গুমের ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সত্য জানা। একজন নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবার জানতে চায়- তিনি কোথায়, তার সঙ্গে কী ঘটেছে এবং তার অবস্থান সম্পর্কে রাষ্ট্রের কাছে কী তথ্য রয়েছে। সত্য জানার অধিকার কোনো অনুগ্রহ নয়। এটি মানবাধিকারের মৌলিক প্রশ্ন। কোনো ব্যক্তি আটক বা হেফাজতে থাকলে তার অবস্থান, আটকের আইনগত কারণ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি।
একজন মানুষ হঠাৎ নিখোঁজ হলেন। পরিবার জানে না তিনি কোথায়, কী অবস্থায় আছেন কিংবা তার সঙ্গে কী ঘটেছে। স্বজনরা থানায় যান, বিভিন্ন দফতরে যোগাযোগ করেন, পরিচিতজনদের কাছে খোঁজ নেন- কিন্তু নিশ্চিত কোনো উত্তর পান না। সময় গড়ায়, অপেক্ষা দীর্ঘ হয়, অথচ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটে না। জোরপূর্বক গুমের সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা এখানেই- একজন মানুষকে অদৃশ্য করে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি পরিবারকেও দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়।
প্রতি বছর ৩০ আগস্ট পালিত হয় আন্তর্জাতিক জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের দিবস। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৫/২০৯ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে দিবসটির স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য জোরপূর্বক গুমের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিখোঁজ ব্যক্তিদের ভাগ্য ও অবস্থান সম্পর্কে সত্য উদঘাটন এবং দায়মুক্তির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্বকে সামনে আনা।
জোরপূর্বক গুম সাধারণ নিখোঁজের ঘটনা নয়। কোনো ব্যক্তিকে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করার পর তার অবস্থান অস্বীকার বা গোপন রাখা হলে তার মৌলিক অধিকার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে পরিবারও প্রিয়জন সম্পর্কে সত্য জানার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
একজন মানুষের অনুপস্থিতি তখন একটি পরিবারের প্রতিটি দিনকে অনিশ্চিত করে তোলে। সন্তানের কাছে মা বা বাবার অনুপস্থিতি, বৃদ্ধ মা-বাবার অপেক্ষা কিংবা স্বামী-স্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ- সব মিলিয়ে তৈরি হয় গভীর মানবিক সংকট।
গুমের ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সত্য জানা। একজন নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবার জানতে চায়- তিনি কোথায়, তার সঙ্গে কী ঘটেছে এবং তার অবস্থান সম্পর্কে রাষ্ট্রের কাছে কী তথ্য রয়েছে। সত্য জানার অধিকার কোনো অনুগ্রহ নয়। এটি মানবাধিকারের মৌলিক প্রশ্ন। কোনো ব্যক্তি আটক বা হেফাজতে থাকলে তার অবস্থান, আটকের আইনগত কারণ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি।
২০২৬ সাল জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। জোরপূর্বক গুম থেকে সব মানুষকে সুরক্ষার আন্তর্জাতিক কনভেনশন ২০০৬ সালে গৃহীত হয়। দুই দশক পর এর পূর্তি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য নতুন করে অঙ্গীকার মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের জন্য ৩০ আগস্টের এই দিবসের গুরুত্ব বিশেষ। দেশে দীর্ঘদিন ধরে জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবার, মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অতীতের অভিযোগ অনুসন্ধানে গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের কাছে জমা পড়া অভিযোগগুলো বিভিন্ন সময়ের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত কমিশন ১৮৫০টির বেশি অভিযোগ পেয়েছিল বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে। কমিশন এসব অভিযোগের একটি বড় অংশ তদন্তও করেছিল। তবে এই সংখ্যা ২০২৫ সালে নতুন করে সংঘটিত গুমের সংখ্যা নয়। এগুলো মূলত অতীতের অভিযোগের তদন্ত-পরিধি বোঝায়। ফলে পরিসংখ্যানটি বাংলাদেশের অতীতের সংকটের ব্যাপ্তি এবং সত্য উদঘাটনের প্রয়োজনীয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের গুম-সংক্রান্ত আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অভিযোগগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের আওতায় আনা। তদন্ত কমিশনের কাজের মাধ্যমে বহু পরিবার তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও অভিযোগ সামনে আনার সুযোগ পেয়েছে। বহু বছরের ভয় ও নীরবতার পর পরিবারগুলোর কথা প্রকাশ্যে আসা নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। তবে তদন্তের ক্ষেত্রে শুধু অভিযোগ গ্রহণ যথেষ্ট নয়। প্রতিটি অভিযোগের তথ্য যাচাই, প্রমাণ সংরক্ষণ, সাক্ষ্য গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণ করতে হবে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশের আলোচনায় শুধু অতীতের তদন্ত নয়, ভবিষ্যতে গুম প্রতিরোধের জন্য আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও গুরুত্ব পেয়েছে। জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য নতুন আইনি উদ্যোগ এবং জাতীয় মানবাধিকার কাঠামো শক্তিশালী করার প্রস্তাব সামনে এসেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও কার্যকর তদন্তক্ষমতা, স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ৩০ আগস্ট জোরপূর্বক গুম থেকে সব মানুষকে সুরক্ষার আন্তর্জাতিক কনভেনশনে যোগ দেয়। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার তৈরি করেছে।
জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধের প্রথম শর্ত হলো আইনের শাসন। কোনো ব্যক্তিকে আটক করা হলে তার আইনগত ভিত্তি থাকতে হবে। কোথায় তাকে রাখা হয়েছে, কোন কর্তৃপক্ষ তাকে হেফাজতে নিয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে- এসব তথ্য যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা প্রয়োজন। আটক ব্যক্তির সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ, আইনজীবীর সহায়তা এবং বিচারিক নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।
গুম প্রতিরোধে বিচার বিভাগের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তিকে বেআইনিভাবে আটক করা হয়েছে কি না, তার অবস্থান সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য সঠিক কি না এবং তার মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত আছে কি না- এসব বিষয়ে কার্যকর বিচারিক নজরদারি প্রয়োজন। হেফাজতকেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন, আটক ব্যক্তিদের তথ্য যাচাই এবং অভিযোগের দ্রুত শুনানি গোপন আটক প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ন্যায়বিচার শুধু অপরাধীর শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে কার্যকর প্রতিকার দেওয়াও ন্যায়বিচারের অংশ। যেসব পরিবার দীর্ঘদিন আর্থিক, সামাজিক বা মানসিক সংকটের মধ্যে রয়েছে, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকা দরকার। ক্ষতিপূরণ, আইনি সহায়তা, প্রয়োজনীয় সামাজিক সুরক্ষা এবং পরিবারের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ একটি মানবিক রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ হতে পারে।
গুমের ঘটনা অনুসন্ধান ও জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই বিষয়ে সাংবাদিকতাকে হতে হবে দায়িত্বশীল ও তথ্যনির্ভর। যাচাইহীন তথ্য, গুজব বা রাজনৈতিক বক্তব্যকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারের ব্যক্তিগত কষ্টকে প্রচারের উপকরণে পরিণত করাও অনুচিত। নথি যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষার মাধ্যমে গণমাধ্যম সত্য উদঘাটনের সহায়ক শক্তি হতে পারে।
মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী, গবেষক ও নাগরিক সমাজ গুম প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের কাজ শুধু অভিযোগ প্রকাশ করা নয়; তথ্য সংরক্ষণ, আইনি সহায়তা, নীতিগত সংস্কারের প্রস্তাব এবং জনসচেতনতা তৈরিতেও সক্রিয় ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। তবে সব ক্ষেত্রেই প্রমাণনির্ভরতা ও ভুক্তভোগীদের গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে।
আজ কোনো রাজনৈতিক মতের মানুষ যদি অধিকারবঞ্চিত হন, আগামী দিনে অন্য মতের মানুষও একই পরিস্থিতির শিকার হতে পারেন। তাই গুম প্রতিরোধের নীতি হতে হবে সর্বজনীন। নাগরিকের রাজনৈতিক পরিচয়, পেশা, সামাজিক অবস্থান বা মতামত যা-ই হোক, আইনের সুরক্ষা সবার জন্য সমান হতে হবে।
জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো দায়মুক্তির সংস্কৃতি। কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তির পরিচয় বা পদমর্যাদা যদি তাকে আইনের আওতার বাইরে রাখে, তা হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধের ঝুঁকি থেকে যায়।
২০২৫ সালের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সামনে অতীতের অভিযোগের সত্য উদঘাটনের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করেছে। ২০২৬ সালের উদ্যোগগুলো দেখাচ্ছে, শুধু তদন্ত নয়- ভবিষ্যতে গুম প্রতিরোধে স্থায়ী আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়- রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব মানুষের জীবন, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা। কোনো মানুষ নিখোঁজ হলে তার পরিবারের প্রশ্নকে উপেক্ষা করা যায় না। সত্যকে আড়াল করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
অতীতের অভিযোগের সত্য উদঘাটনের পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য এমন শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো পরিবারকে প্রিয়জনের সন্ধানে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে না হয়। তদন্ত হতে হবে স্বাধীন, বিচার হতে হবে ন্যায়সংগত এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে থাকতে হবে জবাবদিহির আওতায়। গুমের বিরুদ্ধে লড়াই কোনো ব্যক্তি, দল বা মতের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকারের পক্ষে অবস্থান। একজন নাগরিকের পরিচয় যাই হোক, তার নিরাপত্তা ও মর্যাদা সমানভাবে সুরক্ষিত হওয়া উচিত। ৩০ আগস্ট তাই শুধু স্মরণের দিন নয়; এটি সত্য, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও জবাবদিহির পক্ষে নতুন অঙ্গীকারের দিন।
গুমের সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই হোক আমাদের লক্ষ্য- যেখানে কোনো নাগরিক আইনের সুরক্ষার বাইরে থাকবেন না, কোনো পরিবার সত্য জানার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাও কখনো আইনের ঊর্ধ্বে উঠবে না। মানুষের অধিকার রক্ষা করাই রাষ্ট্রের শক্তি; আর সত্য ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই একটি সভ্য সমাজের প্রকৃত পরিচয়।
লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/এসএকে