যে পরিবর্তন প্রত্যাশা করেছিলাম, তা ঘটেনি

সমীরণ রায়

মতামত

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, তেল-বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু ইস্যু নিয়ে দৈনিক সময়ের আলোর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক

2026-09-05T01:09:01+00:00
2026-09-05T01:17:28+00:00
 
  শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২১ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
যে পরিবর্তন প্রত্যাশা করেছিলাম, তা ঘটেনি
সমীরণ রায়
প্রকাশ: শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:০৯ এএম  আপডেট: ০৫.০৯.২০২৬ ১:১৭ এএম
ছবি : সংগৃহীত
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, তেল-বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু ইস্যু নিয়ে দৈনিক সময়ের আলোর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের উপদেষ্টা খালেকুজ্জামান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন 
নিজস্ব প্রতিবেদক সমীরণ রায়

সময়ের আলো : আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ। যারা গণহত্যা বা অন্যায়-অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিচার হওয়া উচিত, এ কথা যেমন বলা হচ্ছে, তেমনি দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ রাখার পক্ষে-বিপক্ষেও আলোচনা আছে। এ বিষয়ে আপনার মত কী?

Advertisement
খালেকুজ্জামান : আমাদের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। এর নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু এটি আওয়ামী লীগের যুদ্ধ ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা, আওয়ামী লীগও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি, অন্যরাও পারেনি। আমরা মনে করি, কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডই নিষিদ্ধ হওয়া উচিত নয়। কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তার সুনির্দিষ্ট বিচার হতে পারে। অভিযোগের বিচার হবে, জনমত গঠনেরও সুযোগ থাকবে। কিন্তু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে জনগণের মতামত গঠনের প্রক্রিয়া এবং একটি সুষ্ঠু রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথে বাধা তৈরি হয়।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন কি? 

আওয়ামী লীগ তাদের অপকর্মের জন্য জবাবদিহি করবে এবং তাদের বর্তমান পরিণতির জন্য তারাই দায়ী। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক অধিকার হরণ, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি করা দেশের জন্য ভালো নয়। ভুল চিন্তাকে সঠিক চিন্তা দিয়ে, রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে। এক স্বৈরাচারকে উৎখাত করে আরেক ধরনের স্বৈরাচারী ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়ে কাউকে দমন করার চেষ্টা করা হলে মানুষ দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পাবে না। এতে গণঅভ্যুত্থানের অর্জনই বিসর্জনে যেতে পারে।

জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামি দলগুলোর বর্তমান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কীভাবে দেখছেন?

জামায়াতে ইসলামী স্বাধীনতাবিরোধী একটি শক্তি। তারা ধর্মের নামে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে। ১৯৭১ সালে তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় জনগণের ক্ষোভ, হতাশা ও বিক্ষোভকে পুঁজি করে তারা নিজেদের পুনর্বানের করার চেষ্টা করেছে। এখন তারা ক্ষমতার কাছাকাছি এসেছে। ফলে মানুষ তাদের প্রকৃত চরিত্র আরও কাছ থেকে দেখতে পারছে। 

বর্তমান সরকারের প্রায় ছয় মাস পার হয়েছে। সরকার নিজেও বলছে, তাদের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ শেষ। এই ছয় মাসে সরকারের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সার্বিক কর্মকাণ্ডকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আমরা আগেই বলেছি, এখানে মূলত একটি পোশাকি পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু মূলে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, সেটি জনগণের অংশগ্রহণে হয়েছে। অথচ সেই জনগণই এখন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এই সরকারের ছয় মাসের সময়ে একদিকে কিছু মানুষের হাতে পুঁজি আরও সঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবন চরম অনিশ্চয়তা, অশান্তি, দুর্ভোগ ও দুর্দশার মধ্যে পড়েছে। ফলে আমরা যে পরিবর্তন প্রত্যাশা করেছিলাম, সেটি ঘটেনি।

দেশে বর্তমানে গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট চলছে। দীর্ঘদিন ধরে আপনারা এ বিষয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করছেন। বর্তমান পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছেন?

আন্তর্জাতিক পরিসরে একটা সংকট আছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি আছে, বিশ্ব পরিস্থিতিরও প্রভাব রয়েছে। কিন্তু সংকট মোকাবিলায় পরিকল্পনা, সঠিক কর্মপন্থা গ্রহণ এবং জনগণকে এর সঙ্গে যুক্ত করার যে প্রয়োজন ছিল, সেটা হয়নি। এর ফলে জনকল্যাণমুখী কার্যক্রম পরিচালনার পরিবর্তে একটি সুবিধাভোগী ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর তৎপরতা বেড়েছে। সংকটের মধ্যেও মানুষকে যতটা স্বস্তি দেওয়া সম্ভব ছিল, যতটা জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ নেওয়া যেত, তা নেওয়া হয়নি। এর প্রধান কারণ হলো পরিকল্পনার অভাব, সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়া এবং পুরো ব্যবস্থাকে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করতে না পারা। এ কারণেই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।


সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বর্তমান পরিস্থিতি কীভাব দেখছেন? 

সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অবনমন না হলে আমরা এই দুরবস্থায় পড়তাম না। আমাদের শিক্ষার মান ধ্বংস করা হয়েছে। তিন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করে শিক্ষাকে খণ্ডিত করা হয়েছে। শিক্ষার মান এমন পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে যে, শিক্ষার্থীরা ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান তো দূরের কথা, আমাদের জাতীয় সক্ষমতার যে মান তৈরি হয়েছিল, তার থেকেও অনেক পিছিয়ে পড়েছে। ১৯৪৭ সাল থেকে বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে আমরা এগিয়েছি এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। 

কিন্তু স্বাধীনতার পর পিছনে হাঁটতে হাঁটতে আবার যেন ১৯৪৭ সালের কাছাকাছি চলে এসেছি। সংস্কৃতি ও রাজনীতি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। রাজনৈতিক আন্দোলন সংস্কৃতিচেতনাকে শক্তিশালী করে, আবার সংস্কৃতিচেতনাও রাজনৈতিক আন্দোলনকে পুনর্গঠিত করে। একটি সুস্থ দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য সাংস্কৃতিক জাগরণ দরকার। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক জাগরণের জন্যও একটি সুস্থ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন।

দীর্ঘদিন ধরে আপনারা বাম ও প্রগতিশীল শক্তির ঐক্যের কথা বলে আসছেন। কিন্তু সেই ঐক্য কতদূর এগুলো?

সময় দিয়ে আদর্শের বিচার হয় না। কোনো কোনো সময় একটি ন্যায়নীতিবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য শত বছর, এমনকি হাজার বছরও লেগে যেতে পারে। আবার অল্পসময়েও বড় সাফল্য আসতে পারে। আমাদের অনেক দুর্বলতা ও ঘাটতি আছে। কিন্তু আমরা নীতিহীন অবস্থানে যাইনি এবং ভবিষ্যতেও যাব না। ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট পাওয়ার জন্য অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। হয়তো একটি নির্দিষ্ট সময়ে এর সাফল্য খুব স্পষ্টভাবে দেখা যায় না। 

কিন্তু সেটি প্রদীপশিখার মতো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্বলতে থাকে। মানুষের মধ্যে আশা, ভরসা ও নীতিষ্ঠতার আবহ তৈরি করে। প্রগতিশীল শক্তি যত দুর্বল হবে, অনাচারের শক্তি তত বাড়বে। আন্তর্জাতিক থেকে জাতীয়, সব ক্ষেত্রেই আমরা এটি দেখতে পাচ্ছি। বিপরীতভাবে বাম ও প্রগতিশীল শক্তি যদি শক্তি সঞ্চয় করতে পারে, তা হলে অপশক্তি দুর্বল হতে থাকবে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে
  বিষয়:   পরিবর্তন  প্রত্যাশা  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: