বহুমেরুকেন্দ্রিক মধ্যপ্রাচ্যের উত্থান

জাকির পারভেজ

মতামত

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য এক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। যেখানে পুরোনো ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে এক নতুন আকার ধারণ করছে। বিজ্ঞজন

2026-10-06T04:42:26+00:00
2026-10-06T04:42:26+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬,
২১ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
বহুমেরুকেন্দ্রিক মধ্যপ্রাচ্যের উত্থান
জাকির পারভেজ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৪২ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য এক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। যেখানে পুরোনো ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে এক নতুন আকার ধারণ করছে। বিজ্ঞজন বলে থাকেন— এই রূপান্তরকালের মধ্যেই নানা সংঘাত ও সংকটের জন্ম হয়। এ ক্ষেত্রে ইতালীয় দার্শনিক আন্তনিয়ো গ্রামসির একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। গ্রামসির ভাষায়— ‘পুরোনো ব্যবস্থাটি বিলীয়মান অথচ নতুনের জন্ম হচ্ছে না, এই অন্তর্বর্তী সময়ে নানাবিধ অসুস্থ লক্ষণ দেখা দেয়।’ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি যুদ্ধ ও সংকট বর্তমান ভূরাজনৈতিক সমীকরণকে অনেকটাই পাল্টে দিয়েছে; বিশেষ করে গাজা ও ইরানের যুদ্ধ, বাশার আল-আসাদের পতন। হামাস, হিজবুল্লাহ ও সবশেষ হুথিদের শক্তিশালী উত্থানে বেশ কিছু রাষ্ট্রীয় নীতি ও পরিকল্পনায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।

এ বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যে স্বপ্ন নিয়ে ইরানে হামলা করেছিল তা অঙ্কুরেই ধূলিসাৎ হয়েছে। কারণ যেভাবে ইরান এই যুদ্ধে কাউন্টার দিয়েছে, তাতে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন— ভবিষ্যতে ইরানই এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া প্রভাব কমবে। ইরান যেভাবে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিজয় অর্জন করেছে, তাতে ইরানকেই বিজয়ী হিসেবে ধরা যায়। এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন একচেটিয়া মার্কিন আধিপত্য বজায় ছিল। ইরান পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে বিপুল পরিমাণ মার্কিন ঘাঁটি ও নিরাপত্তা কাঠামোকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। জিমি কার্টার ও রোনাল্ড রিগ্যানের সময় থেকেই ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করার অভিপ্রায়ে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামো সাজানো হয়। এবারের যুদ্ধে ইরান সেই কাঠামো ভাঙতে সক্ষম হয়েছে।

চলমান যুদ্ধে ইরান তিনভাবে ওয়াশিংটনের আধিপত্য খর্ব করতে সক্ষম হয়— এক. উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও তাদের সম্পদ ধ্বংস করা। দুই. যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল ও ভারী অস্ত্রের বিপরীতে তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল অস্ত্র ব্যবহার করা। তিন. হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করা।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায় ইরান এই তিনটি কৌশলকেই অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে প্রয়োগ করতে পেরেছে। ইরান প্রথমে বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দফতর ধ্বংস করে। এতে মার্কিনরা তাদের রাডার ব্যবস্থা হারিয়ে বিপাকে পড়ে। গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের পরিধি কমে যায়, যা ছিল যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। 

যুদ্ধের পঞ্চম মাসে ইরান উপসাগরীয় মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে এমন ধ্বংসযজ্ঞ চালায়; শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চল থেকে তাদের ঘাঁটিগুলো সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এগুলো পুনরায় চালু করার কোনো অভিপ্রায় যুক্তরাষ্ট্রের নেই। ইরানের আরেকটি চমৎকার কৌশল ছিল— যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক প্রযুক্তির দামি অস্ত্রগুলোকে মোকাবিলা করেছে দীর্ঘপাল্লার মিসাইল ও ব্যাপক সংখ্যক সস্তা ড্রোনের মাধ্যমে। মার্কিন কংগ্রেসের এক রিপোর্ট অনুযায়ী— এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত যুদ্ধের প্রথম দুদিনেই প্রায় ৫.৬ বিলিয়ন ডলার এবং মোট খরচ হয়েছিল ৩৩.৪ বিলিয়ন ডলার। যার মধ্যে শুধু যুদ্ধাস্ত্র বাবদই খরচ হয়েছিল ২২.৩ বিলিয়ন ডলার। অথচ ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের মোট ব্যয় ছিল আনুমানিক ৩-৪ বিলিয়ন ডলার। সিএসআইএসের গবেষকরা এক বিশ্লেষণে বলেছিলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের প্যাট্রিয়ট ও থার্ড ইন্টারসেপ্টরের প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি ব্যবহার করে ফেলেছে। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি স্বীকার করেনি, তবে তাদের বক্তব্য বিশ্লেষণে অনেকটাই এর সত্যতা সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়।

সুতরাং বলা যায়, এই যুদ্ধের ব্যয়ভারও যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটার অন্যতম নিয়ামক ছিল। ইরানের সবশেষ মোক্ষম অস্ত্র হলো— হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া। এটাই এখন সে ব্যবহার করছে। জ্বালানি তেলের সাপ্লাই বন্ধ করা, পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও ভয়ংকর। বিশ্বের জ্বালানি সাপ্লাই চেইনের গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রবেশদ্বার হলো হরমুজ ও বাব আল মান্দেব প্রণালি। হরমুজ বন্ধ হওয়ার পর সম্প্রতি ইরানের প্রক্সি গ্রুপ হুথিরা বাব আল মান্দেব দখলে নিয়েছে। শুধু তাই নয়, লোহিত সাগরের তীরে তেল সাপ্লাই করার সবশেষ পথ ছিল ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন। সেটিও বন্ধ হওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। শুরু হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার বিন্যাস পরিবর্তনের হিসাব-নিকাশ। আর ইরান মূলত এটাই চেয়েছিল। এখানে পশ্চিম এশিয়া থেকে শুরু করে ইউরোপ পর্যন্ত নড়েচড়ে বসেছে। সবচেয়ে কঠিন ক্যালকুলাসে এখন সৌদি আরব। এই সমীকরণগুলো ধীরে ধীরে জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে।

বিশ্ব রাজনীতির এই মোড়বদল বোঝার জন্য ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ব্যবহার করে থাকেন মর্ডান পোর্টফোলিও থিওরি। যদিও এটি অর্থনীতিবিদ হ্যারি মার্কোউইৎজের বিনিয়োগ তত্ত্ব হিসেবে পরিচিত, তবু এটির ভূরাজনীতিতে প্রয়োগ রয়েছে। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো— সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখবেন না।

ছোট বা মাঝারি রাষ্ট্রগুলো বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে যেকোনো একটি দেশের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা। হেজিং কৌশল অবলম্বন করা। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একাধিক সম্পর্কের জাল তৈরি করা। এতে যেমন ঝুঁকি কমে আসে, তেমনি সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। বর্তমানে সারা বিশ্বেই এটি ঘটছে, তবে মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে কেন্দ্র করে এই তত্ত্বের অধিকতর প্রয়োগ লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রথমে সৌদি আরবের প্রসঙ্গেই আলোচনা করা যাক। সৌদি আরব দীর্ঘদিন তার নিরাপত্তার দায়ভার দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের কাঁধে। সাম্প্রতিক গাজা ও ইরান যুদ্ধে হঠাৎ যুক্তরাষ্ট্রের পিছুটান, অনেকটা সৌদি আরবকে একা ফেলে চলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিকে ইঙ্গিত দেয়। হুথিদের বাব আল মান্দেব দখলের পর সৌদির ডাকে সাড়া না দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র চলে গেল হুথিদের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে। নিজের তেল ট্যাঙ্কার যাওয়ার রাস্তা পরিষ্কার করল সৌদি আরবকে সামরিক সহযোগিতা না করার প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে। তবে সৌদি আরবও ইতিমধ্যেই ভিন্ন পথে পা বাড়িয়েছে। ‘মক্কা চুক্তি’ বাস্তবায়ন ত্বরান্বিতকরণসহ ইউরোপ ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিবর্তনে এই অঞ্চলে চীনের উপস্থিতি আরও জোরদার হবে। সৌদির সঙ্গে চীনের ৫ বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধ ড্রোন তৈরির চুক্তি রয়েছে।

এর সঙ্গে চীনের অস্ত্র বিক্রি আরও বাড়বে। ‘মক্কা চুক্তির’ একটি শক্তিশালী অংশীদার হলো পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান। আবার চীনা অস্ত্রের প্রধান ক্রেতাও পাকিস্তান। তারা যৌথভাবে ড্রোন ও যুদ্ধবিমান তৈরি করে। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রধান শক্তি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান, এটাও চীনের তৈরি। চীন অনেক আগে থেকেই বলে আসছে— মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর বাইরের শক্তির ওপর নির্ভর না করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গঠনে নিজেদের দিকে মনোযোগী হওয়া উচিত। বর্তমানে চীনের বলা কথাগুলোরই প্রতিফলন ঘটছে। এতে চীনের কূটনীতি, অস্ত্র বিক্রি, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের প্রতি মধ্যপ্রাচ্য আরও বেশি আকৃষ্ট হবে। তবে পাকিস্তানের হিসাবটা একটু জটিল। পাকিস্তান একদিকে যেমন মক্কা চুক্তিতে রয়েছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে তার পাইপ নির্মাণ প্রজেক্টসহ বেলুচিস্তান ইস্যুতে অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। সুতরাং সৌদি আরব ইরান কর্তৃক আক্রান্ত হলে পাকিস্তানের জন্য অস্ত্র ধরা কঠিন হয়ে পড়বে। এদিকে ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরাইল নিজেদের মধ্যে একটি নতুন সম্পর্ক তৈরি করতে চাচ্ছে। তারা বলেছে এই সম্পর্ক কোনো জোটের বিরুদ্ধে নয়; নিজেদের মধ্যে প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক সংযোগ গড়ে তোলাই এ জোটের প্রধান লক্ষ্য হবে।

পঞ্চাশের দশক থেকেই ইউরোপ মধ্যপ্রাচ্যের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকেই সমর্থন করেছে। ইউরোপের সরকারগুলো ছিল যেন যুক্তরাষ্ট্রের চিরস্থায়ী ক্রীড়নক। তবে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধের পরে ইউরোপও নড়েচড়ে বসেছে। জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় তারা আর যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। তারা এখন ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে চায়। ইরানও হরমুজ প্রণালিতে তার টোল ব্যবস্থার স্বীকৃতি আদায় করতে ইউরোপকে কাছে টানছে। ইউরোপের জন্য টোলের হার কমানোর অফারও দিয়েছে। ইউরোপকে কাছে টানলে এটা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একটি শক্তিশালী চাপ তৈরি করবে।

ইন্সট্রাক্টর (রসায়ন), ভেড়ামারা সরকারি টিএসসি, কুষ্টিয়া
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   বর্তমান  মধ্যপ্রাচ্য  পরিবর্তন  সন্ধিক্ষণ  বিলুপ্ত  বিজ্ঞজন  রূপান্তরকাল  সংঘাত  সংকট  জন্ম  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: