বাংলাদেশের উন্নয়ন খাত দীর্ঘদিন ধরে দেশের বৃহত্তর শ্রমবাজারের নানাবিধ সংকট ও অনিশ্চয়তা থেকে নিজেদের একটি ব্যতিক্রমী ও আদর্শিক ক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মী, প্রকল্প কর্মকর্তা, পরামর্শক এবং গবেষকদের এতদিন বেশ ভাগ্যবান মনে করা হতো- তারা শিক্ষিত, কর্মচঞ্চল, আন্তর্জাতিক অর্থায়নে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এবং একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা উদ্দেশ্যবোধ থেকে চালিত।
কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোর ঘটনাপ্রবাহ উন্মোচন করেছে যে এই বাহ্যিক চিত্রটি কতটা বিভ্রান্তিকর ছিল। আকর্ষণীয় পেশাগত পদবি এবং প্রগতিশীল লক্ষ্য বিবৃতির আড়ালে, বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনাকারী হাজার হাজার মানুষ আজ আবিষ্কার করছেন যে তারাও অত্যন্ত অনিরাপদ এক শ্রমশক্তির অংশ। স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি এতদিন ধরে যে নিরাপত্তাহীনতা চাপিয়ে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক দাতাসংস্থাগুলোর অর্থায়নের একটি সিদ্ধান্তই তাদের ঠিক একই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে মার্কিন সহায়তার আকস্মিক স্থবিরতা এই অন্তর্দাহকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর কাজের স্থগিতাদেশ জারি হলে তার ধাক্কা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পুরো উন্নয়ন খাতে ছড়িয়ে পড়ে। বেকার উন্নয়ন পেশাজীবীদের সংগঠনের তথ্যমতে বাংলাদেশে মার্কিন উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত ৫৯টি প্রকল্পের মধ্যে ৫৫টিই বন্ধ হয়ে গেছে এবং এর ফলে দেশ প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন সহায়তা হারিয়েছে। ওই সংগঠনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, কর্মসূচি ব্যবস্থাপক, মাঠ কর্মকর্তা, গবেষক ও সামাজিক সংগঠকসহ প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি উন্নয়ন পেশাজীবী প্রায় রাতারাতি জীবিকা হারিয়েছেন।
বেসরকারি সংস্থাবিষয়ক ব্যুরোর তথ্যমতে সরাসরি মার্কিন অর্থায়নপুষ্ট ৮৭টি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় ১০ হাজারেরও বেশি কর্মী সরাসরি নিয়োজিত ছিলেন এবং তাদের মাধ্যমে আরও প্রায় ২৪০টি সহযোগী সংস্থা মাঠপর্যায়ে কাজ পরিচালনা করত। এই কর্মীদের প্রায় সবাই ছিলেন চুক্তিভিত্তিক এবং অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তারা কোনো প্রকার চাকরিচ্যুতিজনিত ক্ষতিপূরণ বা আর্থিক সুবিধা পাননি। সম্পর্কিত উপাত্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশে মার্কিন সহায়তার পরিমাণ বিগত অর্থবছরের ৩৭১ মিলিয়ন ডলার থেকে আশঙ্কাজনকভাবে কমে বর্তমান অর্থবছরে মাত্র ১৬৪ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে- যা মাত্র এক বছরের ব্যবধানে অর্ধেকেরও বেশি হ্রাস পাওয়ার শামিল।
এই পরিসংখ্যানের পেছনের মানবিক ক্ষতি কেবল কোনো শুষ্ক হিসাব নয়, এটি অত্যন্ত নির্মম এক বাস্তব। শিশু সুরক্ষা কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ তীব্রভাবে কমে গেছে এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলার সেবাগুলো অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। ফলে যেসব নারী ও শিশু এতদিন নিরাপদ আশ্রয় ও সুরক্ষা সেবার ওপর নির্ভর করতেন, তাদের আজ যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই।
অন্যদিকে কিছুটা অপ্রত্যাশিতভাবেই অভিজ্ঞ ও মধ্য পর্যায়ের পেশাজীবীরাই পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে সবচেয়ে বেশি সংগ্রাম করছেন। বছরের পর বছর ধরে সুনির্দিষ্ট কারিগরি দক্ষতা অর্জন করা এসব বিশেষজ্ঞ দেখছেন যে, বেসরকারি নিয়োগকর্তারা এমন কাউকে সুযোগ দিতে দ্বিধা করছেন যাদের পুরো কর্মজীবনই কেবল উন্নয়ন খাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর মাঠপর্যায়ের কনিষ্ঠ কর্মী- যারা মাঠের আসল কাজটুকু বাস্তবায়ন করতেন- বিকল্প জীবিকার সুযোগ কিংবা ন্যূনতম কোনো সামাজিক নিরাপত্তা ছাড়াই তাদের ছাঁটাই করা হয়েছে।
এই অনিশ্চয়তা কেবল কোনো একটি বছরের আকস্মিক ঘটনা বা সাময়িক বিপর্যয় নয়; বরং তা এই খাতের অর্থায়ন পদ্ধতির সঙ্গেই সরাসরি জড়িত। বর্তমান সংকট তৈরি হওয়ার অনেক আগেই বাংলাদেশের উন্নয়ন সংস্থাগুলো স্থায়ী, দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার পথ ছেড়ে স্বল্পমেয়াদি, নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক প্রকল্প- অনুদানের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। ফলে কর্মীদের নিয়োগও দেওয়া হতো কেবল সুনির্দিষ্ট অনুদানের মেয়াদের সঙ্গে মিলিয়ে, কোনো স্থায়ী কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা হিসেবে নয়। সাম্প্রতিক সংকটটি মূলত বছরের পর বছর ধরে জমতে থাকা সেই অন্তর্নিহিত ভঙ্গুরতাকে একক ও নির্মম এক ধাক্কায় প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই খাতের সামগ্রিক তহবিলের পরিসংখ্যান দেখে পরিস্থিতিকে মোটেও সংকটাপন্ন মনে হয় না। বেসরকারি সংস্থাবিষয়ক ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং টাকার অবমূল্যায়নের কারণে গত অর্থবছরে বাংলাদেশের এনজিওগুলোতে মোট বিদেশি অনুদান আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। কিন্তু এই আপাত পুনরুদ্ধার মূল সংকটের সত্যকে যতটা না প্রকাশ করে, তার চেয়ে বেশি আড়াল করে রাখে।
উদাহরণস্বরূপ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও শরণার্থী সহায়তার জন্য বরাদ্দকৃত তহবিল একই সময়ে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে; যার অর্থ হলো সামগ্রিক অর্থায়নের এই প্রবাহ অত্যন্ত অসম। আর মোট অনুদান বৃদ্ধি সেই হাজার হাজার পেশাজীবীর কোনো কাজেই আসছে না, যারা ইতোমধ্যে এই খাত থেকে ছাঁটাই হয়েছেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, এনজিও ব্যুরোকে নতুন প্রকল্পে কর্মী নিয়োগের সময় ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের অগ্রাধিকার দিতে সংস্থাগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানাতে হয়েছে- যা স্পষ্ট করে দেয় যে এই পেশাজীবীদের পুনরায় কর্মসংস্থানের পথ কতটা কঠিন।
দেশের বৃহত্তর শ্রমবাজারও এসব জীবিকা হারানো পেশাজীবীর জন্য সামান্যই স্বস্তি জোগায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর উপাত্ত অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মশক্তির ৮৫.১ শতাংশ- অর্থাৎ প্রায় ৫ কোটি ১৭ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে নিয়োজিত, যেখানে কাজের কোনো আইনি সুরক্ষা বা প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক নিরাপত্তা থাকে না। ফলে একজন উন্নয়ন পেশাজীবী যখন প্রকল্পভিত্তিক পদটি হারান, তখন তিনি কেবল একই ধরনের অন্য কোনো পদে চলে যান না; বরং কার্যত তিনি সেই একই চরম অনিশ্চয়তার মুখে গিয়ে পড়েন যে অনিশ্চয়তা থেকে অন্যদের মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে একসময় তাদের নিজেদের কর্মসূচিগুলো পরিচালিত হতো।
এখানেই রয়েছে এক গভীর ও নির্মম পরিহাস। উন্নয়ন পেশাজীবীরা তাদের পুরো কর্মজীবন ব্যয় করেন গ্রামীণ ও শহুরে প্রান্তিক মানুষের জন্য ঝুঁকি হ্রাস করা, জীবিকার বহুমুখীকরণ এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সহনশীলতা গড়ে তোলার পথ উদ্ভাবন করে। অথচ এই খাতটি তার নিজস্ব কর্মীদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে একই চিন্তাভাবনা প্রয়োগ করতে আশ্চর্যজনকভাবে উদাসীন থেকেছে। একজন মাঠ কর্মকর্তা, যিনি একসময় কৃষকদের সংকটকালে টিকে থাকার জন্য আয়ের উৎস বহুমুখী করার পরামর্শ দিতেন- আজ হয়তো তিনি নিজেই কোনো প্রকার চাকরিচ্যুতিজনিত ক্ষতিপূরণ, স্বাস্থ্যবীমা কিংবা চলতি প্রকল্প মেয়াদের পর ন্যূনতম চাকরির নিশ্চয়তা ছাড়া দিন কাটাচ্ছেন। এই খাতটি তার সুফলভোগীদের জন্য যে নীতি ও আদর্শের কথা প্রচার করে, আর নিজের কর্মীদের ক্ষেত্রে বাস্তবে যা চর্চা করে- তা দ্বয়ের মধ্যকার ব্যবধানটি এখন এক প্রকট সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে।
উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রের কিছু অস্থিরতা কিংবা অনিশ্চয়তা হয়তো এড়িয়ে যাওয়া সত্যিই কঠিন, কারণ তা দাতা দেশগুলোর ভূরাজনীতি, বৈশ্বিক সংকট এবং অভ্যন্তরীণ সরকারি অগ্রাধিকার পরিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু এই অনিবার্য বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি না নিয়ে, তার সম্পূর্ণ বোঝা কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক কর্মীদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার যে প্রবণতা উন্নয়ন সংস্থা ও দাতাসংস্থাগুলোর মাঝে রয়েছে- তা চূড়ান্ত অন্যায্য।
এই দূরবর্তী ব্যবধান কমাতে একাধিক সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। প্রথমত যেসব সংস্থা বছরের পর বছর চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে কাজ পরিচালনা করে, তাদের পর্যায়ক্রমে কর্মীদের স্থায়ী বা মূল তহবিলভুক্ত পদে রূপান্তর করা উচিত। পাশাপাশি দাতা সংস্থাগুলোরও কেবল নির্দিষ্ট প্রকল্পকেন্দ্রিক না হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা ও কর্মসংস্থানের স্থায়িত্ব রক্ষায় সরাসরি অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত চাকরিচ্যুতির পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ, যৌক্তিক নোটিসের সময়সীমা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে আবশ্যিক প্রাতিষ্ঠানিক নীতিতে পরিণত করতে হবে। সবশেষে চাকরি হারানোর প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে সরকারি উদ্যোগে সমীক্ষা পরিচালনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পেশাজীবীদের অন্য সম্ভাবনাময় খাতে পুনর্বাসনে একটি জাতীয় কৌশল প্রণয়ন করা দরকার। এর পাশাপাশি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকেও তাদের কর্মী নিয়োগের ধরন ও চুক্তির স্থায়িত্ব সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ্যে এনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা উচিত।
প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি খাতের অনুচিত তার নিজস্ব কর্মীদের ওপর ঠিক সেই ধরনের অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি চাপিয়ে দেওয়া, যা সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং দাতাসংস্থাগুলোর দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে সহজেই দূর করা সম্ভব। এই খাতের ঘোষিত আদর্শ ও বাস্তব আচরণের মধ্যকার ব্যবধান ঘোচানো কেবল বৈষম্য দূর করার কোনো সাধারণ দাবি নয়; বরং এটি এখন এই খাতের নিজস্ব নৈতিক অস্তিত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষারই এক অপরিহার্য শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি