মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিস : ভয় নয়, সাহসই পথ

ড. মোহাম্মদ আলী ওয়াক্কাস

মতামত

মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিস মূলত অটোইমিউন নিউরোমাসকুলার বালাই এবং বিরল রোগও বটে। যা মানবের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মাঝে অস্থিরতা এবং অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি

2026-09-06T04:11:22+00:00
2026-09-06T04:11:22+00:00
 
  রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২২ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিস : ভয় নয়, সাহসই পথ
ড. মোহাম্মদ আলী ওয়াক্কাস
প্রকাশ: রোববার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:১১ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিস মূলত অটোইমিউন নিউরোমাসকুলার বালাই এবং বিরল রোগও বটে। যা মানবের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মাঝে অস্থিরতা এবং অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি করে। শরীরের ঐচ্ছিক মাংসপেশি ও স্নায়ুর সংযোগস্থলের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। তবে আশার কথা হলো, এসবে অন্যরা সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা নেই। এ রোগ কেন হয়, তার রহস্য আজও অজানা।

মানুষ সৃষ্টিকর্তার অতি প্রিয় জীব।  আল্লাহ গর্ব করেই তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের আবির্ভাব ঘটিয়েছেন। যারা সমাজ-সংস্কৃতিতে সৃষ্টির প্রতিনিধিত্ব করবে। জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি জাগতিক শারীরিক, মানবিক উৎকর্ষতা এবং আধ্যাত্মিকতার মাঝেই নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করে সমাজ, সংসার এবং জগতের জন্য নিজেকে অপরিহার্য করে তুলবে। তবে এ যাত্রা কখনো কুসুমাস্তীর্ণ নয়। সুখ-দুঃখ, সুস্থতা-অসুস্থতা, দৌলত-অভাব, শান্তি-অশান্তি, ভালো-মন্দ— এসব যেন নিত্যকার সাথি। 

Advertisement
চাইলেই কি সবসময় ভালো থাকা যায়? সর্বাবস্থায় মানসিক প্রশান্তি এবং সক্ষমতার মাঝেই সার্থকতা। এ ক্ষেত্রে অস্থিরতা, অধৈর্য ও অকৃতজ্ঞতার কোনো সুযোগ নেই। নিমগ্ন হলেই আম-ছালা হারানোর আশঙ্কা থাকে। যা সৃষ্টির সেরা জীবের তকমার সঙ্গে বেমানান। রোগবালাই জীবনের স্বাভাবিক প্রপঞ্চ। এখানে কারও হাত নেই। তাই বলে কি বিচলিত হতে হবে? সাহস, ধৈর্যের সঙ্গে অভিযোজনই বাতলে দিতে পারে বিকল্প পথ। 

পৃথিবীতে যেমন নানা পদের রোগের উপস্থিতি রয়েছে, এসবের আবার বালাইও রয়েছে। খোঁজে নিয়ে খাপ খাওয়াতে পারলেই কেবল বেঁচে থাকার রসদ মিলবে। মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিস এমন এক রোগ, যা কেবল মানসিক সাহস নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, নিয়মিত ওষুধ সেবন এবং সামাজিকতার সঙ্গে অভিযোজনই দেখাতে পারে উতরানোর আলো।

মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিস মূলত অটোইমিউন নিউরোমাসকুলার বালাই এবং বিরল রোগও বটে। যা মানবের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মাঝে অস্থিরতা এবং অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি করে। শরীরের ঐচ্ছিক মাংসপেশি ও স্নায়ুর সংযোগস্থলের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। তবে আশার কথা হলো, এসবে অন্যরা সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা নেই। এ রোগ কেন হয়, তার রহস্য আজও অজানা। 

এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মন, মগজ, চিন্তা এবং স্বাভাবিক গতিপথে অস্বাভাবিকতা তৈরি করে, যার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে অনেক বেগ পেতে হয়। দীর্ঘদিনের চিরচেনা জগৎ, অভ্যাস, সম্পর্ক, সামাজিকতা, কর্মস্থল— এসবে নিজেকে শুরুতে অপরিচিত এবং অদ্ভুত মনে হলেও মানিয়ে নেওয়ার কসরতের মাঝেই বাঁচার লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে।

মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিসের ক্ষেত্রে ইমিউন সিস্টেম শরীরের নিজস্ব কোষকে ক্ষতিকর ভেবে আক্রমণ করে বসে। মানবের মস্তিষ্ক থেকে নার্ভের মাধ্যমে পেশিতে সাধারণত সিগনাল যায় এবং নিউরোট্রান্সমিটার পেশিতে সিগন্যাল বহনকারী হিসেবে কাজ করে। এখানে বিপত্তিই অস্বাভাবিকতা তৈরি করে।

কীভাবে অনুমেয় হবে আমাদের শরীরে এ রোগের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে? সাধারণত যেসব উপসর্গ দেখে বোঝা যাবে, তা মূলত কথা বলতে সমস্যা হওয়া, খাবার চিবানো এবং গলদকরণে অস্বাভাবিকতা, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দুর্বলতা, ক্লান্তি, পেশির দুর্বলতা, ঘাড়ের পেশি দুর্বলতা, শ্বাসপেশির দুর্বলতা, দৈনন্দিন কাজে প্রভাব, দ্বৈত দৃষ্টি, চোখের পাতা ঝুলে যাওয়া, মাথা সোজা রাখতে অসুবিধা হওয়া, চোখে ক্লান্তি এবং গরম ও ঠান্ডায় নার্ভে অস্বাভাবিকতা। 

সচরাচর এ রোগের চিকিৎসা এবং রোগ নির্ণয়ের সুযোগ কম রয়েছে। এসবে চিকিৎসক, জনগণ এবং সমাজেরও ধারণার ঘাটতি রয়েছে। রোগ নির্ণয়ে ব্যর্থতা, অপচিকিৎসা এবং কিছু বালাইয়ের অপপ্রয়োগ আক্রান্ত ব্যক্তিকে ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে। 

এ ক্ষেত্রে বিশেষায়িত নিউরো বিশেষজ্ঞের মতামত, পরামর্শ অনুসরণের মাঝেই নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাভাবিকতার স্বাদ আস্বাদনের সম্ভাবনা থাকে। সাধারণত অঈযজ অহঃরনড়ফু ঞবংঃ, গঁঝক অহঃরনড়ফু ঞবংঃ, জবঢ়বঃরঃরাব ঘবৎাব ঝঃরসঁষধঃরড়হ (জঘঝ), ঝরহমষব ঋরনৎব ঊগএ, ঈঞ ঝপধহ, গজও এবং চঁষসড়হধৎু ঞবংঃ-এর মাধ্যমে রোগ শনাক্ত করা হয়ে থাকে।

এ রোগ যেহেতু নিত্যসঙ্গী, এর সঙ্গে বসবাস করে যাপিতজীবন সাঙ্গ করা লাগবে। কীভাবে নিয়ন্ত্রণ ও অভিযোজিত হবে? সাবধানতা এবং ধারাবাহিকতা জরুরি। পলকেই ঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এসবে অবশ্য মনোবল, সাহস এবং প্রত্যয়ের বিকল্প নেই। সর্বদাই ভাবতে হবে, আমরা করব জয়। বিশ্বব্যাপী এ রোগ ব্যবস্থাপনার প্রটোকল একই ধরনের। 

চুৎরফড়ংঃরমসরহব উপসর্গ নিয়ন্ত্রণকারী দাওয়া। চৎবফহরংড়ষড়হ, অুধঃযরড়ঢ়ৎরহব, ঞৎধপৎড়ষরসঁং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকারী। থাইমাস অপারেশন এবং জরুরি ক্ষেত্রে চষধংসধ ঊীপযধহমব, ওঠওএ-এর প্রয়োজন হতে পারে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সাবধানে থাকতে হবে। অন্য সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা ও জীবনাচরণ তার পক্ষে সম্ভব নয়।

এসব মাথায় রেখেই জীবনাচরণের নিশানা বের করতে হবে। হোঁচট খেলেও ঘাবড়ানো যাবে না। চাইলেই কি সবকিছু করা যাবে? আক্রান্ত ব্যক্তিকে যেসব বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি, তা হলো— চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন না করা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুদ রাখা, সংক্রমণ এড়িয়ে চলা, গরমে দীর্ঘ সময় না থাকা, পরিবার এবং কর্মস্থলকে অবহিত করা, পরিচয়পত্র তৈরি করে সঙ্গে রাখা, বিষণ্নতা ও উদ্বিগ্নতা যাতে গ্রাস করতে না পারে, পরিবার ও সমাজের মানসিক সমর্থন, অস্বাভাবিক পরিবেশ এড়িয়ে চলা, অতিরিক্ত পরিশ্রম না করা, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়ানো, এসবে নিজের হাত নেই তা ভেবেই মেনে নেওয়া, চারপাশের মানুষজন এসব রোগীকে মানসিক সমর্থন জোগানো, রোগীর নার্ভের পরিস্থিতি বুঝে সমাজ, পরিবার, স্বজন-প্রতিবেশীর দরদমাখা সমর্থন। রোগবালাই জীবনের অংশ। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অনেকেই জীবদ্দশায় কঠিন পীড়ায় ভোগে দিনাতিবাহিত করেছেন। 

নবী-রাসুলের অসুস্থতা আমাদের শেখায়, অসুস্থ হওয়া আল্লাহর অসন্তুষ্টির প্রমাণ নয়। বরং অসুস্থতার সময় চিকিৎসা গ্রহণ, দোয়া এবং ধৈর্যধারণ— এসব হলো ইসলামের শিক্ষা। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এমন মর্যাদা নির্ধারিত থাকে, যা সে তার আমলের মাধ্যমে লাভ করতে সক্ষম ছিল না, তখন আল্লাহ তার দেহ, সম্পদ অথবা তার সন্তানকে বিপদগ্রস্ত করেন। অতঃপর তাকে সেই বিপদে ধৈর্য ধারণের সক্ষমতা দান করেন। 

অবশেষে তাকে সেই মর্যাদায় পৌঁছিয়ে দেন, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ছিল।’ পবিত্র কুরআন মাজিদের সুরা বাকারার ১৫৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে; আর তুমি সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের।’ রোগ মুমিনের জন্য পরীক্ষা। 

যাতে সে অসহায়ত্ব অনুভব করতে পারে এবং সিজদায় লুটিয়ে পড়ে নিজেকে স্রষ্টার কাছে সোপর্দ করতে পারে। আল্লাহ তায়ালা যাচাই করেন, কারা কৃতজ্ঞ এবং কারা অকৃতজ্ঞ। কারা ধৈর্য ধারণ করে এবং কারা ধৈর্যহারা হয়ে যায়। এই পরীক্ষায় যারা ধৈর্যধারণ করবে, তাদের জন্য রয়েছে প্রভুর পক্ষ থেকে অপরিমেয় পুরস্কার। এ এক বিশাল সুসংবাদ।

মায়াস্থেনিয়া অপ্রচলিত এবং বিরল রোগ হওয়ায় হয়তো আমরা একটু পরে ঘাবড়ে যাই। আশার কথা, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে সঠিক রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও ফলোআপের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ভালো থাকা যায়। চাকরি, ব্যবসা, সমাজ ও পারিবারিক জীবন স্বাভাবিকভাবে যাপন করা সম্ভব। 

কেবল প্রয়োজন মানসিক দৃঢ়তা ও মনোবল। জন্মিলে মরিতে হবে— এ ধ্রুব সত্যকে কি চাইলেই ভুলে থাকা যাবে? পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কেবল বিপত্তি দেখা দেয়, চেনা জগৎ হঠাৎ অপরিচিত মনে হয়। কাছের মানুষ দূরে চলে যাবে এবং অনেকে বোঝা মনে করবে। যেহেতু আর অন্য সাধারণ মানুষের মতো পাখির মতো ঘুরতে বাধা, তার দ্বারা যেহেতু অনেকের প্রয়োজন ও সঙ্গ অপূর্ণ থাকবে, তার সঙ্গে মিশে কী লাভ? 

ফলে বিষণ্নতা, চাপ, উদ্বিগ্নতা এবং হতাশা গ্রাস করে ফেলার আশঙ্কা থাকতে পারে। থোড়াই কেয়ার করে যদি নতুনভাবে বাঁচার বিকল্প পথ খোঁজা যায়, তা হলে জীবনের স্পন্দন, স্নিগ্ধতা, সরলতা এবং বিশুদ্ধতা আগের চেয়েও ঢের বেশি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে গাছপালা, ফুল-ফলাদি, সন্তান ও পরিবার এবং কাছের মানুষই হতে পারে নিয়ামক।

আল্লাহ চাইলে এক নিমিষেই সব অন্ধকার দূর করে আলো দেখাতে পারেন। এ ব্যাপারে যদি হেলেন কিলার, জন মিল্টন ও অরোনিমা সিংহার কথা ভাবি, তারা শত প্রতিকূল শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্ব জয় করে ফেলেছেন, তার তুলনায় এসব নস্যি। কেবল প্রয়োজন সাহস, মনোবল এবং স্রষ্টার সানুগ্রহ। ছন্দপতন ঘটবে, সামলে নিয়ে আগামীর পানে হাঁটতে হবে। 

এ যাত্রায় নতুনভাবে সখ্য ঘটবে ধৈর্য, মানবিকতা, সাহস এবং কৃতজ্ঞতায়। সুযোগ মিলবে স্রষ্টার প্রিয় বান্দার তকমা লাগিয়ে পৃথিবীর সফর সমাপ্তি করে অনাবিল যাত্রার।

লেখক : অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে
  বিষয়:   মায়াস্থেনিয়া  গ্রাভিস  ভয় নয়  সাহসই পথ  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: