মুদ্রাস্ফীতি অর্থনীতির এমন এক বাস্তবতা, যা পরিসংখ্যানের কাগজে একটি শতাংশ হিসেবে দেখা দিলেও রক্তমাংসের মানুষের জীবনে তার অভিঘাত অনেক গভীর। বাজারে চাল, ডাল, তেল, ওষুধ কিংবা বাড়িভাড়ার দাম বাড়লে একজন শ্রমিকের কাছে মুদ্রাস্ফীতি মানে প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়া; একজন মধ্যবিত্তের কাছে তা সঞ্চয়ের ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয়ে যাওয়া; আর একজন উদ্যোক্তার কাছে তা উৎপাদন ব্যয়, সুদের হার ও বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি। অতএব মুদ্রাস্ফীতি কেবল ‘দাম বাড়ার’ গল্প নয়—এটি আয়, সম্পদ, ক্ষমতা, প্রত্যাশা ও রাষ্ট্রীয় নীতির পুনর্বণ্টনেরও গল্প।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যাখ্যায়, অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতার তুলনায় অর্থের সরবরাহ দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত বেড়ে গেলে মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং সাধারণ মূল্যস্তর বাড়তে থাকে। তবে মুদ্রাস্ফীতির উৎস কেবল মুদ্রার অতিরিক্ত সরবরাহ নয়; চাহিদার বিস্তার, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থার সংকট, বিনিময় হার অবমূল্যায়ন এবং মানুষের ভবিষ্যৎ মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যাশাও এর গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।
মুদ্রাস্ফীতিটা আসলে কী? মুদ্রাস্ফীতি বলতে সাধারণভাবে অর্থনীতিতে পণ্য ও সেবার সামগ্রিক মূল্যস্তরের ধারাবাহিক বৃদ্ধিকে বোঝায়। এখানে দুটি শব্দ গুরুত্বপূর্ণ—‘সামগ্রিক’ এবং ‘ধারাবাহিক’। কোনো একটি পণ্যের দাম বেড়ে গেলেই মুদ্রাস্ফীতি হয় না। বরং অর্থনীতির বিস্তৃত পণ্য ও সেবার মূল্যস্তর যখন ক্রমাগত বাড়ে, তখন তাকে মুদ্রাস্ফীতি বলা হয়।
ধরা যাক, আজ ১০০ টাকায় যে পরিমাণ পণ্য কেনা যায়, এক বছর পরে একই পণ্য কিনতে ১১০ টাকা প্রয়োজন হলো। তাহলে টাকার নামমাত্র মূল্য একই থাকলেও তার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতি আসলে মুদ্রার অভ্যন্তরীণ মূল্য বা ক্রয়ক্ষমতার ক্ষয়।
এই কারণেই মুদ্রাস্ফীতিকে অনেক সময় ‘নীরব কর’ বলা হয়। সরকার সরাসরি মানুষের ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা কেটে নেয় না; কিন্তু মূল্যস্তর বেড়ে গেলে একই আয় দিয়ে মানুষ কম পণ্য কিনতে পারে। বিশেষত স্থির আয়ের মানুষ, পেনশনভোগী এবং নগদ সঞ্চয়কারীরা এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
অর্থনীতির সবচেয়ে পুরোনো ব্যাখ্যাগুলোর একটি হলো কোয়ালিটি থিওরি অব মানি। সরল ভাষায় এর বক্তব্য— অর্থনীতিতে পণ্য ও সেবার উৎপাদন যতটা বাড়ছে, তার তুলনায় অর্থের পরিমাণ যদি অনেক দ্রুত বাড়ে, তাহলে অতিরিক্ত অর্থ সীমিত পণ্যকে অনুসরণ করবে এবং মূল্যস্তর বাড়বে।
তবে এই তত্ত্বকে যান্ত্রিক সূত্র হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একই পরিমাণ অর্থের সরবরাহও ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ফল দিতে পারে। মানুষ যদি অর্থ ধরে রাখে, ব্যাংক ঋণ না দেয়, বিনিয়োগ দুর্বল হয় এবং অর্থের সারকুলেশন কমে যায়, তাহলে অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধির তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত হতে পারে। আবার অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতা যদি সংকুচিত হয়, একই পরিমাণ চাহিদাও বেশি মূল্যস্ফীতি তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতির প্রকৃত সমীকরণ হলো— অর্থের পরিমাণ + অর্থের গতি + উৎপাদনক্ষমতা + চাহিদা + প্রত্যাশা + সরবরাহ পরিস্থিতি। অর্থনীতির মোট চাহিদা যখন উৎপাদনক্ষমতার তুলনায় দ্রুত বাড়ে, তখন ডিমান্ড পুল ইনফ্লাশন সৃষ্টি হয়। মানুষ বেশি কিনতে চাইছে, সরকার বেশি ব্যয় করছে, ঋণ সহজলভ্য, সুদের হার কম— কিন্তু উৎপাদন সেই হারে বাড়ছে না। ফলে সীমিত পণ্যের জন্য বেশি টাকা প্রতিযোগিতা করে এবং দাম বাড়ে।
মহামারির পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বহু দেশে এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ দেখা গেছে। কোভিড-১৯-এর প্রথম পর্যায়ে লকডাউন ও অনিশ্চয়তায় চাহিদা কমে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অর্থনীতি পুনরায় খুললে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় ধরনের আর্থিক ও মুদ্রানীতিগত সহায়তা, সঞ্চিত চাহিদার বিস্ফোরণ এবং পুনরুদ্ধারপ্রক্রিয়া মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। আইএমএফ -এর গবেষণায় দেখা যায়, ২০২১-২২ সালের বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিতে চাহিদা ও সরবরাহ— দুই পক্ষই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
ব্যয়-চাপের মুদ্রাস্ফীতি বা কস্ট-পোশ ইনফ্লাশন এর ক্ষেত্রে গল্পটি ঠিক উল্টো। মানুষ বেশি কিনছে বলে দাম বাড়ছে না; বরং উৎপাদন করতেই বেশি খরচ হচ্ছে বলে দাম বাড়ছে। তেলের দাম বাড়ল, বিদ্যুতের দাম বাড়ল, কাঁচামালের দাম বাড়ল, পরিবহন ব্যয় বাড়ল— উৎপাদক সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের মধ্যে স্থানান্তর করল। এটাই কস্ট-পোশ ইনফ্লাশন।
১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উদাহরণ। ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালের তেল-ধাক্কা বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেয় এবং একই সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার সৃষ্টি করে। আইএমএফ-এর ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৭০-এর দশকের বড় বড় মুদ্রাস্ফীতি-পর্বের উল্লেখযোগ্য অংশ তেল ও অন্যান্য পণ্যের সরবরাহ-ধাক্কার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
এই অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়— সব মুদ্রাস্ফীতি সুদের হার বাড়িয়ে সমাধান করা যায় না। যদি সমস্যাটি মূলত তেলের সরবরাহে, তাহলে শুধু সুদের হার বাড়ালে তেলের উৎপাদন বাড়বে না।
মুদ্রাস্ফীতির তৃতীয় শক্তি হলো প্রত্যাশা। মুদ্রাস্ফীতি কেবল বর্তমানের ঘটনা নয়; ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মানুষের ধারণাও মুদ্রাস্ফীতিকে তৈরি করতে পারে। একজন শ্রমিক যদি মনে করেন আগামী বছর বাজারদর ১০ শতাংশ বাড়বে, তাহলে তিনি বেশি মজুরি দাবি করবেন। উদ্যোক্তা মনে করবেন উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং আগে থেকেই পণ্যের দাম বাড়াবেন। বাড়িওয়ালা ভাড়া বাড়াবেন। ব্যবসায়ী মজুত বাড়াবেন। ফলে প্রত্যাশিত মুদ্রাস্ফীতি বাস্তব মুদ্রাস্ফীতিতে পরিণত হতে পারে।
এ কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণ যদি বিশ্বাস করে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্থিতি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম, তাহলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশাও দ্রুত কমতে পারে। IMF-ও মুদ্রাস্ফীতির প্রত্যাশাকে মূল্যস্ফীতির স্থায়িত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। উন্নয়নশীল ও আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো exchange-rate pass-through।
ধরা যাক, একটি দেশের মুদ্রার মান ডলারের বিপরীতে ২০ শতাংশ কমে গেল। দেশটি যদি খাদ্য, জ্বালানি, কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও শিল্পের উপকরণ আমদানি করে, তাহলে আমদানির স্থানীয় মুদ্রামূল্য বাড়বে। আমদানিকারক বাড়তি ব্যয় ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেবে। এরপর পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন ব্যয় ও বাজারদর— সবকিছুর ওপর তার প্রভাব পড়বে। এই কারণে অনেক উন্নয়নশীল দেশে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার প্রশ্নটি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
মুদ্রাস্ফীতি কখন বিপজ্জনক? স্বল্প ও স্থিতিশীল মুদ্রাস্ফীতি সবসময় অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর নয়। বরং আধুনিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সাধারণত শূন্য মুদ্রাস্ফীতি নয়, বরং নিম্ন ও স্থিতিশীল মূল্যস্ফীতিকে লক্ষ্য করে। কারণ সামান্য মূল্যবৃদ্ধি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করতে পারে এবং মজুরি ও দামের সমন্বয়কে তুলনামূলকভাবে সহজ করে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন মুদ্রাস্ফীতি অস্থিতিশীল, দ্রুতগতির এবং অনিশ্চিত হয়ে ওঠে।
প্রথমত, এটি প্রকৃত আয় কমায়। দ্বিতীয়ত, সঞ্চয়ের মূল্য ক্ষয় করে। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত কঠিন করে। চতুর্থত, সম্পদের মালিক ও ঋণগ্রহীতার মধ্যে সম্পদের পুনর্বণ্টন ঘটাতে পারে। পঞ্চমত, মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থা নষ্ট করে।
আর যখন মূল্যবৃদ্ধি এত দ্রুত হয় যে মানুষ মুদ্রাকে সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চায় না, তখন অর্থনীতি প্রবেশ করতে পারে Hyperinflation-এর ভয়াবহ পর্যায়ে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানি মুদ্রাস্ফীতির ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত উদাহরণ। যুদ্ধের ব্যয়, বিপুল সরকারি ঋণ, ক্ষতিপূরণ এবং অর্থনৈতিক সংকটের সম্মিলিত অভিঘাতে জার্মান অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ১৯২৩ সালে মুদ্রাস্ফীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে মানুষ বেতন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা পণ্য কিনতে ব্যয় করত। অর্থের মূল্য দ্রুত কমছিল। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—মুদ্রাস্ফীতি শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি সামাজিক আস্থার সংকটও। যখন মানুষ জাতীয় মুদ্রার ওপর আস্থা হারায়, তখন মুদ্রা তার তিনটি মৌলিক কাজ— বিনিময়ের মাধ্যম, হিসাবের একক এবং মূল্য সংরক্ষণের মাধ্যম— ক্রমশ হারাতে থাকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হাঙ্গেরি আরও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। ১৯৪৬ সালের হাঙ্গেরীয় hyperinflation আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে চরম মুদ্রাস্ফীতির ঘটনাগুলোর একটি। যুদ্ধোত্তর উৎপাদনব্যবস্থার বিপর্যয়, সরকারি অর্থসংকট এবং অতিরিক্ত মুদ্রা সৃষ্টির সম্মিলিত প্রভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এই ধরনের ঘটনা দেখায় যে মুদ্রাস্ফীতি যখন নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখন অর্থের অঙ্ক যত বড়ই হোক, তার প্রকৃত মূল্য তত দ্রুত শূন্যের দিকে যেতে পারে।
আইএমফ-এর সাম্প্রতিক গবেষণাতেও হাঙ্গেরির ইতিহাসকে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক উদাহরণ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জিম্বাবুয়ের ২০০০-এর দশকের hyperinflation আধুনিক বিশ্বের আরেকটি ভয়াবহ উদাহরণ। অর্থনৈতিক উৎপাদন কমে যাওয়া, কৃষি খাতের সংকট, রাজস্ব ঘাটতি, মুদ্রানীতির দুর্বলতা, বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থায়নের সংকট একে অন্যকে শক্তিশালী করে।
২০০৮-০৯ সালের hyperinflation-এর পর জিম্বাবুয়ে নিজস্ব মুদ্রা পরিত্যাগ করে বহু-মুদ্রা ব্যবস্থায় যায়, যেখানে মার্কিন ডলারসহ অন্যান্য মুদ্রা আইনগতভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে।
এই অভিজ্ঞতা দেখায়, একটি রাষ্ট্র তার মুদ্রার প্রতি মানুষের আস্থা হারালে অর্থনীতির স্বাভাবিক মনিটারি মেকানিজম ভেঙে পড়তে পারে। পরবর্তীকালে কঠোর নীতি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের quasi-fiscal কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জিম্বাবুয়ে স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়েছে—এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত শিক্ষা।
মুদ্রাস্ফীতির ইতিহাসে ১৯৭০-এর দশক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তখন একটি প্রচলিত ধারণা বড় ধাক্কা খায় অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন Phillips Curve-এর সরল ব্যাখ্যা জনপ্রিয় ছিল—বেকারত্ব কমলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে এবং মুদ্রাস্ফীতি কমাতে গেলে বেকারত্ব বাড়তে পারে। কিন্তু ১৯৭০-এর দশকে অনেক দেশে একই সঙ্গে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখা দেয়। এর নাম Stagflation।
তেলের মূল্যবৃদ্ধি ছিল এর অন্যতম প্রধান কারণ। ফলে বোঝা গেল, মুদ্রাস্ফীতিকে শুধু অতিরিক্ত চাহিদা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বাস্তব অর্থনীতির বড় অংশ অনালোচিত থেকে যায়।
২০২১-২২ বছরগুলো হলো পুরোনো মুদ্রাস্ফীতির নতুন সংস্করণ। কোভিড-পরবর্তী বিশ্বে আবারও মুদ্রাস্ফীতি ফিরে আসে। প্রথমে সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন, পরে অর্থনীতি পুনরায় চালু হওয়া, শ্রমবাজারের পরিবর্তন, বড় ধরনের আর্থিক ও মুদ্রানীতিগত সহায়তা এবং শেষ পর্যন্ত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি তীব্র হয়ে ওঠে।
IMF-এর ৩২টি দেশের ওপর গবেষণা দেখিয়েছে যে ২০২১-২২ সালের মূল্যস্ফীতিতে চাহিদা ও সরবরাহ— উভয় উপাদানই গুরুত্বপূর্ণ ছিল; ইউরোপে সরবরাহ-চাপ বিশেষভাবে শক্তিশালী ছিল, আর যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার বিভিন্ন অর্থনীতিতে চাহিদা ও সরবরাহের অবদান তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ ছিল। অর্থাৎ কোভিড-পরবর্তী মুদ্রাস্ফীতি আমাদের আবার মনে করিয়ে দিয়েছে— একটি মাত্র কারণ দিয়ে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে ব্যাখ্যা করা যায় না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবচেয়ে পরিচিত অস্ত্র হলো policy interest rate। সুদের হার বাড়ালে ঋণ ব্যয়বহুল হয়, ভোগ ও বিনিয়োগ কমে, সামগ্রিক চাহিদা দুর্বল হয় এবং শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ কমে।
কিন্তু এই অস্ত্রের একটি সীমাবদ্ধতা আছে। সুদের হার বাড়িয়ে তেলের উৎপাদন বাড়ানো যায় না, যুদ্ধ বন্ধ করা যায় না, বন্দর জট কমানো যায় না, কৃষির উৎপাদন বাড়ানো যায় না।
আইএমএফ-এর গবেষণায় দেখা গেছে, monetary tightening demand-driven inflation কমাতে তুলনামূলকভাবে কার্যকর, কিন্তু supply-driven inflation-এর ক্ষেত্রে এর প্রভাব অনেক দুর্বল।
সুতরাং মুদ্রাস্ফীতি দমনের নীতি হতে হবে কারণনির্ভর। চাহিদা অতিরিক্ত হলে সুদের হার কার্যকর; সরবরাহ সংকট হলে প্রয়োজন উৎপাদন, আমদানি, অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক করা; আর বিনিময় হার সংকট হলে প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য monetary ও fiscal framework।
একটি দেশের সরকার যদি ধারাবাহিকভাবে রাজস্বের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয় করে এবং সেই ঘাটতি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থসৃষ্টির মাধ্যমে অর্থায়িত হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে সব fiscal deficit একই রকম নয়। সরকার যদি ঋণ নিয়ে উৎপাদনশীল অবকাঠামো তৈরি করে, তাহলে ভবিষ্যৎ উৎপাদনক্ষমতা বাড়তে পারে। বিপরীতে উৎপাদন না বাড়িয়ে কেবল ভোগব্যয় বা অদক্ষ ভর্তুকি বাড়ানো হলে অর্থনীতির সরবরাহক্ষমতা না বাড়িয়েই চাহিদা বাড়তে পারে।
সুতরাং প্রশ্ন শুধু ‘ঘাটতি কত’ নয়; প্রশ্ন হলো—ঘাটতির অর্থ কোথা থেকে আসছে এবং সেই অর্থ কী কাজে ব্যয় হচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি একটি নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক ঘটনা নয়। এর distributional effect আছে।
ধনী ব্যক্তি যদি রিয়েল এস্টেট, স্বর্ণ, শেয়ার কিংবা ব্যবসায়িক সম্পদে বিনিয়োগ করে থাকেন, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তার সম্পদের নামমাত্র মূল্য বাড়তে পারে। কিন্তু একজন নিম্নআয়ের শ্রমিকের সম্পদ যদি মূলত নগদ আয় ও ব্যাংক আমানতে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তার প্রকৃত সম্পদ কমতে পারে।
অন্যদিকে ঋণগ্রহীতার জন্য মুদ্রাস্ফীতি কখনও সুবিধাজনক। কারণ ভবিষ্যতে যে টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে হবে, তার প্রকৃত মূল্য কমে যেতে পারে। বিপরীতে ঋণদাতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতি অর্থনীতির ভেতরে এক ধরনের নীরব wealth transfer ঘটাতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শতাধিক inflation shock বিশ্লেষণ করে IMF যে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছে তা হলো— মুদ্রাস্ফীতি অনেক সময় প্রত্যাশার চেয়ে বেশি স্থায়ী হয়। প্রাথমিকভাবে দাম কমতে শুরু করলেও দ্রুত নীতি শিথিল করলে মূল্যস্ফীতি আবার ফিরে আসতে পারে। যেসব দেশ সফলভাবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে, তাদের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কঠোর মুদ্রানীতি, সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি এবং বিনিময় হার অবমূল্যায়ন নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা ছিল।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো— মুদ্রাস্ফীতি কমানোর প্রাথমিক পর্যায়ে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে আঘাত আসতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্থিতি প্রতিষ্ঠা করতে পারলে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানও উন্নত হয়।
প্রশ্ন আসে মুদ্রাস্ফীতির অর্থনীতির প্রকৃত স্বরূপ কী? মুদ্রাস্ফীতিকে কেবল ‘বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে’ বলে দেখলে এর গভীর অর্থনৈতিক চরিত্র ধরা পড়ে না। মুদ্রাস্ফীতি আসলে অর্থনীতির বিভিন্ন শক্তির সংঘর্ষের বহিঃপ্রকাশ।
একদিকে আছে মানুষের চাহিদা, অন্যদিকে উৎপাদনের সক্ষমতা। একদিকে আছে অর্থের সরবরাহ, অন্যদিকে অর্থের উৎপাদনশীল ব্যবহার। একদিকে আছে সরকারি ব্যয়, অন্যদিকে রাজস্বের সীমাবদ্ধতা। একদিকে আছে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা, অন্যদিকে রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সক্ষমতা। আবার এসবের ওপর রয়েছে মানুষের প্রত্যাশা ও আস্থার অদৃশ্য শক্তি।
তাই মুদ্রাস্ফীতি কখনো কেবল monetary phenomenon, কখনো supply shock, কখনো demand shock, কখনো exchange-rate problem, আবার কখনো fiscal এবং institutional crisis-এর লক্ষণ।
সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন এসব কারণ একে অন্যকে শক্তিশালী করে। উৎপাদন কমে যায়, আমদানি ব্যয় বাড়ে, মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়, সরকারি ঘাটতি বাড়ে, মুদ্রার সরবরাহ বাড়ে, মানুষ ভবিষ্যৎ মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাশা করে— তারপর ব্যবসায়ী দাম বাড়ায়, শ্রমিক মজুরি বাড়াতে চায়, আবার মজুরি বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। তখন মুদ্রাস্ফীতি একটি self-reinforcing process-এ পরিণত হয়।
সুতরাং মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াই মানে শুধু সুদের হার বাড়ানো নয়; বরং আস্থা পুনর্গঠন, উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি, রাজস্বশৃঙ্খলা, মুদ্রানীতির বিশ্বাসযোগ্যতা, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা— সবকিছুকে একসঙ্গে ঠিক করা।
ইতিহাসের জার্মানি, হাঙ্গেরি ও জিম্বাবুয়ে আমাদের দেখিয়েছে মুদ্রার প্রতি আস্থা হারালে কী হতে পারে। ১৯৭০-এর দশক দেখিয়েছে সরবরাহ-ধাক্কা কীভাবে মুদ্রাস্ফীতি ও স্থবিরতা একসঙ্গে আনতে পারে। আর ২০২১-২২ সালের বিশ্ব দেখিয়েছে, আধুনিক আন্তঃনির্ভর অর্থনীতিতে একটি মহামারি, একটি যুদ্ধ কিংবা একটি সরবরাহ-শৃঙ্খলের সংকট কীভাবে কয়েক হাজার মাইল দূরের বাজারে মূল্যস্ফীতির আগুন জ্বালাতে পারে।
শেষ পর্যন্ত মুদ্রাস্ফীতির সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো— টাকার মূল্য কেবল কাগজে লেখা সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় মানুষের আস্থা, রাষ্ট্রের নীতি এবং অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতার ওপর। একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যতই নতুন নোট ছাপুক, যদি সেই নোটের পেছনে পণ্য, উৎপাদন, রাজস্বশৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা না থাকে, তবে কাগজের পরিমাণ বাড়বে— কিন্তু মানুষের প্রকৃত সম্পদ বাড়বে না।
মুদ্রাস্ফীতি তাই অর্থনীতির আয়না। সেখানে শুধু বাজারদর দেখা যায় না; দেখা যায় একটি রাষ্ট্রের আর্থিক শৃঙ্খলা, উৎপাদনক্ষমতা, বৈদেশিক নির্ভরতা, নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সর্বোপরি— মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থা কতটা অটুট আছে।
লেখক ও কলামিস্ট
সময়ের আলো/কেএইচ