তোষামোদকে অতিরিক্ত ও কপট প্রশংসা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য মিথ্যা প্রশংসা করাই তোষামোদ। এটি আত্মসম্মান ও সত্যকে ধ্বংস করে। যে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তোষামোদ করে, সে হয় প্রতারণা করছে অথবা প্রতারণা করতে চায়। স্বল্প জ্ঞানী, পরনির্ভরশীল, সহজে প্রভাবিত হওয়া কিংবা আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তিরা তোষামোদকে প্রকৃত প্রশংসা হিসেবে দেখেন। বিচক্ষণ ব্যক্তিরা তোষামোদকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, কপট ও মিথ্যা প্রশংসা হিসেবে বোঝেন।
ইতালীয় একটি প্রবাদে বলা হয়েছে, ‘অহংকারী ব্যক্তিরা, যারা সবার সেরা হতে চায় কিন্তু হতে পারে না, তারা তোষামোদে সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হয়।’ আমেরিকান লেখক ও প্রাবন্ধিক মিন্না আনট্রিম বলেন, ‘তোষামোদ এবং প্রশংসার মাঝে প্রায়ই অবজ্ঞার নদী বয়ে চলে।’ ডাচ দার্শনিক বারুখ স্পিনোজার মতে, যাদের নিজের মেরুদণ্ড নেই, তারাই অন্যের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায় এবং তোষামোদকে জীবনের একমাত্র মূলমন্ত্র হিসেবে বেছে নেয়। তোষামোদকারীরা কখনো গঠনমূলক কথা বলেন না; তারা অন্ধ বাহবা দিয়ে নেতা বা গুণী ব্যক্তিকে ধ্বংস করে দেন।
দার্শনিক ও সমাজবিদদের দৃষ্টিতে তোষামোদ
দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, তোষামোদ বা চাটুকারিতা হলো কোনো স্বার্থ বা ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তির অতিরিক্ত, অসত্য ও কপট প্রশংসা করা। এটি নৈতিক অবক্ষয় ঘটায় এবং সামাজিক সম্পর্ককে কৃত্রিম করে তোলে। প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের মতো প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকরা তোষামোদকে অসততা, নৈতিক পতন, সত্যের বিরোধিতা ও প্রতারণা হিসেবে দেখেছেন। অ্যারিস্টটলের মতে, চাটুকার কখনো প্রকৃত বন্ধু হতে পারে না; সে একজন সুবিধাবাদী ও অন্যকে নিজের স্বার্থে ব্যবহারকারী ব্যক্তি। স্টোয়িক দার্শনিক এপিকটেটাস মনে করতেন, তোষামোদ মানুষের অহংকার বাড়িয়ে দেয় এবং তাকে নিজের গুণ ও সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। তোষামোদ এমন এক বাতাস, যা পাপ ও দুর্নীতিকে উসকে দেয়।
সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে তোষামোদ হলো শক্তিহীন বা অধীনস্থ মানুষের একটি কৌশল, যার মাধ্যমে তারা ক্ষমতাবানদের কাছ থেকে অনুমোদন বা সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করে। এটি এক ধরনের সামাজিক মুদ্রা যা সম্পর্কের দূরত্ব কমাতে ব্যবহৃত হলেও এর মূল ভিত্তি থাকে প্রতারণা।
ইসলামের দৃষ্টিতে তোষামোদ
ইসলাম মানবজাতিকে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়েছে, সর্বোচ্চ প্রশংসায় প্রশংসিত করেছে। তা সত্ত্বেও মানবজীবনে অতিরিক্ত প্রশংসা করাকে ইসলামে কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে। সুরা আল ইমরানের ১৮৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যারা নিজেদের অপকর্মে আনন্দিত হয় যে সৎকর্ম তারা করেনি তার জন্য প্রশংসা পেতে ভালোবাসে, তারা যেন কিছুতেই মনে না করে যে তারা শাস্তি থেকে রক্ষা পাবে। বরং তাদের জন্য রয়েছে এক যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’
কারও সামনে অতিরিক্ত প্রশংসা করতে নিষেধ করেছেন রাসুল (স.)। তিনি বলেন, ‘কেউ তোমাদের সামনাসামনি প্রশংসা করলে তার মুখে তোমরা ধূলি ছুড়ে মারো।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৩৪০)। নবীজি (স.) বলেছেন, কারও প্রশংসা করতেই হলে এভাবে বলতে হবে যে, আমি তার ব্যাপারে এমন ধারণা পোষণ করি। কারণ তার প্রকৃত হিসাব মহান আল্লাহ জানেন (বুখারি, মুসলিম, মিশকাত : ৪৮২৭)। রাসুল (স.) আরও বলেন, ‘দুর্বল ইমানের পরিচয় হলো, পার্থিব ধন-সম্পদের লোভে অন্যের অবাস্তব প্রশংসা করা বা তোষামোদ করা।’
বাংলাদেশে এত তোষামোদ সৃষ্টির কারণ?
১. রাজনৈতিক আনুগত্যের অতিরিক্ত গুরুত্ব তোষামোদকে প্রশ্রয় দেয়। চাকরি, ব্যবসা ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে ঊর্ধ্বতন ব্যক্তির সন্তুষ্টি আমাদের সমাজে বেশি প্রভাব ফেলে। ক্ষমতাবান ব্যক্তিকে খুশি করে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পুরোনো অভ্যাস এ সমাজে এখনও চলছে। প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রে স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন না থাকায় তোষামোদকারীরা সহজেই সফল হয়।
২. সমালোচনা সহ্য না করার মানসিকতা এবং ভিন্নমত দমনের প্রবণতা তোষামোদকে উৎসাহিত করে।
৩. দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোয় কর্তাব্যক্তিদের অতিরিক্ত সম্মান বা তোষামোদ করার একটি অদৃশ্য নিয়ম তৈরি হয়েছে। অনেক সময় ক্ষমতা বা পদমর্যাদায় থাকা ব্যক্তিরা নিজের অতিরিক্ত প্রশংসা শুনতে পছন্দ করেন। তাদের এই মানসিকতাকে কাজে লাগিয়ে তোষামোদকারীরা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেন। এই চাটুকারিতার সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত সমাজের গুণগত মান নষ্ট করে এবং প্রকৃত যোগ্য ও সৎ মানুষকে কোণঠাসা করে রাখে।
৪. তোষামোদের অন্যতম লক্ষ্য হলো আনুকূল্য পাওয়া— রাজনৈতিক আনুকূল্য, সুবিধা, অর্থ কিংবা ক্ষমতা। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ ধরনের সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা তোষামোদকারীদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়— কে কত বেশি সুবিধা আদায় করতে পারে। এমন অনভিপ্রেত প্রতিযোগিতা তোষামোদকারীদের মধ্যে প্রতিহিংসার পরিবেশও তৈরি করে।
৫. আমাদের ঔপনিবেশিক মনোভাবও তোষামোদের সংস্কৃতিকে লালন করে। আমরা শাসিত হয়েছি, শাসন করিনি। এর সঙ্গে বাঙালির একটি নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যও যুক্ত হয়েছে— পরিশ্রম না করে, দক্ষতা অর্জন না করে এবং ত্যাগ স্বীকার না করে চাটুকারিতা ও মিথ্যা প্রশংসার মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া, নেতা বা মন্ত্রী হওয়া কিংবা চাকরিতে পদোন্নতি পাওয়ার চেষ্টা। বিশ্বের কোথাও আর এমনটি নেই। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে অফিস-আদালতের সব পর্যায়ে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রতিযোগিতার বদলে তোষামোদ করার প্রতিযোগিতা চলে। সেখানে দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তা এবং সৎ রাজনীতিবিদদের জন্য সর্বত্র অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়।
ইংরেজ অর্থনীতিবিদ গ্রেশামের মুদ্রাতত্ত্বের মতো— ‘খারাপ মুদ্রা ভালো মুদ্রাকে তাড়িয়ে দেয়’— সমাজের খারাপ ও তোষামোদে অভ্যস্ত মানুষের ভিড়ে ভালো মানুষ এগোতে পারছেন না, পিছিয়ে পড়ছেন। এই অবস্থার অবসান হওয়া খুবই জরুরি। তা না হলে সমাজে ভালো, সৎ, মেধাবী, যোগ্য ও দক্ষ মানুষ তৈরি হবে না। অনেকেই বলে থাকেন, এই তোষামোদ শুধু রাজনীতিবিদদের মধ্যেই বিরাজমান। আসলে সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান— সর্বত্রই এটি ব্যাপকভাবে চলছে।
তোষামোদের প্রভাব বাংলাদেশের সমাজে তোষামোদ বা চাটুকারিতার প্রবণতা মূলত ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধার, ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার, সামাজিক নিরাপত্তাসহ নানা সুবিধা পাওয়া, পদোন্নতি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তির সুনজর পাওয়ার শর্টকাট মাধ্যম হিসেবে মানুষকে তোষামোদ বেছে নিতে উৎসাহিত করে। আমাদের সমাজে তোষামোদের রাজনীতির চূড়ান্ত পর্যায়ে তোষিত নেতাকে স্বেচ্ছাচারী করে তোলে। ফাঁকা প্রশংসার মাধ্যমে তোষামোদী অনুগামীরা তোষিত নেতাকে এ মিথ্যা ধারণা দিতে চেষ্টা করেন যে তিনিই সর্বজ্ঞানী, সর্বশ্রেষ্ঠ এবং চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। এ ধরনের একটি প্রক্রিয়া নেতাকে স্বেচ্ছাচারী করে তোলে।
তোষামোদের মাধ্যমে একটি শ্রেণির ক্রমাগত অর্থনৈতিক স্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুরবস্থা তৈরি হতে থাকে। শ্রেণিবৈষম্য ও অর্থনৈতিক বৈষম্য তোষামোদের অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তোষামোদের অর্থনীতিতে চাটুকার ও সহযোগী শ্রেণি ক্রমে অর্থনৈতিক সম্পদ ও প্রতিপত্তি বাড়াতে থাকে। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের অবস্থার ক্রমাবনতি ঘটে। এ ধরনের ক্রমবর্ধমান বিভাজন ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
তোষামোদের চূড়ান্ত কথা হলো, মোসাহেবদের কোনো স্থায়ী প্রভু নেই, স্থায়ী আনুগত্য নেই, স্থায়ী অঙ্গীকার নেই; তাদের আছে শুধু স্থায়ী স্বার্থ। সুতরাং প্রভু বা নেতা বদল তোষামোদির একটি স্বাভাবিক দিক। চাটুকারেরাই নেতাদের ভুল পথে যাওয়ার পথ তৈরি করে এবং পুরোনো নেতাদের পতনের পর নতুন প্রভুর খোঁজে বের হয়। তোষামোদ গ্রহণকারী আত্মঅহংকারে ভুগে বাস্তবতাবিমুখ হয়ে পড়েন এবং নিজের ভুলত্রুটি দেখতে পান না। আমাদের সমাজে এই তোষামোদের সংস্কৃতি চালু আছে বলেই সত্য ও গঠনমূলক সমালোচনা গুরুত্ব পায় না। কর্মক্ষেত্র বা রাষ্ট্রে তোষামোদকে প্রাধান্য দিলে অযোগ্যতা ও দুর্নীতি বিস্তার লাভ করে; ফলে প্রকৃত উদ্ভাবন ও কাজের মান নষ্ট হয়।
আমাদের সমাজে এই তোষামোদী সংস্কৃতি সার্বিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। অতএব রাষ্ট্রকে গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করতে হবে এবং রাষ্ট্রের মানুষকেও মিথ্যা চাটুকারিতা বর্জন করতে হবে। সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সত্য ও শুদ্ধতার মনোভাব ধারণ করতে হবে।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা