বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র ক্রমেই এশিয়ার দিকে সরে যাচ্ছে। চীন ও ভারতের মতো বড় অর্থনীতির উত্থানের প্রভাবে এ পরিবর্তন আরও গতিশীল হয়েছে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির বিনিময় বেড়েছে। এ কারণে এই অঞ্চলে নতুন অর্থনৈতিক শক্তির বিকাশ ঘটছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান মনে করেন, এশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থান বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সুযোগ কাজে লাগাতে হলে এশিয়ার বাজার ও আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে বাংলাদেশকে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে হবে। শুধু ভৌগোলিক অবস্থান দিয়ে এই সুবিধার সুফল ঘরে তোলা সম্ভব হবে না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চীন ও ভারতের মতো বড় দুই অর্থনৈতিক শক্তির প্রতিবেশী হওয়ায় বাংলাদেশের সুবিধাই হয়েছে। দুটি দেশের বাজারই বিশাল। উৎপাদন, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও তাদের সক্ষমতা বাড়ছে। তবে দেশ দুটির বিশাল বাজারে বাংলাদেশের রফতানি এখনও সম্ভাবনার তুলনায় খুবই কম। দেশের উৎপাদন খাত চীন ও ভারতের সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হলেও সেই সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ রয়েছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাই বাংলাদেশকে উৎপাদন ও সরবরাহের অংশীদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে হবে। এ জন্য পণ্যের মান, উৎপাদন দক্ষতা, পরিবহনব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। শুধু বড় দুই অর্থনৈতিক শক্তির প্রতিবেশী হয়ে থাকলে চলবে না।
রফতানির সীমিত পরিসর বাংলাদেশের বড় একটি দুর্বলতা। গুটিকয়েক পণ্য ও অল্প পরিসর বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের অর্থনীতির জন্য স্বাস্থ্যকর নয়। দীর্ঘদিন ধরে রফতানি বহুমুখীকরণের কথা বলা হচ্ছে। বাস্তব অগ্রগতি সামান্যই। পরিকল্পনা যে নেই তা নয়। তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দুর্বলতা আছে। এশিয়ার নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই দুর্বলতা কাটানো জরুরি। চীন, ভারতসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বাজারে প্রবেশের পাশাপাশি উৎপাদন, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশের বড় সম্পদ হচ্ছে ভৌগোলিক অবস্থান। বঙ্গোপসাগর দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। স্থল, সমুদ্র ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন হলে বাংলাদেশ বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। পদ্মা ও যমুনা সেতুসহ দেশের যোগাযোগ অবকাঠামো এ সম্ভাবনার ভিত্তি তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বন্দর, রেল, সড়ক ও নৌপথকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের উপযোগী করে গড়ে তোলার কথা বলছেন। সেটা করা গেলে আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার সুযোগ বাড়বে।
ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এ পরিবর্তনশীল বিশ্ব, অর্থনীতির নতুন ভূগোল, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এমন সংলাপ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে ভূরাজনীতি, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের গভীর সম্পর্ক আছে। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, এখন শুল্ক ও বাণিজ্যনীতি অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় কোনো একটি দেশ বা বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের বিপদের কারণ হতে পারে। বহুমুখী অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব হলে এ ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমবে।
এ কথা আর অস্বীকার করার উপায় নেই, এশিয়ার উত্থান বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। তবে নীতিনির্ধারকদের এটা বুঝতে হবে যে, দরজা খোলা থাকলেই সুযোগ আপনা-আপনি ধরা দেয় না। সম্ভাবনার দুয়ার দিয়ে সুযোগের পৃথিবীতে প্রবেশ করার জন্য প্রতিযোগিতামূলক শিল্প গড়ে তুলতে হবে। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং কার্যকর অর্থনৈতিক কূটনীতি নিশ্চিত করতে হবে। চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি এশিয়ার অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে তা বাস্তবায়ন করা জরুরি। প্রয়োজনীয় কাজগুলো সুনিপুণভাবে করা সম্ভব হলে বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এশিয়ার উত্থানের সুফল ঘরে তোলা সম্ভব হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএক