ভ্যাপসা গরমের এক নির্ঘুম রাত। হাতপাখার একটানা শব্দে ক্লান্ত মায়ের চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে, কিন্তু কোলঘেঁষে শুয়ে থাকা শিশুটির কান্নায় ছেদ পড়ছে না। ওদিকে কাল সকালেই হয়তো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা, তাই মোমবাতি বা চার্জার লাইটের ক্ষীণ আলোয় চোখ কুঁচকে বইয়ের পাতায় দৃষ্টি আটকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে এক কিশোর। এটা বাংলাদেশের শহর থেকে গ্রাম প্রায় প্রতিটি জনপদের এক অতি পরিচিত এবং বেদনাদায়ক আখ্যান।
আধুনিক সভ্যতায় বিদ্যুৎ কোনো বিলাসী পণ্য বা নিছক স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয় নয়, এটি আজ আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের মতোই জরুরি। অথচ, লোডশেডিংয়ের এই অমানিশা আমাদের দৈনন্দিন জীবন, আবেগ আর অর্থনীতিকে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। একটি দেশের প্রতিটি নাগরিক যখন দিন শেষে একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারে না, তখন সেই কষ্ট কেবল ব্যক্তিপর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা একটি জাতির সামগ্রিক মনস্তত্ত্ব ও উৎপাদনশীলতাকে গভীরভাবে আঘাত করে।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এর স্বপ্নযাত্রায় আমরা যখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পা বাড়িয়েছি, ঠিক তখনো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে থমকে দাঁড়াচ্ছে আমাদের উৎপাদনমুখী অর্থনীতির চাকা। গ্রামের ক্ষুদ্র খামারি, পোশাক শিল্পের ঘর্মাক্ত শ্রমিক থেকে শুরু করে শহরের ব্যস্ত মুদি দোকানি সবার চোখেমুখে আজ এক অজানা শঙ্কা। একদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের নির্মম প্রভাব, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় সিস্টেম লস, অপরিকল্পিত চুক্তি বা দুর্নীতির কালো ছায়া— সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম হয়েছে। কৃষকের জমিতে সেচের পাম্প যখন বিদ্যুতের অভাবে বন্ধ থাকে, তখন কেবল ফসলই শুকায় না, শুকিয়ে যায় কৃষকের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। শিল্প-কারখানায় উৎপাদনের চাকা থেমে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের রফতানি আয়ে এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের রুটি-রুজিতে। এ এক এমন দুষ্টচক্র, যা থেকে বেরিয়ে আসা কেবল জরুরিই নয়, বরং জাতীয় স্বার্থেই অপরিহার্য।
বিদ্যুতের এই বহুমাত্রিক সংকট নিয়ে কথা বলার সময় আমরা প্রায়শই আমাদের আইনি অধিকারের দিকটি ভুলে যাই বা এড়িয়ে চলি। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকদের জীবনযাত্রার মৌলিক উপাদানগুলো নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এর পাশাপাশি ভোক্তা হিসেবে আমাদের অধিকারগুলোও বেশ স্পষ্ট। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আইন, ২০০৩ অনুযায়ী ভোক্তাদের ন্যায্যমূল্যে মানসম্মত বিদ্যুৎ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। বাস্তবে দিনের পর দিন বিদ্যুৎ থাকছে না, অথচ মাস শেষে ভূতুড়ে বিল এসে হাজির হচ্ছে। ফলে এই আইনের প্রয়োগ এবং কার্যকারিতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগাই স্বাভাবিক।
নিরবচ্ছিন্ন সেবা পাওয়ার শর্তে আমরা যে বিল পরিশোধ করি, সেই সেবা না পাওয়াটা স্পষ্টতই ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ সালের লঙ্ঘন। সেবার এই ঘাটতির জন্য জবাবদিহিতার যে আইনি কাঠামো থাকা দরকার, তার প্রয়োগ আমাদের দেশে অত্যন্ত দুর্বল। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো— ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’-এর আওতায় যে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে, তা। অনেক বিশেষজ্ঞের মতেই এই দায়মুক্তি বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পথে একটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আইনের সুযোগ নিয়ে প্রতিযোগিতাহীনভাবে যেসব চুক্তি হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির ওপর বিশাল বোঝার সৃষ্টি করেছে।
তবে এই নিশ্ছিদ্র অন্ধকার থেকে মুক্তির কি কোনো পথ নেই? অবশ্যই আছে। এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন রাষ্ট্রের সদিচ্ছা, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং দূরদর্শী, টেকসই পরিকল্পনা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য শক্তির বিপ্লব হতে পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের সবচেয়ে বড় আলোকবর্তিকা। আমাদের দেশে সফলতার দৃষ্টান্ত খুব একটা কম নয়। উদাহরণস্বরূপ ‘সোলার হোম সিস্টেম’-এর কথা বলা যায়। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) মাধ্যমে দেশের লাখ লাখ গ্রামীণ পরিবারে সৌরবিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার যে প্রাথমিক সাফল্য আমরা দেখেছি, তাকে এবার আরও আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বৃহত্তর পরিসরে কাজে লাগাতে হবে। দেশের বিভিন্ন দুর্গম চরাঞ্চল, যেমন সন্দ্বীপ বা কুতুবদিয়ার যেসব অংশে একসময় জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ পৌঁছানো অকল্পনীয় ছিল, সেখানে সোলার প্যানেল বা বায়ুবিদ্যুৎ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আমূল বদলে দিয়েছে। এই সফল দৃষ্টান্তগুলো আমাদের পথ দেখাতে পারে।
সরকারি ভবনের বিশাল ছাদ, শিল্প-কারখানার চালা এবং অনাবাদি পতিত জমিতে ব্যাপকভাবে সৌর প্যানেল স্থাপন করে আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির ওপর আমাদের বিপজ্জনক নির্ভরশীলতা অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারি। পাশাপাশি আইনি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অসম চুক্তিগুলোর পুনর্মূল্যায়ন করা এখন সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি। বিদ্যুৎ খাতের রেন্টাল বা কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে করা চুক্তিগুলো আইনি কাঠামোর আওতায় এনে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করতে হবে।
বিতর্কিত দায়মুক্তি আইন বাতিল করে এই খাতে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের ব্যবস্থা করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা বা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং বিইআরসিকে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে দিতে হবে। এ ছাড়া উন্নত প্রযুক্তির স্মার্ট গ্রিড এবং স্মার্ট মিটার স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুতের চুরি ও সিস্টেম লস শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। এর পাশাপাশি নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। দিনের বেলা অপ্রয়োজনে বাতি বা এসি জ্বালিয়ে রাখার যে অপচয়ের সংস্কৃতি আমাদের মধ্যে বাসা বেঁধেছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
একটি স্বাধীন ও অগ্রসরমাণ দেশের জীবনীশক্তি হলো তার জ্বালানি নিরাপত্তা। বিদ্যুৎহীনতার এই অবর্ণনীয় কষ্ট, সন্তানের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন মায়ের বিনিদ্র রজনি আর শিক্ষার্থীর ঘামে ভিজে যাওয়া বইয়ের পাতা আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমরা এখনও আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারিনি। তবে আমরা কোনোভাবেই হতাশায় নিমজ্জিত হতে চাই না। সঠিক আইনি কাঠামোর প্রয়োগ, নবায়নযোগ্য শক্তির সর্বোচ্চ ও পরিকল্পিত ব্যবহার এবং সরকার ও জনগণের সম্মিলিত আন্তরিক প্রচেষ্টায় এই আঁধার একদিন ঠিকই কেটে যাবে। আমাদের দৃঢ় প্রত্যাশা শিগগিরই বাংলাদেশের আকাশে এমন এক স্নিগ্ধ ভোর আসবে, যেখানে লোডশেডিংয়ের বিভীষিকা থাকবে না, বরং নিরবচ্ছিন্ন আলোর ধারায় আলোকিত হবে এ দেশের প্রতিটি প্রাণ, প্রতিটি ঘর আর প্রতিটি সম্ভাবনাময় স্বপ্ন।
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি