সাত মাসে ১৫ হাজার শিশুর নিখোঁজের জিডি : কোথায় হারাচ্ছে আমাদের শিশুরা?

সাইফুল ইসলাম

মতামত

একটি শিশু নিখোঁজ হওয়া কোনো পরিবারের জন্য নিছক একটি ঘটনা নয়; এটি একটি ঘরের সমস্ত আলো হঠাৎ নিভে যাওয়ার মতো।

2026-09-08T22:59:58+00:00
2026-09-08T22:59:58+00:00
 
  বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৫ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
সাত মাসে ১৫ হাজার শিশুর নিখোঁজের জিডি : কোথায় হারাচ্ছে আমাদের শিশুরা?
সাইফুল ইসলাম
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৫৯ পিএম 
প্রতীকী ছবি
একটি শিশু নিখোঁজ হওয়া কোনো পরিবারের জন্য নিছক একটি ঘটনা নয়; এটি একটি ঘরের সমস্ত আলো হঠাৎ নিভে যাওয়ার মতো। যে মা প্রতিদিন সন্তানের জন্য দরজায় অপেক্ষা করেন, যে বাবা সন্তানের ফেরার শব্দ শুনতে কান পেতে থাকেন, যে ভাই-বোন প্রতিটি অপরিচিত মুখের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া আপনজনকে খুঁজে ফেরে—তাদের কাছে ‘নিখোঁজ’ শব্দটির অর্থ শুধু একটি প্রশাসনিক নথি নয়, বরং অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক এবং দীর্ঘ অপেক্ষা। অথচ বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে সাম্প্রতিক যে তথ্য সামনে এসেছে, তা ব্যক্তিগত বেদনার গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একাত্তর টেলিভিশনের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র সাত মাসে ১৫ হাজারের বেশি শিশুর 

নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি বা জিডি হয়েছে। সংখ্যাটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তবে এই সংখ্যাকে বুঝতে হলে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি—নিখোঁজের জিডি মানেই ১৫ হাজার শিশু অপহৃত হয়েছে, পাচারের শিকার হয়েছে কিংবা সবাই এখনো নিখোঁজ—এমন সিদ্ধান্ত টানা যাবে না। অনেক শিশু হয়তো কয়েক ঘণ্টা, কয়েক দিন কিংবা কিছু সময় পর পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। কেউ অভিমান করে বাড়ি ছেড়েছে, কেউ পথ হারিয়েছে, কেউ বন্ধুর সঙ্গে চলে গেছে, আবার কোনো কোনো ঘটনায় এর আড়ালে থাকতে পারে অপহরণ, মানবপাচার, শিশুশ্রম, যৌন শোষণ অথবা অপরাধী চক্রের সম্পৃক্ততা। কিন্তু এই ব্যাখ্যাগুলো সমস্যাটিকে ছোট করে না; বরং আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে আনে—নিখোঁজ হওয়ার পর প্রতিটি শিশুর কী পরিণতি হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব কি রাষ্ট্রের কাছে আছে?

Advertisement
এই প্রশ্নটিই আসলে বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতার জায়গা। একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় জিডি হয়, পুলিশ তাকে খোঁজে, কখনো পরিবার নিজেরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু শিশুটি পরে অন্য কোনো জেলা থেকে উদ্ধার হলে, কোনো হাসপাতাল বা আশ্রয়কেন্দ্রে পাওয়া গেলে কিংবা কোনো অপরাধের শিকার হয়ে থাকলে সেই তথ্য আগের জিডির সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে যুক্ত হয়—এ প্রশ্নের উত্তর সবসময় স্পষ্ট নয়। ফলে আমাদের কাছে নিখোঁজের সংখ্যা থাকতে পারে, উদ্ধার হওয়া শিশুর সংখ্যা থাকতে পারে, মানবপাচারের মামলা থাকতে পারে, শিশু নির্যাতনের আলাদা পরিসংখ্যান থাকতে পারে; কিন্তু একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার মুহূর্ত থেকে তার চূড়ান্ত পরিণতি পর্যন্ত পুরো যাত্রাপথের একটি সমন্বিত চিত্র অনেক সময় তৈরি হয় না।

এখানেই ‘নিখোঁজ’, ‘অপহরণ’ এবং ‘পাচার’—এই তিনটি শব্দের পার্থক্য বোঝা জরুরি। একটি শিশু নিখোঁজ হতে পারে নানা কারণে। পারিবারিক অশান্তি, অভিমান, দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া, পারিবারিক সহিংসতা, অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতি কিংবা নিছক পথ হারিয়ে যাওয়াও এর কারণ হতে পারে। আবার একই নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় অপরাধের উপাদানও থাকতে পারে। কোনো শিশু অপহৃত হতে পারে মুক্তিপণের জন্য, কোনো শিশু পাচার হয়ে যেতে পারে শ্রম বা যৌন শোষণের উদ্দেশ্যে, আবার কোনো শিশু অপরাধী চক্রের হাতে পড়ে যেতে পারে। তাই একটি নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়াই তদন্তের শেষ কথা হওয়া উচিত নয়; শিশুটি কেন নিখোঁজ হয়েছিল এবং তার সঙ্গে কী ঘটেছিল, সেটিও খুঁজে বের করা জরুরি।

বাংলাদেশে মানবপাচার যে একটি বাস্তব ও গুরুতর সমস্যা, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। UNICEF-এর ২০২৫ সালের Stopping the Traffic প্রতিবেদনে বাংলাদেশে নারী ও শিশু পাচারের ঝুঁকির সঙ্গে দারিদ্র্য, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, অনিরাপদ অভিবাসন এবং বিভিন্ন সামাজিক ঝুঁকির সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ১,২১০ জন মানবপাচারের ভুক্তভোগী শনাক্ত হয়েছিল; তাদের মধ্যে জোরপূর্বক শ্রম ও যৌন পাচারের শিকার মানুষও ছিল। এই সংখ্যা অবশ্যই নিখোঁজ শিশুদের সংখ্যা নয় এবং দুটিকে এক করে দেখাও ভুল হবে। কিন্তু এই তথ্য একটি বিষয় পরিষ্কার করে—দুর্বল ও অরক্ষিত মানুষকে ঘিরে পাচার ও শোষণের একটি বাস্তব ঝুঁকি বাংলাদেশে রয়েছে। ফলে কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে তদন্তের শুরুতেই শুধুমাত্র পারিবারিক সমস্যা বলে ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়।

প্রশ্ন হলো, শিশুরা কোথায় হারাচ্ছে? এর কোনো একক উত্তর নেই। তারা হারাতে পারে বাড়ি থেকে, স্কুলে যাওয়া-আসার পথে, বাজার বা জনসমাগমস্থল থেকে, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন বা লঞ্চঘাট থেকে। শিশুরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে কর্মসংস্থানের সন্ধানে শহরে এসে, শিশুশ্রমে যুক্ত হয়ে অথবা কোনো প্রতারণামূলক প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে। শহরের বস্তি ও অনিরাপদ আবাসন, গ্রামাঞ্চলের দারিদ্র্য, নদীভাঙন ও বাস্তুচ্যুতি, স্কুল থেকে ঝরে পড়া এবং পরিবারের আর্থিক সংকট—এসবও শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। UNICEF-এর বিশ্লেষণেও দারিদ্র্য, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি ও অনিরাপদ অভিবাসনের মতো কারণগুলোকে শিশু পাচারের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন এক বিপদ—ডিজিটাল জগৎ। একসময় একটি শিশুকে প্রলোভনে ফেলতে অপরাধীকে তার শারীরিক নাগালের মধ্যে যেতে হতো। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেমিং, মেসেজিং অ্যাপ কিংবা ভুয়া পরিচয়ের মাধ্যমে দূর থেকেই একটি শিশুর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা সম্ভব। প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, গোপন যোগাযোগ, দেখা করার প্রস্তাব—ধীরে ধীরে শিশুকে এমন একটি পরিস্থিতিতে নেওয়া যেতে পারে, যেখান থেকে সে পরিবার ও পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অনেক অভিভাবক সন্তানের অনলাইন জগত সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন না হওয়ায় এই ঝুঁকি আরও বাড়ছে। ফলে শিশু সুরক্ষার ধারণাকেও এখন ঘরের দরজা ও স্কুলের গেটের বাইরে নিয়ে যেতে হবে; ডিজিটাল জগতেও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের আরেকটি বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির। বাস্তুচ্যুত মানুষের ঘনবসতি, দারিদ্র্য, সীমিত সুযোগ এবং নিরাপত্তাজনিত জটিলতার কারণে সেখানে শিশুরা নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্যে থাকে। ২০২৫ সালের একটি Associated Press প্রতিবেদনে UNICEF-এর তথ্য উদ্ধৃত করে রোহিঙ্গা শিশুদের অপহরণ বা কিডন্যাপিংয়ের ঘটনা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। বাংলাদেশের সামগ্রিক নিখোঁজ শিশুর পরিসংখ্যানের সঙ্গে এই তথ্য সরাসরি যোগ করার সুযোগ নেই; কিন্তু এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে কোনো পরিবেশে শিশু যখন সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অরক্ষিত হয়ে পড়ে, তখন অপহরণ, পাচার ও অন্যান্য শোষণের ঝুঁকিও দ্রুত বাড়ে।

তবে এই সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত অপরাধের চেয়েও তথ্যব্যবস্থার দুর্বলতা। বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার জন্য পুলিশ, সমাজসেবা অধিদপ্তর, আদালত, হাসপাতাল, স্থানীয় প্রশাসন এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা কাজ করছে। কিন্তু একটি শিশুর তথ্য যদি এক প্রতিষ্ঠান থেকে আরেক প্রতিষ্ঠানে সহজে এবং নিরাপদভাবে স্থানান্তরিত না হয়, তাহলে তার পূর্ণাঙ্গ কেস হিস্ট্রি তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে। ধরা যাক, একটি শিশু ঢাকার একটি থানায় নিখোঁজ হলো। সেখানে জিডি হলো। কয়েক দিন পর শিশুটিকে খুলনায় পাওয়া গেল। তাকে হয়তো স্থানীয় কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হলো। পরে সমাজসেবা কর্তৃপক্ষ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করল। কিন্তু ঢাকার জিডি, খুলনায় উদ্ধারের তথ্য এবং আশ্রয়কেন্দ্রের নথি যদি একই কেস আইডির অধীনে যুক্ত না থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের কাছে একটি শিশুর গল্প তিনটি বিচ্ছিন্ন ঘটনায় পরিণত হতে পারে। শিশু বাস্তবে একবার হারিয়েছে, কিন্তু তথ্যের বিচ্ছিন্নতার কারণে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সে যেন বারবার হারিয়ে যায়।

এই জায়গায় একটি জাতীয় ‘Missing Children Database’ এখন সময়ের দাবি। প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর জন্য একটি ইউনিক কেস আইডি থাকতে পারে। সেখানে শিশুর ছবি, বয়স, লিঙ্গ, নিখোঁজ হওয়ার সময় ও স্থান, শেষ অবস্থান, জিডি বা মামলার নম্বর, সম্ভাব্য গন্তব্য, উদ্ধার হওয়ার তারিখ, কোথা থেকে উদ্ধার হয়েছে এবং উদ্ধারের পর শিশুর কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন—এসব তথ্য সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষিত থাকতে পারে। কোনো অজ্ঞাতপরিচয় শিশু উদ্ধার হলে তার পরিচয় যাচাইয়ের মাধ্যমে নিখোঁজ শিশুদের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যেতে পারে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থায় অবশ্যই শিশুর গোপনীয়তা, নিরাপত্তা এবং সর্বোত্তম স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

শুধু জাতীয় ডেটাবেস তৈরি করলেই অবশ্য সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন জেলা ও উপজেলা-ভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ। কোন এলাকায় সবচেয়ে বেশি শিশু নিখোঁজ হচ্ছে, কোন বয়সের শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে, ছেলে না মেয়ে কার নিখোঁজ হওয়ার প্রবণতা বেশি, কোন পরিবহনকেন্দ্র বারবার উঠে আসছে, কোথা থেকে বেশি শিশু উদ্ধার হচ্ছে, কোন অঞ্চলে পাচারের মামলা বেশি—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি জাতীয় ‘Child Missing Risk Map’ তৈরি করা যেতে পারে। তাহলে পুলিশ ও প্রশাসন অনুমানের ভিত্তিতে নয়, তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়াতে পারবে।

শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা প্রতিরোধে পরিবহনব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট, বিমানবন্দর এবং সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে শিশু সুরক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। একইভাবে হাসপাতাল, শিশু আশ্রয়কেন্দ্র ও সমাজসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিখোঁজ শিশু সংক্রান্ত জাতীয় তথ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা দরকার। কোনো অজ্ঞাত শিশু উদ্ধার হলে দ্রুত তার পরিচয় শনাক্ত করার ব্যবস্থা থাকলে অনেক পরিবার হয়তো দীর্ঘদিনের অপেক্ষা থেকে মুক্তি পেতে পারে।

এই সংকটে পুলিশের পাশাপাশি পরিবারের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, তার বন্ধু ও চলাফেরার বিষয়ে সচেতনতা, অনলাইন যোগাযোগ সম্পর্কে ধারণা এবং বিপদে পড়লে কোথায় সাহায্য চাইতে হবে—এসব বিষয়ে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আরও সক্রিয় হতে হবে। শিশুকে শুধু ভয় দেখিয়ে নিরাপদ রাখা যায় না; তাকে এমনভাবে সচেতন করতে হবে যাতে বিপদের পরিস্থিতিতে সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং বিশ্বাসযোগ্য কোনো প্রাপ্তবয়স্কের কাছে সাহায্য চাইতে পারে।

বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার জন্য সরকারি উদ্যোগও বিদ্যমান। ২০২৬ সালে নিখোঁজ ও অপহৃত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত ও উদ্ধারের জন্য Missing Urgent Notification বা MUN Alert চালুর উদ্যোগের কথা প্রকাশিত হয়েছে এবং এ-সংক্রান্ত তথ্য গ্রহণের জন্য ১৩২১৯ টোল-ফ্রি হেল্পলাইনের কথাও জানানো হয়েছে। পাশাপাশি শিশু সুরক্ষার জন্য Child Helpline 1098 রয়েছে। এসব উদ্যোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি হেল্পলাইন তখনই কার্যকর হবে যখন ফোন করার পর তথ্য দ্রুত সঠিক জায়গায় পৌঁছাবে, দ্রুত তদন্ত শুরু হবে এবং নিখোঁজ শিশুর তথ্য জাতীয় ব্যবস্থায় যুক্ত হবে। অর্থাৎ হেল্পলাইনকে একটি বিচ্ছিন্ন সেবা হিসেবে নয়, বরং একটি সমন্বিত শিশু-সুরক্ষা প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোনো শিশু ফিরে এলেই যেন রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ না হয়। তাকে কেন বাড়ি ছাড়তে হয়েছিল, সে কোথায় ছিল, কার সঙ্গে ছিল, কোনো অপরাধ বা শোষণের শিকার হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা দরকার। কারণ একটি শিশু ফিরে এসেছে মানেই সে নিরাপদ ছিল—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং উদ্ধার হওয়ার পর প্রয়োজন হতে পারে চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, পরিবারভিত্তিক কাউন্সেলিং এবং পুনর্বাসন।

সাত মাসে ১৫ হাজারের বেশি শিশুর নিখোঁজের জিডির তথ্য তাই শুধু একটি চমকপ্রদ সংখ্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একই সঙ্গে এটিকে ১৫ হাজার অপহরণ বা পাচারের ঘটনা হিসেবেও উপস্থাপন করা যাবে না। বরং এই সংখ্যা আমাদের সামনে একটি জরুরি প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কি আমাদের নিখোঁজ শিশুদের পরিণতি জানি?

কতজন ফিরে এসেছে, কতজন উদ্ধার হয়েছে, কতজন এখনো নিখোঁজ, কতজন অপহরণের শিকার হয়েছে, কতজন পাচারের শিকার হয়েছে, কতজন নির্যাতিত হয়েছে এবং কতজনের কোনো সন্ধানই পাওয়া যায়নি—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর প্রয়োজন। তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন, নিখোঁজ হওয়ার কারণগুলো শনাক্ত করা।

কারণ একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়া শুধু একটি পরিবারের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার একটি সতর্কসংকেত। প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পরিবার থেকে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। রাষ্ট্রের কাজ শুধু নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে বের করা নয়; এমন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে শিশুরা সহজে হারিয়ে যাওয়ার মতো অরক্ষিত অবস্থায় না পড়ে।

১৫ হাজার তাই শুধু একটি সংখ্যা নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি মুখ, একটি পরিবার, একটি মায়ের অপেক্ষা, একটি বাবার উৎকণ্ঠা এবং একটি শিশুর অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ।

আমাদের এখন শুধু জানতে হবে না—কত শিশু হারিয়েছে।

আমাদের জানতে হবে—তারা কোথায় হারিয়েছে, কেন হারিয়েছে, তাদের সঙ্গে কী ঘটেছে এবং রাষ্ট্র তাদের জন্য কী করেছে।

কারণ একটি শিশু হারিয়ে গেলে শুধু একটি পরিবার অন্ধকারে পড়ে না; একটি রাষ্ট্র তার ভবিষ্যতের একটি অংশ হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে।

সময়ের আলো/কেএইচও
  বিষয়:   সাত মাস  ১৫ হাজার  শিশু  নিখোঁজের জিডি  শিশু 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: