মুন অ্যালার্টের পেইজ ঘাঁটাঘাঁটি করে নিখোঁজ হওয়া শিশুদের একটা প্যাটার্ন খুঁজে পেলাম। এদের সবার বয়স ৬ থেকে ১৬ বছরের ভেতর। সবচেয়ে বেশি নিখোঁজ হয়েছে ১১-১৩ বছর বয়সী শিশুরা।
অর্থাৎ, শিশুগুলোকে র্যানডমলি সিলেক্ট করা হচ্ছে না, বয়সের ডেমোগ্রাফিক অনুযায়ী সিলেক্ট করা হচ্ছে। হয়ত কাজটা কোনো দল পরিকল্পনা করে করছে। নাহলে, যেকোনো বয়সী শিশুই নিখোঁজ হওয়ার কথা ছিল!
অবশ্য এর আরেকটা কারণ হতে পারে। ৪-৫ বছর পর্যন্ত একটা শিশুকে তার অভিভাবকরা তুলনামূলক বেশি গার্ড দিয়ে রাখে, এর বেশি বয়সী শিশুরা সাধারণত স্কুলে থাকে, বিকেলে খেলার মাঠে থাকে, মানে আউটডোরে থাকার প্রবণতা বেশি থাকে বলে তাদের নিখোঁজ হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।
জানি না আমার এই অনুমান কতটা সঠিক, তবে এটুকু জানি, এখনো এই দেশে প্রায় ২ হাজার ১০০ শিশু নিখোঁজ। এখনই কোনো প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ না নিলে সংখ্যাটা বাড়বে বৈ কমবে না।
কিন্তু প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ কীভাবে নেওয়া যায়?
সিসি ক্যামেরা
আপনার ফ্ল্যাটের মেইন গেইট থেকে শুরু করে একদম ভবনের মেইন গেট পর্যন্ত একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা লাগান। যদি আগে থেকেই লাগানো থাকে, তবে এখনই চেক করবেন যে সবগুলো ক্যামেরা ঠিক মতো কাজ করে কিনা, ফুটেজ ঠিক মতো সংরক্ষিত থাকে কিনা এবং কার কাছে এগুলার অ্যাকসেস থাকে। চাওয়ামাত্রই যেন সেই অ্যাকসেস পাওয়া যায়।
অপ্রতিমের খুনি ধরা পড়েছে লাশ উদ্ধারের ২ ঘণ্টার ভেতর এবং সেটা সিসি ক্যামেরার ফুটেজের কল্যাণেই। সুতরাং, সিসি ক্যামেরা হচ্ছে এই কেসে আপনার আদি ও আসল বন্ধু।
আপনার শিশু স্কুলে থাকলে ক্লাসরুমে সচল সিসি ক্যামেরা আছে কিনা, ফুটেজ রাখা হয় কিনা, সে ব্যাপারে যতটা সম্ভব নিশ্চিত হন। দরকার হলে সব অভিভাবকরা মিলে দাবি তুলুন, আপনাদেরকে যেন মোবাইলে সিসি ক্যামেরার অ্যাকসেস দেওয়া হয়। দেশে একটা ক্রান্তিকাল চলছে, এই সময়ে এটা খুবই ন্যায্য দাবি। কর্তৃপক্ষ না মানলে বাচ্চাকে আর পড়াবেন না ওখানে।
আরেকটা কথা, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ করা জরুরি। কারণ, বেশিরভাগ ক্যামেরায় পুরনো ফুটেজ অল্প সময়ের মধ্যেই মুছে যেতে পারে। তাই দেরি করলে মূল্যবান ফুটেজ হারানোর শঙ্কা থাকে।
জিপিএস ট্র্যাকার
আপনার শিশু যদি স্কুল গোয়িং কিড হয়, তাহলে সে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে। অনলাইনে অনেক লোকেশন ট্র্যাকিং ডিভাইস পাওয়া যায়, এগুলো আকারে বেশ ছোট, দামেও সস্তা। মোটামুটি ঠিকঠাক কাজ করে। যেমন : মিলি মিট্যাগ অ্যান্ড্রয়েড লোকেশন ট্র্যাকার ডিভাইস, দাম ১ হাজার টাকার নিচে। নিজ দায়িত্বে যাচাই-বাছাই করে কিনবেন।
এগুলোর একটা আপনার শিশুর স্কুল-ব্যাগের ভেতরে সেলাই করে ফিক্স করে লাগিয়ে রাখবেন, বা ব্যাগের ভেতর গোপন পকেট বানিয়ে সেটার ভেতর রাখবেন। এগুলো ব্যাটারিতে চলে, আপনার মোবাইল ফোন থেকেই ওই স্কুল-ব্যাগের রিয়েল টাইম লোকেশন দেখতে পারবেন। খুব ইজি সেটাপ।
বাজারে আরেক ধরনের ডিভাইস পাওয়া যায়, ওগুলো মিট্যাগের চাইতেও ছোট, দেড় ইঞ্চি লম্বা, দাম ৬০০-৭০০ টাকা। ওগুলোর একটা রেখে দেবেন আপনার শিশুর স্কুলের পোশাকের গোপন পকেটে সেলাই করে, যাতে পকেট থেকে পড়ে গিয়ে হারিয়ে না যায়। মানে পোশাকেরটাকে প্রাইমারি ট্র্যাকার হিসেবে ধরলে, স্কুলে ব্যাগে থাকবে সেকেন্ডারি ট্র্যাকার। আপনি দুটোই ট্র্যাক করবেন।
এছাড়াও অনেক পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি আছে। যেমন শিশুদের জন্য বিশেষায়িত হাতঘড়ি, যা অভিভাবকের মোবাইলে নির্দিষ্ট সময় পরপর শিশুর হার্টরেট, ব্লাড প্রেশার এগুলোর রিডিং পাঠাবে! এটা অনেক ব্যয়বহুল গ্যাজেট। কিন্তু এমন ডিভাইস আপনার শিশু নিখোঁজ হওয়ামাত্র তাকে উদ্ধার করতে সহযোগিতা করতে পারে।
সম্ভব হলে সশরীরে শিশুকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আনুন
জিপিএস ট্র্যাকার লাগানো সত্ত্বেও আপনি চেষ্টা করবেন, আপনার শিশুকে সশরীরে স্কুল থেকে আনা-নেওয়া করার। ভুলেও কখনো বাসার বুয়া, দারোয়ান, কেয়ারটেকার বা আত্মীয়- এমন কাউকেই শিশুর ব্যাপারে বিশ্বাস করবেন না। বাড়তি সাবধানতা অবলম্বন করলে তা কখনো বৃথা যায় না।
আপনি যদি হোমমেকার হন, তবে চেষ্টা করবেন শিশুর স্কুলের সময়টাতে স্কুল প্রাঙ্গণেই থাকার, অন্তত আগামী কয়েকটা মাস। একটু পরপর ফোনে চেক করবেন যে, শিশুর লোকেশন ঠিকমতো দেখাচ্ছে কিনা। ক্লাসের ক্যামেরার অ্যাকসেস থাকলে, সেটাও মাঝে মাঝে চেক করবেন।
যদি চাকুরিজীবী হন, তাহলে আপনার একমাত্র ভরসা টেকনোলজি, মানে ট্র্যাকার ও সিসি ক্যামেরার লাইভ ফিড। অফিসে বসেও দেখতে পারবেন।
শিশুকে শিক্ষা দিন
এতকিছুর পরেও আপনি আলাদা করে আপনার শিশুকে ট্রেনিং দিন। এটি আজীবন ওর কাজে লাগবে। সে যেন অপরিচিত কারও সঙ্গে না যায়, তাদের দেওয়া কিছু না খায়, তাদের কোনো কথা বা রেফারেন্স যেন বিশ্বাস না করে, সন্দেহজনক ব্যবহার কীভাবে বুঝতে হয় সেগুলোও শেখান। কীভাবে ছেলেধরারা শিকার করে সেগুলো আলোচনা করুন। হারিয়ে গেলে মাথা ঠান্ডা রেখে কীভাবে কী করতে হবে, তা ধাপে ধাপে গাইডলাইন দিন আগে থেকেই। শিশুকে ‘হোম এলোন’ এর মতো কিডস মুভি দেখান, কিশোর উপন্যাস পড়ান। এসব ওকে স্ট্রিট স্মার্ট বানাবে।
আপনার সন্তান যেন তার বাবা-মায়ের ফোন নাম্বার মুখস্থ বলতে পারে, সেটা নিশ্চিত করবেন। সম্ভব হলে নানা-মামা-খালাসহ ২-৩ জন বিশ্বস্ত মানুষের নাম্বারও তাকে মুখস্থ করান। শিশুর বয়স ১০ হলে তাকে বাটন ফোন দিন, সেখানে শুধু নাম্বার সেভ করে রাখলে হবে না; ফোন হারিয়ে গেলে বা ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে যেন শিশু অন্তত একজন মানুষের কাছে গিয়ে বলতে পারে, ‘আমার আব্বুর নাম এই, আম্মুর নাম এই, এই নম্বরে ফোন করুন।’
ওকে এটাও শেখান- ‘হারিয়ে গেলে লুকিয়ে থাকবে না।’ কোনো দোকান, ফার্মেসি, স্কুল, পুলিশ বক্স, নিরাপত্তাকর্মী বা ইউনিফর্ম পরা দায়িত্বশীল মানুষের কাছে যাবে এবং নিজের পরিচয় ও বাবা-মায়ের নাম বলবে। অপরিচিত কেউ ‘চলো, তোমার বাবা-মায়ের কাছে নিয়ে যাচ্ছি’ বললেও তার সঙ্গে একা যাবে না।
সেলফ ডিফেন্স
শিশুর বয়স ৮ বছরের বেশি হলে তাকে আত্মরক্ষা, তায়কন্দো এসব শেখান, সাঁতার শেখান, সাইক্লিং শেখান, বেসিক রান্না শেখান। এগুলো তাকে দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী করবে।
ফ্যামিলি ইমার্জেন্সি প্রটোকল
আগে থেকেই আপনার পরিবারের একটা ইমার্জেন্সি প্রটোকল বানিয়ে রাখুন। কারণ, শিশু কোথাও সময়মতো না পৌঁছালে বা ফোনে পাওয়া না গেলে কে কাকে ফোন করবে, কে স্কুলে যাবে, কে বাসার আশেপাশে খুঁজবে, কে পুলিশে যোগাযোগ করবে- এসব তখন বসে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় থাকবে না।
নিখোঁজ হওয়ার প্রথম ১ টা ঘণ্টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ! এটাকে কৌশলে কাজে লাগাতে হবে। শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর আত্মীয়স্বজন সবাই আলাদা আলাদাভাবে খুঁজতে গেলে প্রচুর সময় নষ্ট হয়। দেখা যাবে, এক কাজ দুই গ্রুপ দুই ভাবে করছে, অথচ অন্য আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ কেউই করছে না! এটা যেন না হয়, সেজন্য আগে থেকেই গ্রুপভিত্তিক কাজ ভাগ করে নিন। যেমন-
টিম এ : শেষ দেখা জায়গা ও আশেপাশের রাস্তায় খুঁজবে।
টিম বি : বাসস্ট্যান্ড/রেলস্টেশন/রিকশা-স্ট্যান্ডে খুঁজবে।
টিম সি : আশেপাশের দোকান ও ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করবে।
টিম ডি : হাসপাতাল/ক্লিনিক/অজ্ঞাত শিশুর তথ্য দেখবে।
টিম ই : অনলাইন মিসিং বা মুন অ্যালার্টকে জানাবে।
টিম এফ : পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ ও জিডি এবং অভিযোগের অগ্রগতি চেক করবে।
প্রত্যেক টিমের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকবে। সে শিশুর বাবা-মাকে কাজ শেষ রিপোর্ট করবে। আমি বলছি না যে, এতগুলো টিমই লাগবে, আপনি যতগুলো টিম বানাতে পারেন আর কি। দরকার হলে একটা চেকলিষ্ট বানিয়ে সেটা ধরে কাজ করবেন।
ফ্যামিলি কোড ওয়ার্ড
শিশুকে একটা ‘ফ্যামিলি কোড ওয়ার্ড’ শেখান। মনে করুন, আপনি কাউকে দিয়ে আপনার সন্তানকে আনতে পাঠালেন। শুধু ‘আম্মু পাঠিয়েছে’ শুনেই যেন সে তার সঙ্গে চলে না যায়। তাকে বলবেন, যে-ই তোমাকে নিতে আসুক, আগে আমাদের নির্ধারিত কোড ওয়ার্ড তাকে বলতে বলবে। কোড ওয়ার্ড বলতে না পারলে তার সঙ্গে কোথাও যাবে না। মাঝেমধ্যে কোড ওয়ার্ড পরিবর্তনও করবেন।
এলাকায় পরিচিত করান
আপনার শিশুকে নিয়ে একদিন আপনার গলিতে থাকা সব দোকানে ঢুঁ মেরে আসতে পারেন। ওদেরকে বলবেন যে, আপনার সন্তানকে যদি কখনো কোথাও সন্দেহজনক অবস্থায় দেখে (অন্য কারও সঙ্গে বা কাঁদছে), তাহলে যেন সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে ফোন করে জানায়। আপনি ওই এলাকায় যত বেশি পুরনো বাসিন্দা হবেন, এই কাজে আপনার সফলতার হার তত বেশি।
কমিউনিটি গড়ে তুলুন
এসব কাজে সম্ভব হলে একটা কমিউনিটি বা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলুন। তাহলে বিপদে পড়লে কমিউনিটি বা নেটওয়ার্কের সবাই একযোগে কাজ করতে পারবেন। এতে দ্রুত সমস্যার সমাধান হতে পারে। এছাড়াও, কমিউনিটি কার্যক্রমের দৃশ্যমানতা ভালো। সব অভিভাবকদের বাড়তি সতর্কতামূলক অবস্থান দেখলে এমনিতেই ক্রিমিনালরা ভয় পেয়ে যায়।
বাবা-মায়ের জন্য নিয়ম
বাবা-মায়ের জন্যও একটা নিয়ম থাকা দরকার। শিশু নির্ধারিত সময়ে স্কুল থেকে বের হয়নি, বাসায় ফেরেনি, ফোন বন্ধ, তাহলে ‘আরেকটু দেখি, হয়ত চলে আসবে’ বলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করবেন না। সন্দেহ হলেই যত দ্রুত সম্ভব অ্যাকশন নিন।
স্কুলে ফোন, ড্রাইভার বা অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ, শেষ লোকেশন যাচাই, সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ, ট্র্যাকার চেক এবং প্রয়োজন হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো- সব একসঙ্গে শুরু করতে হবে। কারণ, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রতিটা সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ।
দোয়া পড়ান
শিশুকে প্রতিবার বাসা থেকে বের হওয়ার আগে এই দোয়া পড়ান- ‘বিসমিল্লাহে তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, লা-হাওলা ওয়ালা কুয়াতা ইল্লাবিল্লাহ!’ এটা শিশুকে মানসিক শক্তি দেবে, বিপদে পড়লে মনোবল হারাবে না।
পুলিশদের প্রতি অনুরোধ
পুলিশ ভাইদের কাছে অনুরোধ, দেশের এই পরিস্থিতিতে প্রতিটা থানায় শিশু নিঁখোজের কেসগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে নিন, ২৪ ঘণ্টার জন্য অপেক্ষা করবেন না। এই প্রটোকল অন্য নিয়মিত সময়ের জন্য, এই সময়ের জন্য না।
সময়ের আলো/মহু