নাগরিকদের রোজকার দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাস। বিদ্যুৎ কখন যাবে আর কখন আসবে, গ্যাসের চুলায় হাঁড়ি চাপানো যাবে কি না তারা সেই দুর্ভাবনায় থাকেন দিবানিশি। পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং।
গত শুক্রবার দিনের বেলাতেই সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াট। গ্রাম থেকে শহর, বাসাবাড়ি থেকে শিল্প-কারখানা ধুঁকছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটে। শিল্প-কারখানায় উৎপাদন কমছে। অনেক কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে।
দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, উৎপাদনের সক্ষমতাও আছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ৩৩ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। সমস্যা হচ্ছে, পর্যাপ্ত জ্বালানি নেই।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এর দামও বেড়েছে। জানুয়ারিতে স্পট মার্কেটে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ছিল ১০-১১ ডলার। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে এই দাম হয়েছে প্রায় ২২ ডলার। বেশি দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় কার্গো পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৪২ শতাংশের বেশি গ্যাসভিত্তিক। প্রায় সাড়ে ১২ হাজার সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বড় একটি অংশ পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না। এসব কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না।
গ্যাসের ঘাটতির পাশাপাশি কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। কারিগরি ত্রুটি ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে পটুয়াখালীর পায়রা এবং কক্সবাজারের মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সব মিলিয়ে দেশে বড় ধরনের বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
সংকটের এক দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে। পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমার কারণে অনেক পরিবার বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছে। এতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশের জ্বালানি আবার গ্যাস। শিল্প ও সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি সংকট অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। শিল্প খাতে উৎপাদন কমলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উৎপাদন ব্যাহত হলে পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সংকট মোকাবিলায় সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের পর কয়েকটি এলএনজি কার্গো আসার কথা রয়েছে। দেশীয় গ্যাস উত্তোলন বাড়াতে ১৫০টি কূপ খনন ও পুনর্খননের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। ভোলা থেকে মূল ভূখণ্ডে গ্যাস আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করা হবে। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে স্বল্পমেয়াদে সমস্যার সমাধান করাও গুরুত্বপূর্ণ। সেটা না হলে নাগরিক দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হবে, শিল্প-কারখানা চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। কয়লা বা তরল জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো যায় কি না সেটা ভেবে দেখা যেতে পারে।
দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সংকটের তীব্রতা কমিয়ে আনা যায়। সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সিস্টেম লস কমাতে হবে। সময়মতো বিদ্যুৎকেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে আকস্মিক বিপর্যয় সামলানো সহজ হয়। চাহিদা নিরূপণ করে কয়লা ও তরল জ্বালানির মজুদ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় এলএনজি কার্গো সংগ্রহে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সরকারকে জ্বালানি নিরাপত্তায় বেশি জোর দিতে হবে। আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। প্রাকৃতিক গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলন বেগবান করা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। স্থলভাগের পাশাপাশি সমুদ্র অঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে হবে। সৌরবিদ্যুৎকে শুধু ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়নের বাধা দূর করতে হবে।
সেপ্টেম্বরে কার্গো এলে হয়তো লোডশেডিং কিছুটা কমবে, গ্যাসের সরবরাহও স্বাভাবিক হতে পারে। তবে বর্তমান সংকটের শিক্ষা ভুলে গেলে চলবে না। দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় বিকল্প উৎস যত বেশি হবে ঝুঁকি তত কমবে।
সময়ের আলো/এসএকে