তুলা কৃষি ও শিল্পের টেকসই মেলবন্ধন

ড. রাধেশ্যাম সরকার

মতামত

প্রকৃতির সাদা আঁশের এই ফসলটির সঙ্গে মানুষের জীবন, শ্রম, পোশাক ও অর্থনীতির সম্পর্ক বহু শতাব্দীর। বাংলার মাটিতে উৎপাদিত সূক্ষ্ম তুলা

2026-10-07T04:10:15+00:00
2026-10-07T04:10:15+00:00
 
  বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬,
২২ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
তুলা কৃষি ও শিল্পের টেকসই মেলবন্ধন
ড. রাধেশ্যাম সরকার
প্রকাশ: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:১০ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
প্রকৃতির সাদা আঁশের এই ফসলটির সঙ্গে মানুষের জীবন, শ্রম, পোশাক ও অর্থনীতির সম্পর্ক বহু শতাব্দীর। বাংলার মাটিতে উৎপাদিত সূক্ষ্ম তুলা দিয়ে একসময় তৈরি হতো বিশ্বখ্যাত মসলিন। ইতিহাসের সেই গৌরব হারিয়ে গেলেও তুলার গুরুত্ব কমেনি বরং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের অভাবনীয় বিকাশে এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ২০২৬ সালের বিশ্ব তুলা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘কল্যাণের জন্য তুলা : বাণিজ্য, রূপান্তর ও অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সমৃদ্ধি গড়া’ তুলার বহুমাত্রিক গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে। ৭ অক্টোবরের এ দিবসের বার্তা হলো, তুলা শুধু মাঠের ফসল নয়, কৃষি ও শিল্পের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরির এক শক্তিশালী অর্থনৈতিক মাধ্যম। 

বিশ্বের ৭৫ থেকে ৮০টি দেশে উৎপাদিত এ ফসলের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ চাষি ও ১০ কোটির বেশি পরিবার। তুলা উৎপাদনের শ্রমশক্তির প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী এবং উৎপাদিত তুলার প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় পোশাক তৈরিতে। অর্থাৎ তুলার আঁশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের আয়, নারীর কর্মসংস্থান, সুতা ও বস্ত্রশিল্প, পোশাক রফতানি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দীর্ঘ অর্থনৈতিক শৃঙ্খল।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সংযোগের গুরুত্ব আরও গভীর। আমরা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ, অথচ পোশাক শিল্পের প্রধান কাঁচামাল তুলার জন্য ব্যাপকভাবে বিদেশের ওপর নির্ভরশীল। দেশের প্রায় ৪৫০টি স্পিনিং মিলের চাহিদার মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ তুলা দেশীয় উৎপাদন থেকে আসে। 

গত এক দশকে দেশে তুলা উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হলেও তা মোট চাহিদার ৫ শতাংশেরও কম। ২০২৫ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রায় ৭৮ লাখ ২০ হাজার বেল তুলা আমদানি করেছে, যার মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৪ সালে আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৩ লাখ ৩০ হাজার বেল। এ সময় আমদানির উৎসেও পরিবর্তন এসেছে। 

ব্রাজিল প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় তুলা সরবরাহকারী দেশ এবং সেখান থেকে এসেছে প্রায় ২১ লাখ ১০ হাজার বেল তুলা। ভারত নেমে এসেছে দ্বিতীয় স্থানে। অর্থাৎ পোশাক শিল্পে তুলার বিপুল চাহিদা তৈরি করছে কিন্তু সেই চাহিদা পূরণে বিপুল অর্থ বিদেশে যাচ্ছে। ফলে তুলা উৎপাদন বাড়ানো শুধু কৃষির উন্নয়ন নয়— শিল্পের কাঁচামাল নিশ্চিত করা, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় এবং কৃষি ও শিল্পের মধ্যে শক্তিশালী দেশীয় সেতুবন্ধ তৈরির বিষয়।

আমদানিনির্ভরতার বিপরীতে দেশীয় তুলা উৎপাদনের সম্ভাবনাও কম নয়। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৫ থেকে ২০২৬ বিপণন বছরে বাংলাদেশে প্রায় ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে ১ লাখ ৫৩ হাজার বেল তুলা উৎপাদনের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উৎপাদন ২ লাখ ২৪ হাজার বেলের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উৎসভেদে পরিসংখ্যানে পার্থক্য থাকলেও বাস্তবতা একটাই— দেশের চাহিদার তুলনায় দেশীয় উৎপাদন এখনও অতি সামান্য। 

পোশাক ও বস্ত্রশিল্পে বছরে প্রায় ৯০ লাখ বেল কাঁচা তুলার প্রয়োজনের বিপরীতে ২০২৫ থেকে ২০২৬ অর্থবছরে প্রায় ৭৩ লাখ বেল আমদানি করতে হয়েছে, যার পেছনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এই আমদানির সামান্য অংশও দেশীয় উৎপাদন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা গেলে কৃষকের আয় বাড়বে, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে এবং স্পিনিং শিল্পের কাঁচামালের জোগান কিছুটা নিশ্চিত হবে। তাই তুলার সম্ভাবনাকে শুধু কৃষির দৃষ্টিতে নয়, আমদানি হ্রাস ও শিল্পের কাঁচামাল নিশ্চিত করার কৌশল হিসেবেও দেখতে হবে।

তবে তুলা উৎপাদন বাড়ানোর অর্থ শুধু বেশি জমিতে চাষ নয়। কৃষকের লাভ, উৎপাদন সময়, বীজের মান, প্রযুক্তি, বাজার, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ন্যায্য দামকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। দেশে অতীতে উচ্চাভিলাষী উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা হাতে নেওয়া হলেও তা অর্জিত হয়নি। তুলা চাষে অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ সময় লাগে, বাজারদর ওঠানামা করে এবং কৃষকের দ্রুত নগদ আয়ের প্রয়োজন থাকায় অনেক জমি তুলার আওতায় আসেনি। 

অথচ চরাঞ্চল, বরেন্দ্র অঞ্চল, পাহাড়ি এলাকার উপযোগী জমি এবং কিছু পতিত বা স্বল্প ব্যবহৃত জমিতে তুলা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। সরকারি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ লাখ বেল এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ১৯ লাখ বেল তুলা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রায় ২ লাখ হেক্টর সম্ভাবনাময় জমিকে তুলা চাষের আওতায় আনার কথাও বলা হচ্ছে। উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাত, উপযোগী হাইব্রিড বীজ, আধুনিক প্রযুক্তি, পানি ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, যান্ত্রিকীকরণ এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি নিশ্চিত বাজার ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের লাভ এবং শিল্পের কাঁচামালের নিশ্চয়তাকে একই সূত্রে বাঁধতে পারলেই তুলা সত্যিকারের কৃষি ও শিল্পের সেতুবন্ধে পরিণত হবে।

তুলার অর্থনৈতিক শক্তি শুধু আঁশে সীমাবদ্ধ নয়। তুলাবীজ থেকে তেল পাওয়া যায়, অবশিষ্ট খৈল পশু ও মাছের খাদ্যে ব্যবহার করা যায় এবং বিভিন্ন উপজাত থেকেও মূল্য সৃষ্টি সম্ভব। ফলে তুলাকে কেন্দ্র করে কৃষি, খাদ্য, পশুপালন, মৎস্য, বস্ত্র ও অন্যান্য শিল্পের মধ্যে বহুমুখী অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। বিশ্বে তুলা খাতও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফাও-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ২৬ মিলিয়ন টন তুলা উৎপাদিত হয়েছে এবং ৯ মিলিয়ন টনের বেশি তুলা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এসেছে। 

একই সময়ে বিশ্ব আঁশ ব্যবহারে তুলার অংশ ষাটের দশকের প্রায় ৬০ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে প্রায় ২২ শতাংশে নেমে এসেছে, মূলত কৃত্রিম আঁশের দ্রুত বিস্তারের কারণে। তাই তুলার ভবিষ্যৎ শুধু উৎপাদন বাড়ানোর ওপর নয়, মান, উৎপাদন দক্ষতা, পরিবেশগত স্থায়িত্ব, প্রযুক্তি, মূল্য সংযোজন ও বাজার সংযোগের ওপরও নির্ভরশীল। এখানেই ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্যের ‘বাণিজ্য, রূপান্তর ও অংশীদারিত্ব’ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তুলা কাঁচামাল হিসেবে বিক্রি না করে তা থেকে সুতা, কাপড়, পোশাক ও অন্যান্য পণ্যে দেশীয় মূল্য সংযোজন বাড়াতে পারলে আয় ও কর্মসংস্থানের বড় অংশ দেশের ভেতরে রাখা সম্ভব।

বাংলাদেশে এ পরিবর্তনের সূচনাও দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন ও কটনকানেক্ট দেশীয় তুলা উৎপাদন, টেকসই ও শনাক্তযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা এবং বিপণন সহযোগিতা বাড়াতে সমঝোতা করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ লাখ বেল উৎপাদন, পুনরুজ্জীবনমূলক কৃষি, পরিবেশগত ও সামাজিক মানদণ্ড এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে দেশীয় তুলাকে যুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা হাতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তুলাকে কৃষিপণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ এবং ২০২৬ থেকে ২০২৭ অর্থবছরে ২০ কোটি টাকা প্রণোদনার আওতায় ২৬ জেলার প্রায় ২৫ হাজার প্রান্তিক কৃষককে বীজ, সার ও বালাইনাশক সহায়তার কর্মসূচি রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প না রেখে কৃষক, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্পিনিং ও বস্ত্রকল, তৈরি পোশাকশিল্প, উদ্যোক্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও রফতানিকারকদের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বে আনতে হবে। কৃষকের উৎপাদন ও শিল্পের চাহিদার মধ্যে সরাসরি বাজারসংযোগ তৈরি হলেই Cotton for Good-এর বাণিজ্য, রূপান্তর ও অংশীদারিত্বের দর্শন বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ নেবে।

বিশ্ব তুলা দিবস ২০২৬-এর Cotton for Good বাংলাদেশের জন্য নিছক একটি দিবসের বার্তা নয়, কৃষি ও শিল্পের সম্পর্ককে নতুনভাবে দেখার সুযোগ। ভালো তুলা মানে শুধু বেশি উৎপাদন নয়, কৃষকের আয় বৃদ্ধি, নারীর কর্মসংস্থান, তরুণের কাজ, পতিত জমির ব্যবহার, শিল্পের নির্ভরযোগ্য কাঁচামাল, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন। তাই পুরোপুরি আত্মনির্ভরতার অবাস্তব লক্ষ্য নয়, বাস্তবসম্মতভাবে আমদানিনির্ভরতা কমানোই হওয়া উচিত বাংলাদেশের লক্ষ্য। এ জন্য গবেষণা ও জাত উন্নয়ন, উৎপাদন ব্যয় কমানো, ন্যায্য ও স্থিতিশীল দাম এবং দেশীয় তুলা ব্যবহারকারী শিল্পে প্রণোদনা জরুরি।

বাংলার তুলা একদিন মসলিনের মাধ্যমে বিশ্বকে বিস্মিত করেছিল। সেই ঐতিহ্যের আধুনিক উত্তরাধিকার হতে পারে এমন এক তুলাভিত্তিক অর্থনীতি, যেখানে কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা ও রফতানিকারক একই অর্থনৈতিক শৃঙ্খলে যুক্ত হবে। তখন তুলা শুধু ফসল নয়, হয়ে উঠবে কৃষি ও শিল্পের নতুন সেতুবন্ধন। মানুষের কল্যাণ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও টেকসই অংশীদারিত্বের এই পথই হবে সত্যিকারের Cotton for Good. 

কৃষিবিদ ও প্রাবন্ধিক
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 
  বিষয়:   তুলা কৃষি  শিল্প  টেকসই  মেলবন্ধন  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: