মোবাইল ফোন বা অনলাইনে অভিযোগ করা যাবে, একটি ট্র্যাকিং নাম্বার দেওয়া হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উত্তর দিতে হবে। বিপিডিবির সিটিজেন চার্টারে ইতিমধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং ২৪/৭ কল সেন্টারের ব্যবস্থা রয়েছে। এখন প্রয়োজন এই ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা। কারণ মানুষের অসন্তোষের জায়গাটি খুব সহজে বোঝা যায়।
বিদ্যুৎ নেই, কিন্তু বিল আছে; সেবা অনিয়মিত, কিন্তু খরচ নিয়মিত; অভিযোগ আছে, কিন্তু সমাধান পেতে হয়রানি আছে- এমন পরিস্থিতি যখন তৈরি হয়, তখন বিদ্যুৎ সংকট আর শুধু একটি কারিগরি সমস্যা থাকে না। এটি সরকারের প্রতি মানুষের আস্থার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। এই কারণেই বিদ্যুৎ খাতে গ্রাহক সেবাকে আর গৌণ বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়।
বাংলাদেশের মানুষ বিদ্যুতের প্রশ্নে যেন আবারও এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার মধ্যে ফিরে গেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, উৎপাদন ক্ষমতাও কম নয়, কিন্তু প্রয়োজনের সময়ে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ নেই। এটি শুধু বিদ্যুতের সংকট নয়। এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় সেবার ওপর আস্থার সংকটও। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় পর্যায়ে লোডশেডিং কয়েক হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশের স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা যদি প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হয়, তা হলে এত লোডশেডিং কেন? সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের হিসাবে ২০২৬ সালের জুনে দেশের স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা ছিল প্রায় ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট।গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের ক্ষমতাই প্রায় ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট এবং কয়লাভিত্তিক প্রায় ৭ হাজার ৭৬৯ মেগাওয়াট। অথচ প্রয়োজনের সময় সেই ক্ষমতার একটি বড় অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এখানেই আমাদের বিদ্যুৎ সমস্যার আসল জায়গাটি।
সমস্যা শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা নয়। সমস্যা হলো যে কেন্দ্রগুলো আছে, সেগুলো কতটা চালানো যাচ্ছে; পর্যাপ্ত গ্যাস, এলএনজি বা কয়লা আছে কি না; কোথাও যান্ত্রিক ত্রুটি আছে কি না; উৎপাদিত বিদ্যুৎ সঠিকভাবে সঞ্চালন ও বিতরণ করা যাচ্ছে কি না। অর্থাৎ আমাদের দরকার শুধু আরও বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, বরং আরও ভালো ব্যবস্থাপনা।
কোনটি জ্বালানির অভাবে কম উৎপাদন করছে, কোনটি মেরামতের জন্য বন্ধ, কোনটির কাছে কয়লা নেই, কোনটি অর্থের কারণে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছে না- এসব তথ্য এক জায়গায় এনে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র বানাতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। কিন্তু একটি বিদ্যমান কেন্দ্রকে জ্বালানি দিয়ে চালু করা বা ছোটখাটো কারিগরি সমস্যা ঠিক করা গেলে কয়েক দিনের মধ্যেই শত শত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
বিদ্যুৎ নিরাপত্তার অর্থ এখন জ্বালানি নিরাপত্তাও। বাংলাদেশের উচিত গ্যাস, এলএনজি ও কয়লার জন্য একটি বাস্তবসম্মত বিদ্যুৎ সুরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করা। বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় কয়লা বা তরল জ্বালানির ন্যূনতম মজুদ কত থাকবে তা নির্ধারণ করা দরকার। কোনো জাহাজ দেরি করলে বা আন্তর্জাতিক বাজারে সমস্যা হলে যাতে একটি কেন্দ্র হঠাৎ বন্ধ হয়ে না যায়, সেই বিকল্প ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
তবে সব সংকটের সমাধান হিসেবে ডিজেল বা ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করা যাবে না। এতে বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও খরচ অনেক বেড়ে যায়। হাসপাতাল, পানি সরবরাহ, জরুরি পরিষেবা, টেলিযোগাযোগের মতো প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কৃষি ও সেচের সময়ও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
শিল্পের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। একটি কারখানায় বিদ্যুৎ না থাকলে মালিক শুধু উৎপাদন হারান না, অনেক সময় জেনারেটর চালাতে ডিজেল কিনতে হয়। সেই অতিরিক্ত খরচ পরে পণ্যের দামে গিয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে ধীরে ধীরে পিক আওয়ার এবং অফ-পিক আওয়ার ভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বড় শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে যাতে তারা যেসব কাজের সময় পরিবর্তন করা সম্ভব, সেগুলো কম চাহিদার সময়ে করে। এতে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ দিয়ে আরও বেশি কাজ করা সম্ভব হবে। বিদ্যুৎ সাশ্রয় মানে মানুষের জীবনকে আরও কষ্টকর করা নয়; বরং কোথায় অপচয় হচ্ছে, সেটি বন্ধ করা। এর পাশাপাশি আমাদের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দিকেও তাকাতে হবে।
অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, মিটার ঠিকভাবে না দেখে বিল তৈরি হচ্ছে। কোথাও হঠাৎ অস্বাভাবিক বিল দেখানো হচ্ছে, কোথাও আগের মাসের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি বিল আসছে। মানুষের ভাষায় এসব বিল এখন অনেক সময় ‘ভূতুড়ে বিল’ নামে পরিচিত হচ্ছে। এখানে অবশ্য একটি ভারসাম্য জরুরি। প্রতিটি বেশি বিল যে ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা হয়েছে তা বলা যাবে না। আগের বকেয়া সমন্বয়, মূল্য বাড়ানো, বিল বেশি হওয়ার আরও নানা কারণ থাকতে পারে। কিন্তু গ্রাহকের প্রশ্নটি খুবই সাধারণ, ‘আমি যতটুকু বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছি তার জন্যই কি আমাকে বিল করা হয়েছে?’
২০২৬ সালে সংসদে জানানো হয়েছে, অনেক এলাকায় মিটার রিডিংয়ের ছবি তুলে তা যাচাই করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে প্রি-পেইড মিটারিং আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ রয়েছে। এখানে খুব সহজ একটি ব্যবস্থা করা যায়। আর কোনো পরিবারের গত এক বছরের ব্যবহার যদি মোটামুটি একই থাকে, হঠাৎ এক মাসে কয়েকগুণ বেশি যেন সেটিকে আগে থেকেই সতর্ক সংকেত হিসেবে চিহ্নিত করে। আজকের প্রযুক্তিতে এটি করা কঠিন নয়, বরং গ্রাহক অভিযোগ করার আগেই অস্বাভাবিক বিল পরীক্ষা করা উচিত। ভুল বিলের অভিযোগ করার জন্যও মানুষকে অফিসে অফিসে ঘুরতে হয়, যা উচিত নয়।
মোবাইল ফোন বা অনলাইনে অভিযোগ করা যাবে, একটি ট্র্যাকিং নাম্বার দেওয়া হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উত্তর দিতে হবে। বিপিডিবির সিটিজেন চার্টারে ইতিমধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং ২৪/৭ কল সেন্টারের ব্যবস্থা রয়েছে। এখন প্রয়োজন এই ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা। কারণ মানুষের অসন্তোষের জায়গাটি খুব সহজে বোঝা যায়। বিদ্যুৎ নেই, কিন্তু বিল আছে; সেবা অনিয়মিত, কিন্তু খরচ নিয়মিত; অভিযোগ আছে, কিন্তু সমাধান পেতে হয়রানি আছে- এমন পরিস্থিতি যখন তৈরি হয়, তখন বিদ্যুৎ সংকট আর শুধু একটি কারিগরি সমস্যা থাকে না। এটি সরকারের প্রতি মানুষের আস্থার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। এই কারণেই বিদ্যুৎ খাতে গ্রাহক সেবাকে আর গৌণ বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়।
দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকেও অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে রুফটপ সোলারের সম্ভাবনা ব্যাপক। সিপিডির হিসাবে ২০২৬ সালে নবায়নযোগ্য শক্তির ক্যাপাসিটি ছিল মাত্র ১ হাজার ৬৯ মেগাওয়াট। আগামী কয়েক বছরে রুফটপ সোলারকে একটি জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত করা যেতে পারে। যেখানে প্রয়োজন ও অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত, সেখানে ব্যাটারি স্টোরেজও যুক্ত করা উচিত। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাতেও শৃঙ্খলা দরকার। বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাওনা, জ্বালানি আমদানির অর্থ, এলএনজি কেনার ব্যয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকৃত খরচ- সবকিছুর একটি স্বচ্ছ চিত্র থাকা দরকার। একটি কেন্দ্রের কাছে টাকা না থাকলে সে জ্বালানি কিনতে পারবে না। জ্বালানি না থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমবে। উৎপাদন কমলে লোডশেডিং বাড়বে। তাই আর্থিক ব্যবস্থাপনাও বিদ্যুৎ নিরাপত্তার অংশ।
সবশেষে দরকার সমন্বয়। গ্যাস একদিকে, বিদ্যুৎ অন্যদিকে, এলএনজি তৃতীয়দিকে এবং ট্রান্সমিশন আরেকদিকে- এভাবে আলাদা আলাদা করে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। একটি ন্যাশনাল ইলেকট্রিসিটি সিকিউরিটি টাস্ক ফোর্স গঠন করে প্রতিদিনের পরিস্থিতি এক জায়গা থেকে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। কত চাহিদা, কত উৎপাদন, কত ঘাটতি, কোন কেন্দ্র বন্ধ, কত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে এবং পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় কী হতে পারে- এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে জনগণের আস্থাও বাড়বে। বাংলাদেশের সামনে এখন মূলত তিনটি কাজ। প্রথমত আগামী কয়েক মাসে বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে যতটা সম্ভব পূর্ণ ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে হবে এবং গ্যাস, এলএনজি ও কয়লার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত আগামী কয়েক বছরে ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, স্মার্ট মিটারিং, অ্যাকুরেট বিলিং, এনার্জি ইফিসিয়েন্স, রুফটপ সোলার এবং ডিমান্ড ম্যানেজমেন্টে বিনিয়োগ করতে হবে। তৃতীয়ত দীর্ঘমেয়াদে এমন একটি ডাইভার্সিফাইড এনার্জি সিস্টেম তৈরি করতে হবে, যেখানে কোনো একটি জ্বালানি বা একটি অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে পুরো দেশ বারবার বিদ্যুৎ সংকটে না পড়ে।
বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট তাই শুধু আরও কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের দাবি নয়। এটি আরও ভালো ব্যবস্থাপনার দাবি। এটি জ্বালানি নিরাপত্তার দাবি। এটি সঠিক বিলের দাবি। সর্বোপরি এটি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি। সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা বোঝা। একজন নাগরিকের কাছে বিদ্যুৎ খাতের সাফল্য কোনো পরিসংখ্যান নয়। তার কাছে সাফল্য হলো রাতে ঘুমের সময় বিদ্যুৎ আছে কি না, সন্তানের পড়ার সময় আলো আছে কি না, দোকানের ফ্রিজ চলছে কি না, সেচের সময় পাম্প চলছে কি না এবং মাস শেষে যে বিলটি হাতে আসে সেটি সত্যিই তার ব্যবহারের সঙ্গে মেলে কি না।
তাই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ নীতির নতুন লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ‘আরও বিদ্যুৎ’ নয়, ‘আরও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ এবং ন্যায্য সেবা’। লোডশেডিং কমাতে হবে। ভুল ও অস্বাভাবিক বিলের অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য সমাধান করতে হবে। জ্বালানি সরবরাহ নিরাপদ করতে হবে। আর জনগণকে বোঝাতে হবে- সমস্যা আছে, কিন্তু তার সমাধানের জন্য একটি পরিষ্কার, বাস্তবসম্মত ও জবাবদিহিমূলক পরিকল্পনাও আছে। কারণ শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতের সাফল্য কত মেগাওয়াট উৎপাদন হলো, শুধু তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। মানুষ কতটা নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ পেল এবং তার জন্য কতটা ন্যায্যমূল্য দিল, সেটিই হওয়া উচিত বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।
লেখক : আইনজীবী, সিনিয়র কোর্টস অব ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস
মতামত লেখকের নিজস্ব