আজকের বিশ্ব মূলত একটি রাজনৈতিক চতুরঙ্গ। একাধিক শক্তি একই সঙ্গে চাল দিচ্ছে, জোট গড়ছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে ও প্রভাবের ক্ষেত্র বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন— প্রত্যেকেই নিজ স্বার্থে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। কেউ অর্থনৈতিক প্রণোদনা, কেউ সামরিক সহযোগিতা, কেউ বিনিয়োগ ও ঋণ, কেউ ভৌগোলিক ও নিরাপত্তাগত বাস্তবতা কাজে লাগিয়ে।
১৯৭৮ সালে মনোবিজ্ঞানী পলিন ক্ল্যান্স ও সুজান আইমস প্রথম ‘ইমপোস্টার ফেনোমেনন’ ধারণাটি উপস্থাপন করেন। সাধারণভাবে এটি এমন এক মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা, যেখানে ব্যক্তি বাস্তব যোগ্যতা ও অর্জন থাকা সত্ত্বেও নিজের সাফল্যকে পুরোপুরি প্রাপ্য বলে বিশ্বাস করতে পারেন না; বরং নিজেকে অযোগ্য, ভাগ্যবান কিংবা একদিন ধরা পড়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা একজন ‘প্রতারক’ মনে করেন। পরে স্পষ্ট হয়েছে, আত্মোপলব্ধি শুধু ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্বের বিষয় নয়; সামাজিক পরিবেশ, ক্ষমতার কাঠামো, সাংস্কৃতিক বয়ান ও গোষ্ঠীগত পরিচয়ও তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
এই লেখায় ‘ইমপোস্টার সিনড্রোম’ কোনো চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক রোগনির্ণয় নয়; বরং এটি একটি রাজনৈতিক-সমাজতাত্ত্বিক রূপক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। ব্যক্তি যেমন যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নিজেকে অযোগ্য ভাবতে পারেন, তেমনি কোনো রাষ্ট্রও নিজের কৌশলগত সক্ষমতা, ঐতিহাসিক শক্তি ও জাতীয় সম্ভাবনাকে অবমূল্যায়ন করতে পারে। তখন বহিরাগত শক্তির স্বীকৃতি, সুরক্ষা বা পৃষ্ঠপোষকতাকেই টিকে থাকার অপরিহার্য শর্ত মনে হয়। এটিকেই এখানে ‘রাষ্ট্রীয় ইমপোস্টার সিনড্রোম’ বলা হচ্ছে।
এটি প্রতিষ্ঠিত কোনো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব নয়; বরং রাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাস, নির্ভরশীলতা ও কৌশলগত আচরণ বোঝার একটি ব্যাখ্যামূলক রূপক। এর সঙ্গে গ্রুপথিংক, মোটিভেটেড রিজনিং ও সমষ্টিগত অস্বীকারের মতো সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার সম্পর্ক রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক অভিজাত গোষ্ঠী দীর্ঘদিন একই বয়ান পুনরুৎপাদন করলে তারা প্রায়শই নিজেদের পূর্বধারণা-সমর্থক তথ্যকে গুরুত্ব দেয় এবং বিপরীত তথ্যকে অস্বীকার বা তুচ্ছ করে। ধীরে ধীরে সেই বয়ান রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়ের অংশ হয়। তখন নির্ভরশীলতাকে বাস্তববাদ এবং আত্মবিশ্বাসকে ঝুঁকি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়; এভাবেই রাজনৈতিক মানসিকতা রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই কাঠামোতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতাও দেখা যায়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের দমনপীড়ন, ব্যাপক প্রাণহানি ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন রাষ্ট্রপরিচয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। এসব ঘটনার ব্যাখ্যায় মতভেদ থাকতে পারে এবং ইতিহাসের চূড়ান্ত মূল্যায়ন সময়ের হাতে ন্যস্ত থাকবে। তবে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আত্মপরিচয়, বৈধতা ও পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি হয়েছে।
পররাষ্ট্রনীতির মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়— কোন পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্ক সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ। প্রশ্ন হওয়া উচিত— বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ কী এবং সেই স্বার্থের আলোকে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে। কোনো রাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করা এবং সেই রাষ্ট্রের জনগণের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা এক বিষয় নয়। কিন্তু কোনো রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক শক্তিকে ঘিরে এমন আবেগীয় আনুগত্য গড়ে উঠলে, যা সমালোচনামূলক বিচারবোধ দুর্বল করে, তা সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের বিষয়।
আজকের বিশ্ব মূলত একটি রাজনৈতিক চতুরঙ্গ। একাধিক শক্তি একই সঙ্গে চাল দিচ্ছে, জোট গড়ছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে ও প্রভাবের ক্ষেত্র বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন— প্রত্যেকেই নিজ স্বার্থে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। কেউ অর্থনৈতিক প্রণোদনা, কেউ সামরিক সহযোগিতা, কেউ বিনিয়োগ ও ঋণ, কেউ ভৌগোলিক ও নিরাপত্তাগত বাস্তবতা কাজে লাগিয়ে।
এই চতুরঙ্গে একটি ছোট রাষ্ট্রের সামনে অন্তত চার বাস্তবতা থাকে— নিজের জাতীয় আত্মপরিচয়, নিকটবর্তী আঞ্চলিক শক্তি, বৃহত্তর বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতা এবং বিকল্প কৌশলগত অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা। তাই পররাষ্ট্রনীতি শুধু বন্ধুত্বের প্রশ্ন নয়, এই চার মাত্রার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার শিল্প।
এখানেই ‘রাষ্ট্রীয় ইমপোস্টার সিনড্রোম’ প্রাসঙ্গিক। কোনো রাষ্ট্র যদি মনে করে তার নিরাপত্তা, বৈধতা বা উন্নয়ন একমাত্র কোনো পরাশক্তির সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল, তবে তা শুধু কূটনৈতিক নির্ভরতা নয়; নিজের সক্ষমতার প্রতি আস্থাহীনতারও লক্ষণ হতে পারে। বাস্তববাদ দুর্বলতা স্বীকার করতে শেখায়, আত্মসমর্পণ নয়। রাষ্ট্র নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝবে, কিন্তু সম্ভাবনাকেও অস্বীকার করবে না।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা সরকারের শেষ পর্যায়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন একটি ধারণা দৃশ্যমান হয়েছিল— ভারতের সমর্থনকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। ফলে অনেকের কাছে সম্পর্কটি স্বাভাবিক কূটনৈতিক ভারসাম্যের বদলে অতিনির্ভরশীল বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, ঐতিহাসিক ও নিরাপত্তাগত কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের গুরুত্ব স্বীকার করা এবং তার কৌশলগত পরিসরের মধ্যে নিজের রাষ্ট্রনীতিকে সীমাবদ্ধ করা এক বিষয় নয়। ভারতের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কগুলো তাই আবেগের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে আমার পর্যবেক্ষণে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার সেই একমুখী মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতসহ প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি গড়ার চেষ্টা সফল হোক বা না হোক— জাতীয় আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠনের একটি রাজনৈতিক প্রচেষ্টা বলে মনে হয়েছে।
অবশ্য কোনো সরকারের সিদ্ধান্তই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। বাণিজ্য, নিরাপত্তা বা কৌশলগত সহযোগিতা নিয়ে মতভেদ স্বাভাবিক। কিন্তু মূল প্রশ্ন— বাংলাদেশ কি নিজের স্বার্থকে কেন্দ্র করে সবার সঙ্গে সম্পর্ক গড়বে, নাকি কোনো একটি শক্তির কৌশলগত পরিসরে নিজেকে স্থায়ীভাবে আবদ্ধ রাখবে?
এই লেখার উদ্দেশ্য শেখ হাসিনা সরকার, ড. মুহাম্মদ ইউনূস বা অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তির মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে মন্তব্য করা নয়। এটি এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমালোচনা, যেখানে রাষ্ট্র নিজের শক্তির ওপর আস্থা হারিয়ে বহিরাগত পৃষ্ঠপোষকতাকেই টিকে থাকার পূর্বশর্ত মনে করে। এই অর্থে ‘রাষ্ট্রীয় ইমপোস্টার সিনড্রোম’ একটি বিশ্লেষণধর্মী রূপক, চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক নির্ণয় নয়।
পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা আলোচনাটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও কৌশলগত সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সামর্থ্য, তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা দেখায়, আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সম্পদ ও দক্ষতা একত্র করার সম্ভাবনাও রাখে।
এখানে শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার আহ্বান নয়। শিক্ষা হলো— নিরাপত্তা ও উন্নয়নে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো শুধু বাইরের পরাশক্তির নিরাপত্তা ছাতার দিকে না তাকিয়ে নিজেদের মধ্যেও সহযোগিতার কাঠামো গড়তে পারে। আত্মবিশ্বাসী কৌশলগত অংশীদারিত্ব বিচ্ছিন্নতা নয়, নিজের স্বার্থ ও সক্ষমতার ভিত্তিতে সহযোগিতা নির্মাণ।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা আরও স্পষ্ট। কোনো জোটে যোগ দেওয়া বা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জাতীয় স্বার্থ, কূটনৈতিক ভারসাম্য ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তবে পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকাও বাস্তবসম্মত নীতি নয়। এই রাজনৈতিক চতুরঙ্গের বোর্ডে বাংলাদেশের কাজ কোনো একটি ঘুঁটির ছায়ায় নিজেকে নিরাপদ ভাবা নয়। নিজের অবস্থান বোঝা, শক্তি চিহ্নিত করা এবং কখন কার সঙ্গে কোন চাল বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করবে তা নির্ধারণ করাই কাজ। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য, তুরস্ক কিংবা অন্য যেকোনো শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে; কিন্তু ভিত্তি হবে বাংলাদেশের স্বার্থ, কারও প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়।
হয়তো এখানেই রাষ্ট্রীয় ইমপোস্টার সিনড্রোমের প্রতিষেধক। আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র একা চলার দাবি করে না; প্রয়োজনে জোট গড়ে, বন্ধু তৈরি করে, কৌশলগত অংশীদারিত্ব নির্মাণ করে। কিন্তু ভুলে যায় না— জোট রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার মাধ্যম, রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়ের বিকল্প নয়।
একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র কারও অধীনস্থ নয়। সে সীমাবদ্ধতা বোঝে, শক্তিগুলো চেনে এবং প্রয়োজনে সহযোগিতা গ্রহণ করে; কিন্তু নিজের অস্তিত্বের নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈধতা অন্যের হাতে তুলে দেয় না। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু সামরিক ক্ষমতা বা অর্থনীতিতে নয়; নিজের স্বার্থ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা এবং তা রক্ষার সাহসেও নিহিত। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু আমরা কতটা শক্তিশালী তা নয়; আমরা নিজেদের কতটা শক্তিশালী বলে বিশ্বাস করি এবং সেই বিশ্বাসকে কৌশল, প্রতিষ্ঠান ও বাস্তব রাষ্ট্রনীতিতে রূপান্তর করতে পারি কি না।
এই রাজনৈতিক চতুরঙ্গের শেষ প্রশ্নটি তাই রয়ে যায়— আমরা কি সত্যিই দুর্বল, নাকি দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের দুর্বল বলে বিশ্বাস করতে শিখেছি?
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে