দেশের কারাগারগুলো ধারণক্ষমতার চরম সীমা অতিক্রম করেছে। কারাগারগুলোর ৪৫ হাজারের কিছু বেশি বন্দি ধারণের সক্ষমতা রয়েছে। ১৯ আগস্ট কারা মহাপরিদর্শক জানিয়েছেন, বন্দির সংখ্যা এখন প্রায় ৯৮ হাজার।
অথচ মাত্র দুই মাস আগেও সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ৭ জুন পর্যন্ত ৭৫টি কারাগারে বন্দি ছিলেন ৭৭ হাজার ৪০ জন। বন্দির সংখ্যা এভাবে দ্রুত বাড়তে থাকা নিছক কারা ব্যবস্থাপনার সংকট নয়। এটি দেশের বিচারব্যবস্থা ও আইন প্রয়োগের কাঠামোগত দুর্বলতারও ইঙ্গিত দেয়।
গত বছর সেপ্টেম্বরে ‘জেনুইন রিফর্ম অর কসমেটিক শিফট’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বলা হয়েছিল, কারাগারের প্রায় ৭৫ শতাংশ বন্দিই বিচারাধীন মামলার আসামি। একই সময়ে অধস্তন আদালতেই ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বিচারাধীন মামলা ছিল ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৯২৪টি।
গত বছর নভেম্বর পর্যন্ত কারাগারে বিচারাধীন বা রিমান্ডে থাকা বন্দির হার ছিল ৭৩ দশমিক ১ শতাংশ। কারাগারে বন্দির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার সম্পর্ক রয়েছে। তাই বন্দির সংখ্যা কমানোর প্রথম শর্তই হওয়া উচিত বিচারাধীন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি।
কারাগারে বন্দি বাড়ার পেছনে সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভূমিকা রাখছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে করা মামলা, অন্যান্য ফৌজদারি মামলায় গ্রেফতার এবং স্বল্পমেয়াদি সাজা পাওয়া বিপুলসংখ্যক বন্দির কারাগারে আসা-যাওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
কারা মহাপরিদর্শকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জুন থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালতে ২৬ হাজারের বেশি আসামি দণ্ডিত হয়ে কারাগারে গেছেন। তাদের অনেকে এক দিন, পাঁচ দিন, সাত দিন, এক মাস বা তিন মাসের মতো স্বল্পমেয়াদি সাজা পেয়েছেন।
বিপুলসংখ্যক স্বল্পমেয়াদি সাজাপ্রাপ্ত বন্দি কারাগারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এই অবস্থায় অপরাধের ধরন ও সাজার মাত্রা অনুযায়ী বিকল্প ব্যবস্থা কতটা কার্যকর করা যায় সেটা ভাবতে হবে। বাংলাদেশের আইনেই প্রবেশনের সুযোগ রয়েছে। ১৯৬০ সালের প্রবেশন অব অফেন্ডার্স অর্ডিন্যান্সের আওতায় নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কারাদণ্ডের পরিবর্তে প্রবেশনে রাখার ব্যবস্থা আছে। সমাজসেবা অধিদফতরও প্রবেশন ও আফটার কেয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করে।
প্রথমবারের মতো অপরাধ করেছেন এমন ব্যক্তি, লঘু অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং সমাজের জন্য তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রবেশন, জামিন, নজরদারির আওতায় মুক্তি ও অন্যান্য অপ্রাতিষ্ঠানিক দণ্ডব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
কারাগারে স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার বন্দিকে রাখা হলে তাদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা, খাবার, পরিচ্ছন্নতা কিংবা সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বন্দির সংখ্যা বাড়তে থাকলে শুধু খাবারের বাজেট বাড়ানো বা নতুন ভবন নির্মাণ করেও সংকটের টেকসই সমাধান হবে না।
এত বিপুলসংখ্যক বন্দির বিপরীতে চিকিৎসক, নার্স, অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা অপর্যাপ্ত থাকলে বন্দির জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা কীভাবে নিশ্চিত হবে, সেটি গুরুতর প্রশ্ন। কারাগারে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাও ভাবনার বিষয়। অনেক সময় কারাগারেই অপরাধী নেটওয়ার্ক বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। দুর্ধর্ষ ও উগ্রবাদী বন্দিদের আলাদা করে রাখার ক্ষেত্রেও বড় সমস্যা তৈরি হওয়ার কথা জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক।
কারাগারে নতুন ভবন নির্মাণের প্রয়োজন থাকলে তা করতে হবে। তবে কেবল ভবন নির্মাণ করে মূল সমস্যার সমাধান হবে না। কারাগারের সংকটকে শুধু কারা বিভাগের সমস্যা হিসেবে দেখা সংগত হবে না। এই সমস্যা পুলিশকে দ্রুত ও মানসম্মত তদন্ত করতে হবে। প্রসিকিউশনকে আরও দক্ষভাবে মামলা পরিচালনা করতে হবে।
আদালতে বিচারাধীন মামলার অগ্রাধিকারভিত্তিক নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। বিচারাধীন বন্দিদের জন্য নিয়মিত ‘কেস রিভিউ’ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। কোন বন্দি কতদিন ধরে আটক, তার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃতি কী, জামিন পাওয়ার আইনগত সুযোগ আছে কি না, সর্বোচ্চ সম্ভাব্য সাজার তুলনায় তিনি ইতিমধ্যে কতদিন আটক আছেন- সেসব তথ্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থায় থাকা প্রয়োজন। কারা অধিদফতর, বিচার বিভাগ, পুলিশ, প্রসিকিউশন, আইন মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদফতরের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে