাধিক তরঙ্গ পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হলে মাঝখানে সীমারেখা তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে সেই সীমারেখাগুলোই পাতার প্রধান শিরায় রূপ নেয়। অর্থাৎ, পাতার শিরাগুলোর জালের মতো বিন্যাস তৈরির পেছনে কাজ করে এক ধরনের প্রাকৃতিক গাণিতিক প্রক্রিয়া।
দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা উদ্ভিদের পাতায় জালের মতো শিরার নকশা তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করছেন। এই গবেষণা সেই রহস্যের একটি সম্ভাব্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সামনে এনেছে।
গবেষকদের দাবি, উদ্ভিদের পাতায় ভোরোনয় ডায়াগ্রামের উপস্থিতি শনাক্ত করার পাশাপাশি কীভাবে এই নকশা তৈরি হয়, তার প্রক্রিয়াও প্রথমবারের মতো ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
উদ্ভিদের পাতার শিরা শুধু গাছের পানি ও পুষ্টি পরিবহনের কাজেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, আধুনিক প্রযুক্তির নকশা তৈরিতেও এগুলো বিজ্ঞানীদের অনুপ্রাণিত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞানী লরেন স্যাকের মতে, পাতার শিরা নিয়ে আগের গবেষণাগুলো সৌর প্যানেল ও ইলেকট্রনিক সার্কিটসহ বিভিন্ন ধরনের বিতরণব্যবস্থার নকশা আরও কার্যকর করতে সহায়তা করেছে। পাতার শিরা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা গেলে প্রযুক্তিকে আরও দক্ষ ও নান্দনিকভাবে তৈরি করার সুযোগ বাড়বে।
চাইনিজ মানি প্ল্যান্ট কয়েন প্ল্যান্ট বা প্যানকেক প্ল্যান্ট নামেও পরিচিত। দক্ষিণ চীনের ইউনান ও সিচুয়ান অঞ্চলে জন্ম নেওয়া এই গাছ এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাড়ির অন্দরসজ্জায় ব্যবহৃত হয়।