সম্মানসূচক সর্বনামের ব্যবহার কমে গেলেই যে সমাজে সম্মান কমে গেছে— এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। ভাষার পরিবর্তন অনেক সময় স্বাভাবিক বিবর্তনের ফল। নতুন প্রজন্মের কথ্য ভাষা, গণমাধ্যমের ভাষা, নগরায়ণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার পারস্পরিক প্রভাব— সবই সর্বনাম ও সম্মানসূচক ব্যবহারের ধরন বদলে দিতে পারে। এমনকি বাংলা ভাষায় সম্মানসূচক ব্যবহারের ধরন অঞ্চল, সম্পর্ক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী যথেষ্ট পরিবর্তিত হয়।
আমাদের ছোটবেলায় অনেক কিছুই ছিল আনন্দের, আবার অনেক কিছু ছিল আদেশ-নিষেধের, যা মোটেই পছন্দ হতো না। আবার এমন কিছু বিষয়ও ছিল যেগুলোকে আমরা এতটাই স্বাভাবিক বলে জানতাম যে, সেগুলো যে আসলে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শিক্ষার অংশ তা কখনো ভেবে দেখিনি। তেমনই একটি স্বাভাবিক বিষয় ছিল কিছু সর্বনামের ব্যবহার।
ধরা যাক, আব্বা বাসায় ফিরলেন। আমরা বলতাম, ‘আব্বা বাসায় এসেছেন। তিনি খুব ক্লান্ত।’ আবার ছোট কাউকে নিয়ে বলতাম, ‘সে খুব ক্লান্ত।’ অর্থাৎ মানুষটি কে, তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কী, তার বয়স ও সামাজিক অবস্থান কী— এসবের সঙ্গে সর্বনামেরও একটা সম্পর্ক ছিল। ভাষা আমাদের শুধু কথা বলতে শেখায়নি; মানুষকে কীভাবে দেখতে হবে, কীভাবে সম্বোধন করতে হবে, কোথায় সম্মান দেখাতে হবে— তাও নিঃশব্দে শিখিয়েছে।
বাংলা ভাষায় বিষয়টি আরও চমৎকার। এখানে সর্বনাম কেবল ব্যাকরণের কোনো নির্জীব উপাদান নয়; এর মধ্যেই সামাজিক দূরত্ব, ঘনিষ্ঠতা, সম্মান ও সম্পর্কের সূক্ষ্ম পার্থক্য প্রকাশ পায়। ‘তুই’, ‘তুমি’ ও ‘আপনি’— দ্বিতীয় পুরুষের সর্বনামে এই তিনটি সামাজিক স্তর যেমন আছে, তেমনি তৃতীয় পুরুষেও ‘সে’ ও ‘তিনি’, ‘ও’ ও ‘উনি’, ‘এ’ ও ‘ইনি’— এমন পার্থক্য রয়েছে। ভাষাবিজ্ঞানে এগুলোকে সম্মানসূচক বা সামাজিক মর্যাদা নির্দেশক সর্বনাম হিসেবে দেখা হয়। অবশ্য বাস্তব ব্যবহারে এই পার্থক্য সম্পর্ক, বয়স, অঞ্চল ও পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলাতেও পারে।
এই বৈশিষ্ট্য অবশ্য বাংলা ভাষার একার নয়। বহু ভাষায় ঘনিষ্ঠতা ও সম্মানের পার্থক্য সর্বনামের মাধ্যমে প্রকাশ পায়— যেখানে অনানুষ্ঠানিক ও ঘনিষ্ঠ সম্বোধনের জন্য এক ধরনের সর্বনাম, আর আনুষ্ঠানিক বা সম্মানসূচক সম্বোধনের জন্য অন্য ধরনের সর্বনাম ব্যবহৃত হয়। ফরাসিতে ‘তু’ ও ‘ভু’, জার্মানে ‘ডু’ ও ‘জি’, স্প্যানিশে ‘তু’ ও ‘উস্তেদ’— এসব উদাহরণ বহুল পরিচিত। বাংলাতেও এই সামাজিক পার্থক্যটি বেশ সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ পায়; বিশেষত দ্বিতীয় পুরুষে তুই, তুমি ও আপনি— তিনটি প্রচলিত রূপ রয়েছে।
আরবি ভাষা শিখতে গিয়ে বিষয়টি আমার কাছে আরও আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। আধুনিক প্রমিত আরবিতে বাংলা বা ইউরোপীয় কয়েকটি ভাষার মতো সাধারণ সম্মানসূচক সর্বনাম ব্যবস্থা নেই। একজন ব্যক্তিকে সাধারণত একবচন সর্বনামেই সম্বোধন করা হয়। তবে বিশেষ আনুষ্ঠানিক, রাজকীয় বা মর্যাদাসূচক পরিসরে একজন ব্যক্তিকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য বহুবচন রূপ ব্যবহারের একটি রীতি রয়েছে। অর্থাৎ একবচনের পরিবর্তে বহুবচন রূপ ব্যবহারের এই সীমিত ভাষাগত ঐতিহ্যও মানুষের সামাজিক সম্পর্ককে ভাষার মধ্যে ধারণ করে।
কিন্তু জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় কাটিয়ে দেওয়া ইংরেজিভাষী সমাজে এসে দেখলাম, ইংরেজিতে বাংলা ‘তিনি’ আর ‘সে’র মতো সম্মানভেদে আলাদা কোনো তৃতীয় পুরুষের সর্বনাম নেই। ‘হি’ বা ‘শি’ মূলত লিঙ্গভেদ প্রকাশ করে, সম্মানের মাত্রা বোঝাতে সর্বনাম বদলাতে হয় না। আবার আধুনিক ইংরেজিতে ‘দে’ ও ‘দেম’-এর মতো লিঙ্গনিরপেক্ষ সর্বনামের ব্যবহারও রয়েছে।
তখনও বিষয়টি আমাকে বিশেষভাবে ভাবায়নি— কারণ ভাষা তো সমাজেরই আয়না; এক ভাষায় যা আছে, অন্য ভাষায় তা নাও থাকতে পারে। কিন্তু ইদানীং বাংলা ভাষার দিকে তাকিয়ে আমার অস্বস্তি হচ্ছে অন্য কারণে। মনে হচ্ছে, আমরা শুধু ভাষাকে সরল করছি না; ভাষার ভেতরে যে সম্মানবোধের সূক্ষ্ম চিহ্নগুলো ছিল, সেগুলোকেও ধীরে ধীরে মুছে দিচ্ছি।
টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এমনকি সাহিত্যেও এখন প্রায়ই শোনা যায়— ‘আব্বা বাসায় এসেছে’, ‘তিনি’র বদলে ‘সে’, ‘স্যার বলেছে’, ‘হুজুর গেছে’, ‘বাবা খেয়েছে’। অথচ আমাদের শৈশবের ভাষায় ছিল— ‘আব্বা বাসায় এসেছেন’, ‘তিনি বলেছেন’, ‘স্যার বলেছেন’, ‘হুজুর গেছেন’, ‘বাবা খেয়েছেন’। এখানে পরিবর্তনটি শুধু সর্বনামে নয়; সম্মানসূচক ক্রিয়ার ব্যবহারেও। ‘এসেছেন’ এর জায়গায় ‘এসেছে’, ‘বলেছেন’ এর জায়গায় ‘বলেছে’, ‘গেছেন’ এর জায়গায় ‘গেছে’— এই পরিবর্তনও ভাষায় সম্মান প্রকাশের রীতির পরিবর্তনকে দৃশ্যমান করে।
প্রশ্ন হলো, এটি কি নিছক ভাষার পরিবর্তন, নাকি সমাজেরও পরিবর্তন?
ভাষাবিজ্ঞান আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা শেখায়— ভাষা শুধু বাস্তবতাকে প্রকাশ করে না, সামাজিক সম্পর্ককেও নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করে। কার সঙ্গে আমরা ‘তুই’ বলি, কার সঙ্গে ‘তুমি’, আর কার সঙ্গে ‘আপনি’— এগুলো কেবল ব্যাকরণ নয়; এগুলো সম্পর্কের সামাজিক সংকেত। একইভাবে তৃতীয় পুরুষে ‘সে’ ও ‘তিনি’ এবং সম্মানসূচক ক্রিয়ার ব্যবহারও বক্তার সামাজিক অবস্থান ও সম্পর্কের একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত বহন করতে পারে। বাংলা ভাষার সম্বোধন নিয়ে গবেষণাতেও বয়স, সামাজিক অবস্থান, ক্ষমতার সম্পর্ক, ঘনিষ্ঠতা, আত্মীয়তা ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যের সঙ্গে সম্বোধনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তাই সম্মানসূচক ব্যবহারের এই সংকোচনকে একটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের লক্ষণ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। পুরোনো সমাজে বয়স, পারিবারিক অবস্থান, শিক্ষকতা, ধর্মীয় জ্ঞান, সামাজিক মর্যাদা কিংবা অভিজ্ঞতার প্রতি যে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছিল, আধুনিক সমতাভিত্তিক সমাজের অনেক ক্ষেত্রেই তার প্রকাশ কমে এসেছে। সামাজিক সম্পর্ক ক্রমশ অনুভূমিক হচ্ছে, ‘আমি’ এবং ‘তুমি’র মধ্যকার দূরত্ব কমছে। এক অর্থে এটি সামাজিক অন্তরঙ্গতার বৃদ্ধি, অন্য অর্থে পুরোনো শ্রদ্ধার ভাষার সংকোচন।
মানুষ শুধু শব্দের অর্থ বোঝে না, শব্দের মাধ্যমে সম্পর্কও অনুভব করে। একজন সন্তান যখন বলে, ‘তিনি এসেছেন’, তখন বাক্যটি শুধু আগমনের সংবাদ দেয় না— তার সঙ্গে বক্তার একটি মানসিক অবস্থানও প্রকাশ করে। ‘সে এসেছে’ বললে তথ্যটি একই থাকতে পারে, কিন্তু সম্পর্কের অনুভূতিটা বদলে যায়। অর্থাৎ সর্বনাম কখনো কখনো আবেগের দূরত্ব মাপারও একটি ক্ষুদ্র যন্ত্র। আরবিতে প্রচলিত একটি সুন্দর বাক্য আছে, ‘পেট ক্ষুধার্ত হলে আওয়াজ করে, কিন্তু মস্তিষ্ক ক্ষুধার্ত হলে কোনো আওয়াজ করে না।’
কথাটি শুধু জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রেই নয়, মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। পেটের ক্ষুধা মানুষকে অস্থির করে তোলে, কিন্তু চিন্তা, রুচি কিংবা সম্মানবোধের ক্ষয় আমাদের তেমন কোনো সতর্কসংকেত দেয় না। হয়তো তাই ভাষা থেকে ‘তিনি’ ধীরে ধীরে হারিয়ে গেলেও আমরা সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারি না যে, একটি সর্বনামের সঙ্গে আমাদের সামাজিক অনুভূতিরও একটি সূক্ষ্ম অংশ ক্ষয়ে যাচ্ছে।
তবে এখানেই একটি সতর্কতা দরকার। সম্মানসূচক সর্বনামের ব্যবহার কমে গেলেই যে সমাজে সম্মান কমে গেছে— এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। ভাষার পরিবর্তন অনেক সময় স্বাভাবিক বিবর্তনের ফল। নতুন প্রজন্মের কথ্য ভাষা, গণমাধ্যমের ভাষা, নগরায়ণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার পারস্পরিক প্রভাব— সবই সর্বনাম ও সম্মানসূচক ব্যবহারের ধরন বদলে দিতে পারে। এমনকি বাংলা ভাষায় সম্মানসূচক ব্যবহারের ধরন অঞ্চল, সম্পর্ক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী যথেষ্ট পরিবর্তিত হয়।
তবু আমার ব্যক্তিগত অস্বস্তিটা থেকেই যায়। কারণ ভাষায় কাউকে ‘তিনি’ বলার ক্ষেত্র যখন ক্রমশ সংকুচিত হয়, তখন শুধু একটি সর্বনামের ব্যবহার কমে না; হারিয়ে যেতে পারে একটি সম্পর্কের ভাষাও। ‘তিনি’ শব্দটির মধ্যে এমন একটি দূরত্ব আছে, যে দূরত্ব অবমাননার নয়— সম্মানের। সেখানে মানুষটিকে আমার সমান মানুষ হিসেবেই দেখা হচ্ছে, কিন্তু তার বয়স, অবস্থান, সম্পর্ক কিংবা মর্যাদার প্রতি একটি নীরব স্বীকৃতিও দেওয়া হচ্ছে।
ইদানীং পশ্চিমা দুনিয়ায় সর্বনাম নিয়ে আরেক ধরনের ব্যস্ততা চোখে পড়ে। রংধনু পরিচয়ের মানুষদের কেউ কেউ নিজের নামের সঙ্গে আগেই জানিয়ে দেন— তাকে ‘হি’, ‘শি’, ‘দে’, ‘দেম’ বা অন্য কোনো সর্বনামে সম্বোধন করতে হবে। তার জৈবিক লিঙ্গ যাই হোক, তিনি নিজের জন্য যে সর্বনামটি নির্ধারণ করেছেন, সামাজিক যোগাযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে সেটিই ব্যবহারের প্রত্যাশা করেন।
একদিকে বাংলা ভাষায় যেখানে ‘তিনি’ থেকে ‘সে’তে নেমে আসাকে আমি সম্মানবোধের একটি সম্ভাব্য ক্ষয় হিসেবে দেখছি, অন্যদিকে পশ্চিমা সমাজের একটি অংশে সর্বনামই আবার ব্যক্তিগত পরিচয়ের প্রকাশ ও দাবির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ সর্বনাম হারিয়েও যাচ্ছে, আবার কোথাও নতুন অর্থে ফিরে আসছে— সর্বনামের এই পরিণতিই বোধহয় আমাদের সময়ের এক অদ্ভুত ভাষাগত পরিহাস। আশা করি বাংলাদেশে এই মহামারি কখনোই যেন না ছড়ায়। আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় বিপদ হয়তো এই নয় যে ছেলেমেয়েরা ‘সে’ বলছে, ‘তিনি’ বলছে না। বিপদটা হতে পারে তখন, যখন ভাষার ভেতরে সম্মান জানানোর প্রয়োজনটিই অদৃশ্য হয়ে যায়।
সর্বনাম শেষ পর্যন্ত সর্বনামই। তার নিজের কোনো অপরাধ নেই। অপরাধ যদি কোথাও থাকে, তবে হয়তো আমাদের সামাজিক স্মৃতিতে। আমরা যখন ‘তিনি’কে ‘সে’ দিয়ে প্রতিস্থাপন করি, তখন প্রত্যেকবারই হয়তো কিছু হারাই না; কিন্তু কখনো কখনো একটি ছোট্ট শব্দের সঙ্গে একটি বড় সামাজিক অনুভূতিও বিদায় নেয়। তাই আমার প্রশ্ন ভাষাবিদদের কাছে যতটা, সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের কাছেও ততটাই— বাংলা ভাষা কি কেবল সহজ হচ্ছে, নাকি আমরা ধীরে ধীরে সম্মান প্রকাশের একটি সূক্ষ্ম সামাজিক ব্যাকরণ ভুলে যাচ্ছি?
সর্বনামের সর্বনাশ হয়তো শেষ পর্যন্ত সর্বনামের নয়; প্রশ্নটা আমাদের সমাজের— আমরা কাকে কতটা সম্মানের সঙ্গে দেখতে এখনও শিখেছি?
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে