মশাবাহিত রোগের নতুন বাস্তবতা

কর্নেল ডা. নাজমুল হুদা খান (অব.)

মতামত

পৃথিবীব্যাপী মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব, ভোগান্তি ও ঝুঁকির মাত্রার সার্বিক চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা এবং এসব রোগের বাহক মশা ও

2026-08-25T07:32:29+00:00
2026-08-25T07:32:29+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬,
১০ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
মতামত
মশাবাহিত রোগের নতুন বাস্তবতা
কর্নেল ডা. নাজমুল হুদা খান (অব.)
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৩২ এএম 
ছবি : সময়ের আলো গ্রাফিক
পৃথিবীব্যাপী মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব, ভোগান্তি ও ঝুঁকির মাত্রার সার্বিক চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা এবং এসব রোগের বাহক মশা ও রোগ প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে বিশ্ববাসীকে উদ্বুদ্ধ করতে প্রতি বছর ২০ আগস্ট পৃথিবীর বহু দেশে পালিত হয় বিশ্ব মশা দিবস।

১৮৯৭ সালের এদিন ভারতে কর্মরত তৎকালীন ব্রিটিশ সেনা মেডিকেল কোরের চিকিৎসক মেজর ডা. রোনাল্ড রস বহু বছর মশার ওপর গবেষণা চালিয়ে প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে, স্ত্রী মশা ম্যালেরিয়া রোগের বাহক। তিনি মশার পরিপাকতন্ত্রে ম্যালেরিয়া সংক্রমণের জন্য দায়ী প্লাজমোডিয়ামের জীবনচক্রও আবিষ্কার করেন। এ জন্য তিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। উল্লেখ্য, ওই সময় এ উপমহাদেশে বহু মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হতো এবং আক্রান্ত রোগীদের ১০ শতাংশ মারা যেতেন। মশাবাহিত রোগ সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করা এবং এ রোগ প্রতিরোধে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে ডা. রোনাল্ড রস এদিনটিকে বিশ্ব মশা দিবস হিসেবে পালনের উদ্যোগ নেন। পরে লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন ১৯৩০ সাল থেকে প্রতি বছর এ দিনটি পালন করে আসছে।

পৃথিবীতে প্রায় ১০০ প্রজাতির মশা মানুষের দেহে ২০টিরও বেশি রোগের সংক্রমণ ঘটায়। এর মধ্যে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, ইয়েলো ফিভার, জাপানিজ এনকেফালাইটিস, ওয়েস্ট নীল ফিভার, চিকুনগুনিয়া, কঞ্জিন জেমসটাউন ক্যানিয়ন ভাইরাস, জিকা, ভেনেজুয়েলান ইকুইন এনকেফালাইটিস, মারে ভ্যালি এনকেফালাইটিস, রিফট ভ্যালি ফিভার, লা ক্রস এনকেফালাইটিস ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে প্রায় ১২৩ প্রজাতির মশা শনাক্ত করা গেছে, যার মধ্যে রাজধানীতে পাওয়া গেছে ১৪ ধরনের। ডেঙ্গুসহ ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, জিকা, চিকুনগুনিয়া, জাপানিজ এনকেফালাইটিস প্রভৃতি মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবও দেখা গেছে বাংলাদেশে।


পৃথিবীর প্রায় ২০ শতাংশ সংক্রামক রোগ মশাবাহিত, এসব রোগে প্রতি বছর মারা যায় প্রায় এক মিলিয়ন মানুষ। প্রায় ২০৩ কোটি মানুষ ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে থাকে এবং প্রায় ৪০০ মিলিয়ন মানুষ রোগটিতে আক্রান্ত হয়। রোগ সংক্রমণ, প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনায় বছরে ব্যয় হয় প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে ডেঙ্গু ছাড়াও ৩৫ শতাংশ মানুষ সরাসরি ম্যালেরিয়া সংক্রান্ত এলাকার বাসিন্দা। ফাইলেরিয়া বা গোদ রোগের ঝুঁকিতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ। ২০১৭ সালে দেখা গিয়েছিল জাপানিজ এনকেফালাইটিস রোগের প্রাদুর্ভাবও।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখন স্থায়ীভাবে জনস্বাস্থ্যের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও ঋতুচক্রের পরিবর্তনের মতো পরিবেশগত কারণ বাংলাদেশে ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগের সংক্রমণের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। ডেঙ্গুর বাহক মূলত এডিস মশা। এ মশার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি সাধারণত দিনের বেলায়, বিশেষ করে ভোর ও সন্ধ্যার দিকে বেশি সক্রিয় থাকে। ফলে শুধু রাতে মশারি ব্যবহার করলেই ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা যায় না। বাড়ি, কর্মস্থল, বিদ্যালয়, হাসপাতাল সব জায়গাতেই দিনের বেলায় মশার কামড় থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা প্রয়োজন।

আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হলো, মশা নিধনকে অনেক সময় শুধু ‘ফগিং’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক মশা মেরে ফেলা সমস্যার একটি অংশ মাত্র। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা, নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানি, ছাদ, ড্রেন, প্লাস্টিকের বোতল কিংবা যেকোনো ছোট পাত্রে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিও এডিস মশার প্রজননস্থল হতে পারে। তাই মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধের প্রথম শর্ত হলো মশার জন্মস্থান ধ্বংস করা।

এ ক্ষেত্রে সমন্বিত মশা ব্যবস্থাপনা বা Integrated Mosquito Management (IMM) হতে পারে আমাদের কার্যকর পথ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই পদ্ধতিতে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, প্রজননস্থল ধ্বংস, লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণ, মশার ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ, কীটনাশকের কার্যকারিতা ও প্রতিরোধক্ষমতা পরীক্ষা এবং জনগণের অংশগ্রহণকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব শুধু সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা স্বাস্থ্য বিভাগের নয়। এটি একটি সমন্বিত সামাজিক দায়িত্ব। স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত সংস্থা, পরিবেশ অধিদফতর, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষ সবার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া টেকসইভাবে মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

প্রথমেই প্রয়োজন নিয়মিত মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস করা। শুধু রোগের মৌসুমে অভিযান পরিচালনা না করে সারা বছর নিয়মিত নজরদারি চালাতে হবে। কোন এলাকায় এডিসের ঘনত্ব বেশি, কোথায় লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে, কোন কীটনাশক কার্যকর এবং কোথায় কীটনাশক প্রতিরোধী মশার উপস্থিতি রয়েছে- এসব তথ্যভিত্তিকভাবে সংগ্রহ করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও মশার প্রজনন ও কীটনাশক প্রতিরোধক্ষমতা পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

দ্বিতীয়ত নগর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে। অপরিকল্পিত নির্মাণ, খোলা ড্রেন, পানি নিষ্কাশনের দুর্বল ব্যবস্থা, পরিত্যক্ত জমি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি করে। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে নগর পরিকল্পনা ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। নির্মাণাধীন ভবনের মালিক ও ঠিকাদারদের নিজ নিজ স্থাপনায় জমে থাকা পানি অপসারণে আইনগত ও সামাজিকভাবে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

তৃতীয়ত প্রয়োজন জনগণের আচরণগত পরিবর্তন। সপ্তাহে অন্তত এক দিন বাড়ির ছাদ, বারান্দা, বাগান, টব, পানির পাত্র ও আশপাশ ভালোভাবে পরীক্ষা করে জমে থাকা পানি অপসারণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পানির ট্যাঙ্ক ও সংরক্ষণপাত্র ঢেকে রাখতে হবে। অপ্রয়োজনীয় পাত্র ও পরিত্যক্ত সামগ্রী ফেলে না রেখে যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে। ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য রিপেলেন্ট, ফুলহাতা পোশাক, জানালা-দরজায় নেট এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মশারি ব্যবহার করা যেতে পারে।


চতুর্থত রোগীর দ্রুত শনাক্তকরণ ও যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, বিপদসংকেত চিহ্নিত করা এবং গুরুতর রোগীকে সময়মতো উপযুক্ত হাসপাতালে পাঠানো মৃত্যুঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।

মশার জীবনচক্র এবং বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক ভাইরাস ও পরজীবী মশার দেহে কীভাবে সংক্রমণের গতি ও ধরনে আক্রমণের শক্তি অর্জন করে, সময়ের পরিক্রমায় কীভাবে রোগের উপসর্গ ও তীব্রতার পরিবর্তন ঘটে- এসব বিষয় জানা জরুরি। তাই এ আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিরোধ ও প্রতিকার ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।

সমন্বিত মশা ব্যবস্থাপনা কোনো নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের একক দায়িত্ব নয়। বাড়ি ও স্থাপনার মালিক বা ব্যবস্থাপক, সংশ্লিষ্ট এলাকার বিভিন্ন পর্যায়ের নাগরিক, গবেষণা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার ও অধীনস্থ সব সংস্থা, সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ সংস্থা, সরকার এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থা- সবার একসঙ্গে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমেই সমন্বিত মশা ব্যবস্থাপনা  টেকসই সাফল্যের আলো দেখবে। ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াকেও সক্রিয় সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে। তা হলেই মশা ও মশাবাহিত রোগের সামগ্রিক প্রতিরোধ সম্ভব।

জনস্বাস্থ্য ও হাইপারবেরিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে


  বিষয়:   মশাবাহিত  রোগ  নতুন  বাস্তবতা  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: