সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (বিওবিসি) ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতির মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। জাহাজ চলাচল, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ সংলাপ, অংশীদারিত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে বিশ্বাসী উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশ তার সব আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করে যাবে। কারণ, শান্তি ও সম্প্রীতিই যৌথ সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি। তিনি আরও বলেন, আঞ্চলিক অভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানকে অভিন্ন সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে হলে আরও গভীর দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত করা সম্ভব। নতুন বাজার উন্মুক্ত করার পাশাপাশি তরুণদের জন্য আরও সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। সমতা, ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে আরও শক্তিশালী সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।
বঙ্গোপসাগরকে শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ অঞ্চল হিসেবে ধরে রেখে যেকোনো বহিরাগত সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বঙ্গোপসাগর শুধু এ অঞ্চলের জন্য নয়, ভারত মহাসাগর ও ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ভৌগোলিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ সামুদ্রিক স্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক সংযোগ, জলবায়ু নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সামুদ্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা ভারত ও চীন উভয় দেশের জন্যই জরুরি। বঙ্গোপসাগরকে নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে রাখা বাংলাদেশের স্বার্থের পাশাপাশি ভারত ও চীনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। অঞ্চলটি যেন কোনো বহিরাগত সামরিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র হয়ে না ওঠে, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে কোনো নির্দিষ্ট শক্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার একটি উপাদান হিসেবে দেখতে হবে।
বাংলাদেশকে ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক আগ্রহ ও মনোযোগ থাকলেও চীনের মতো করে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার ব্যাপারে সম্পদ বা সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলছে— এমন ধারণা বাংলাদেশে তৈরি হলেও আদতে তেমন প্রতিযোগিতার উপস্থিতি নেই। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মূল আগ্রহ অর্থনৈতিক, নাকি চীনকে প্রতিহত করা— এমন প্রশ্ন কারও কারও মনে জাগতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া থেকে থামাতে পারবে না। বাংলাদেশ তার নিজস্ব স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি মৌলিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, যা ভবিষ্যতেও থাকবে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নিজেদের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেবে, এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ উন্নয়নের জন্য কোন দেশ থেকে অর্থ বা সম্পদ নিচ্ছে, সেটি ভারতের জন্যও সমস্যা হওয়া উচিত নয়। তবে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা যদি বাইরের শক্তির সহায়তায় আরও জটিল হয়ে ওঠে, তখন তা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশ এবং নিজেদের জনগণের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার তার রয়েছে। অন্য কোনো দেশের উচিত নয় বাংলাদেশকে কী করতে হবে, সে বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া। বাংলাদেশের সঙ্গে অন্য দেশের সম্পর্ক কেমন, তার ওপর ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নির্ভর করে না। বরং প্রতিবেশী হিসেবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মর্যাদা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
এখন বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র এশিয়ার দিকে সরে আসছে। চীন ও ভারতের মতো বড় অর্থনীতির উত্থানের সঙ্গে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বিনিময় বাড়ছে। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্যও বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে এশিয়ার আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খল ও বাজারের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হতে হবে। চীন ও ভারতের মতো দুটি বড় অর্থনীতি বাংলাদেশের প্রতিবেশী। ফলে বাংলাদেশ অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর এখন বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন পশ্চিমা দেশগুলোর যে প্রভাব ছিল, তা দিনে দিনে কমছে। পক্ষান্তরে এশিয়া এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এশিয়ার দেশগুলোর পণ্য রফতানির সক্ষমতা বেড়েছে। ফলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সক্ষমতাও বাড়ছে। বৈদেশিক সাহায্য, বিনিয়োগ ও মূলধনের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আগের মতো পশ্চিমা বিশ্বের ওপর অতটা নির্ভর করতে হচ্ছে না। পাশ্চাত্যের অতীতনির্ভরতা কাটিয়ে এশিয়ার দেশগুলো নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সহযোগিতার বন্ধন গড়ে তুলেছে। এশিয়াই এখন বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ক্রমেই বিশ্বের প্রধান বাণিজ্যিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে এশিয়া। এশিয়ার অধিকাংশ দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদারও এখন এই অঞ্চলের দেশগুলো। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাশাপাশি আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশের বাণিজ্যেও এশিয়ার দেশগুলোর ভূমিকা বাড়ছে।
শুধু বাণিজ্য নয়, প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও এশিয়ার অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি খাতে চীন এগিয়ে আছে। গবেষণাপত্র ও নিজস্ব মেধাস্বত্বের দিক থেকেও তারা এগিয়ে যাচ্ছে। চীন এখন বিশ্বের অনেক দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার। ঋণ, সাহায্য ও মূলধনের ক্ষেত্রেও চীন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। একসময় যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপ এই জায়গায় ছিল। ফলে তারা অনেক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করত। অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে শুল্কের ব্যবহারও বেড়ে চলেছে। এশিয়ার এই উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমা দেশগুলোর নীতিতেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অর্থনীতি এখন কৌশলগত ও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের ওপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে। কোনো কোনো দেশকে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যঘাটতি কমাতে সেখান থেকে বেশি পণ্য কিনতে হবে। এমনকি বিনিয়োগ ও বাণিজ্যনীতির ক্ষেত্রেও চাপ দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইউরোপের কিছ দেশও এ ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। বাজারে প্রতিযোগিতা করে পণ্য বিক্রির বদলে রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে বাজার তৈরি করার চেষ্টা থেকে বোঝা যায়, বিশ্বায়ন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া থেকে সরে যাচ্ছে। ফলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থান থামানো কঠিন। ক্রয়ক্ষমতার সমতার হিসাবে চীন ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। ভবিষ্যতে চলতি মূল্যে মোট দেশজ উৎপাদনের নিরিখেও চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। পরিবর্তিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্য বিরাট সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই পরিবর্তিত বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— এশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সংযোগ আরও বাড়ানো। বাংলাদেশের রফতানি এখনও হাতে গোনা কয়েকটি বাজারের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে দেশের আমদানি ও ক্রমবর্ধমান মূলধনের বড় অংশ এশিয়া থেকে আসছে। তাই এশিয়ার সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশকে আরও জোরালোভাবে যুক্ত হওয়া দরকার।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুবিধার একটি হলো— চীন ও ভারতের প্রতিবেশী হওয়া। আগামী এক দশকে চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি এবং ভারত তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের উৎপাদন খাত চীন ও ভারতের সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে কিছুটা যুক্ত হলেও এ দুদেশের বিশাল বাজারে রফতানির সুযোগ এখনও যথেষ্ট কাজে লাগানো হয়নি। বাংলাদেশের অর্থনীতির বহুমুখীকরণ নিয়ে অনেক পরিকল্পনা আছে। কিন্তু দুর্বলতা রয়েছে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সুযোগ কাজে লাগাতে হলে কৌশলগত পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন— দুই ক্ষেত্রেই আরও কার্যকর হতে হবে। ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশের বড় সম্পদ হতে পারে। এর সদ্ব্যবহার করতে হবে।
বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব শুধু বঙ্গোপসাগরে নয়, দেশের স্থলভৌগোলিক অবস্থানের মধ্যেও আছে। পদ্মা সেতু ও যমুনা সেতুর মাধ্যমে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং শেষ পর্যন্ত ইউরোপের সঙ্গে স্থল যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একসময় বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমারকে নিয়ে বিসিআইএম উদ্যোগের মাধ্যমে আঞ্চলিক যোগাযোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ভবিষ্যতে এ ধরনের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার উদ্যোগ নতুন করে গুরুত্ব পেতে পারে।
এশিয়ার জন্য ভবিষ্যতে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। ভারত ও চীনের মধ্যকার টানাপোড়েনই এর অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক থাকলেও সীমান্ত নিয়ে এখনও তাদের বিরোধ রয়েছে। দুই দেশের সহযোগিতা বাড়লে এশিয়ার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও বাড়বে। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশও ভূমিকা রাখতে পারে। চীন ও ভারতের বাজার, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ তার অর্থনীতিকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য যে এশিয়ার দিকে সরে আসছে, এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশের জন্য তাই গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই পরিবর্তনের প্রকৃতি বুঝে এশিয়ার সঙ্গে আরও গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্কে জড়ানো।
সাবেক ব্যাংকার
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা