ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান—কথাটি শুনতে যতটা সহজ, বাস্তবে তা নিশ্চিত করা ততটাই কঠিন করে রেখেছে পুলিশ, বিশেষ করে রাষ্ট্রের ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে। তবে বৃহস্পতিবার রাজধানীর সার্কিট হাউজ রোডে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি সেই পুরোনো ধারণাকে কিছুটা হলেও ভেঙে দিয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের পতাকাবাহী গাড়ি উল্টোপথে যাওয়ার অভিযোগে থামিয়ে দেয় ট্রাফিক পুলিশ। শুধু থামিয়ে দেওয়াই নয়, গাড়িটির চালকের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করা হয়। জরিমানা করা হয় ৬ হাজার টাকা। ঘটনাটি ঘটে সকাল ৯টা ৮ মিনিটের দিকে। গাড়িতে তখন মন্ত্রী নিজেও ছিলেন।
যেই সময় মন্ত্রীর গাড়িটি উল্টোপথে যাচ্ছিল, একই সময়ে পাশের সড়ক দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর সচিবালয়ের দিকে যাচ্ছিল।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর ট্রাফিক সিগন্যাল মেনেই চলছিল। ফলে ঘটনাটি কেবল একটি ট্রাফিক মামলায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, দেশজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
রাজধানীর সড়কে উল্টোপথে গাড়ি চলা নতুন কোনো ঘটনা নয়। যানজট এড়াতে কিংবা দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির গাড়ি প্রায়ই উল্টোপথে চলে। গণমাধ্যমেও এমন ঘটনা বহুবার এসেছে। কিন্তু এবার একজন মন্ত্রীর গাড়ির বিরুদ্ধে সরাসরি মামলা হওয়াকে ট্রাফিক কর্মকর্তারাই বলছেন ‘নজিরবিহীন’। প্রশ্ন হলো, এত দিন তাহলে কী হয়েছে?
আইন যদি সবার জন্য সমান হয়, তাহলে মন্ত্রীর গাড়িকে উল্টোপথে চলতে দেওয়ার কোনো সুযোগ থাকার কথা নয়। আবার সাধারণ নাগরিকের গাড়ির ক্ষেত্রে যে আইন প্রয়োগ করা হয়, একই আইন মন্ত্রীর গাড়ির ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হবে—এটাই তো স্বাভাবিক। সেই অর্থে আজকের মামলা কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়, বরং এটাই হওয়ার কথা ছিল স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতায় ঘটনাটি ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একজন ট্রাফিক কর্মকর্তা বলছেন, বাংলাদেশে কোনো মন্ত্রীর গাড়ি উল্টোপথে চলার অভিযোগে মামলা হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। যদি সত্যিই তাই হয়, তাহলে এত দিন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আমলা কিংবা অন্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের গাড়ি উল্টোপথে চললেও সেগুলোর বিরুদ্ধে একইভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন—সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশ্নটিও এসে যাচ্ছে।
আরেকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। একটি গাড়িতে পতাকা লাগানো থাকলেই কি সেই গাড়ি ট্রাফিক আইনের ঊর্ধ্বে চলে যাবে? রাষ্ট্রের একজন মন্ত্রী নিশ্চয়ই সাধারণ নাগরিকের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আইনের চোখে তিনি কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ? বরং দায়িত্ব যত বড়, আইন মানার দায়ও তত বেশি হওয়ার কথা ছিল।
এখানে মন্ত্রীর ব্যক্তিগতভাবে আইন ভাঙার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ কম। পুলিশের মামলাও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে হয়নি, তার গাড়ির চালকের বিরুদ্ধে হয়েছে। তবে ওই সময় স্বয়ং মন্ত্রী গাড়িতে ছিলেন, ফলে মন্ত্রীর সম্মতি ছাড়া তার ড্রাইভার উল্টোপথে যেতে পারার কথা নয়।
প্রশ্ন হলো, এই ঘটনা থেকে আমরা সবাই শিক্ষা নেব কি না? ‘ক্ষমতার গাড়ি’ও কি সাধারণ গাড়ির মতোই এখন থেকে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়াবে? নাকি একটি ‘নজিরবিহীন’ ঘটনা ঘটিয়ে কিছু বাহবা কুড়িয়ে পুলিশ আগের অবস্থাই চলতে দেবে?
মন্ত্রীর গাড়িতে মামলা হয়েছে, এটি যদি সত্যিই আইনের স্বাভাবিক প্রয়োগের শুরু হয়, তাহলে এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু এই প্রয়োগ যেন শুধু আজকের ঘটনা হয়েই না থাকে। রাস্তায় আইন ভাঙা অন্য সব ‘ক্ষমতাবান গাড়ি’র ক্ষেত্রেও একই নিয়ম কার্যকর করতে হবে।
কারণ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় বড় বড় বক্তব্যে নয়; বরং একটি পতাকাবাহী গাড়িকে থামিয়ে সাধারণ গাড়ির মতোই আইনের আওতায় আনার মধ্য দিয়ে। প্রশ্ন তাই ৬ হাজার টাকার জরিমানা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো—উল্টোপথে চলা গাড়ি থামানোর এই ‘সাহস’ কি নিয়মে পরিণত করা হবে? নাকি ঘটনাটি কেবল একটি ‘ব্যতিক্রমী গল্প’ হয়েই থাকবে?
সময়ের আলো/কেআই