যিনি অকালে দুনিয়া ছেড়ে আমাদের মাঝ থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন, তিনি আধুনিক যুগসচেতন এক অনন্য সাংবাদিক— তৌফিক ইমরোজ খালিদী। কর্মজীবনে তিনি যা রেখে গেছেন, তা নিয়ে সবাই এক ধরনের অতৃপ্তি অনুভব করবেন। সবার প্রত্যাশা ছিল— তিনি বেঁচে থাকলে জাতিকে আরও অনেক কিছু দিতে পারতেন এবং বহু সমাজসচেতন ও গুণী সাংবাদিক তৈরি হতো তার হাত ধরে। এই প্রত্যাশা আমাদের মধ্যে থাকাটাই স্বাভাবিক।
তবে আমি মনে করি, এমন অসাধারণ সম্ভাবনাময় একজন সাংবাদিকের সমাজের কাছে নিজের কাজ ও আকাঙ্ক্ষা অসম্পূর্ণ রেখে বিদায় নেওয়ার মধ্যেই তিনি চিরদিন জীবিত থাকবেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্পের সেই অমর চরণের মতোই— ‘শেষ হয়েও হইলো না শেষ’; তার চলে যাওয়ার মধ্যে রয়ে গেল এক গভীর অতৃপ্তি।
তৌফিক ইমরোজ খালিদী ভাই ছিলেন বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতার পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান ‘বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম’-এর প্রধান সম্পাদক। এই পত্রিকার সংবাদের গুণগত মান ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কখনো প্রশ্ন ওঠেনি; সচেতন পাঠকের কাছে এটি ছিল নির্ভরযোগ্যতার শীর্ষস্থান।
বিডিনিউজের শুরু থেকেই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সুমন মাহমুদের সঙ্গে আমি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের বিষয়ে যুক্ত ছিলাম। ২০০৭ সালের এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বিডিনিউজের অনলাইন ও তাৎক্ষণিক ‘ব্রেকিং নিউজ’ যৌথভাবে গ্রামীণফোনে রিং করে ও এসএমএসের মাধ্যমে পাওয়া যেত। তখন সবার কাছে এ নতুন পদ্ধতিতে খবর সংগ্রহ ও পরিবেশন অত্যন্ত আকর্ষণীয় ছিল। সুমন ভাইয়ের সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছরের পথপরিক্রমার সুবাদেই মূলত তৌফিক ভাইয়ের সঙ্গে আমার যোগাযোগ। মাঝে মাঝে কথা হতো, কোথাও কোনো অনুষ্ঠানে কয়েক মিনিটের জন্য সাক্ষাৎ হতো।
তবে আমাদের সম্পর্কের মোড় ঘোরে ২০১২ সালে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার ইফতার মাহফিলে তিনি এসেছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী আমি সবাইকে গেট থেকে স্বাগত জানিয়ে নির্ধারিত চেয়ারে কিংবা মঞ্চে বসানোর দায়িত্বে ছিলাম। তৌফিক ভাই ইফতার শুরু হওয়ার কয়েক মিনিট পর এলেন। আমি তাকে স্বাগত জানিয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রীকে সালাম করিয়ে মঞ্চে আসন গ্রহণ করালাম। ইফতার শেষে কয়েকজন অতিথির সঙ্গে কুশল বিনিময় করে তিনি বিদায় নেন।
সেদিন রাতে তৌফিক ভাই নিজেই আমাকে ফোন দিলেন। তার প্রথম বাক্যটিই ছিল— ‘এত বড় দলের ইফতার চলাকালে মূল নেত্রীকে মঞ্চে রেখে আমাকে রিসিভ করে, পরিচয় করিয়ে দিয়ে মঞ্চে বসালেন! এটা সম্ভবত আপনার পক্ষেই সম্ভব। আপনি কেমন কর্মঠ, তা সুমন মাঝেমধ্যে বলত; আজ নিজেই উপলব্ধি করলাম। আপনার জন্য শুভকামনা রইল। এক দিন আসেন, রাজনৈতিক আড্ডা দেব।’ আমি সংক্ষেপে উত্তর দিয়ে বিদায় নিয়েছিলাম।
এরপর থেকে প্রায়ই আমাদের কথা হতো। বিএনপির সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সিনিয়র কয়েকজন নেতার সঙ্গে তার বেশ সুসম্পর্ক ছিল, তারা প্রায়ই একসঙ্গে আড্ডায় বসতেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন লন্ডনে ছিলেন, তখন তৌফিক ভাই প্রায়ই তার কথা জানতে চাইতেন এবং নিজ থেকেই বিভিন্ন আলোচনা করতেন। তারেক রহমানের রাজনৈতিক সম্ভাবনা ও কর্মদক্ষতা তার ভালো লাগত। তৌফিক ভাই কখনো তারেক রহমানকে নিয়ে একটি নেতিবাচক শব্দও উচ্চারণ করেননি। তিনি বলতেন, ‘জিয়াউর রহমানের ছেলে হিসেবে তার চর্চাগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখবেন, তারেক সর্বোচ্চটা দিতে পারবেন; তার মধ্যে সেই ধৈর্য আছে।’
গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে বেশ গভীর রাতে তার সঙ্গে আমার সর্বশেষ কথা হয়। সেদিন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রতিবেশী দেশসহ নানা বিষয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা হয়েছিল। তার শেষ কথাগুলো আমাকে ভীষণভাবে স্পর্শ করেছিল।
অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তৌফিক ইমরোজ খালিদী আমাকে বলেছিলেন— ‘সরকারকে সাহায্য করুন দেশের জন্য। আর রাজনীতি যেন সহনশীল হয়, সেই চেষ্টা রাখুন। আপনি দলের সঙ্গে আছেন, আবার পত্রিকার কাজের সঙ্গেও যুক্ত আছেন; তাই কাছে থেকে বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারেন। আমাদের সবার কল্যাণের জন্য এই সংগ্রামটা অব্যাহত রাখতে হবে। আমি দেশের বাইরে যাচ্ছি; ফিরে এসে আড্ডা দেব। সুমনের সঙ্গে কথা বলে চলে আসবেন।’
কিন্তু সেই আড্ডা আর হলো না, আর কোনোদিন সাক্ষাৎও হবে না। তিনি আমাদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলেন। তার বিচক্ষণতা ও সমৃদ্ধ সাংবাদিকতার গুণাবলি ধারণ করেই আমরা এগিয়ে নিয়ে যাব আগামীর— সবার স্বপ্নের বাংলাদেশকে।
লেখক : সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি