বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে দালালের দৌরাত্ম্য নতুন কোনো বিষয় নয়। দালালবিরোধী অভিযানও কম হয়নি। তবে পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। মিরপুর বিআরটিএ কার্যালয়ে দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়ে সময়ের আলোয় গতকাল প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে একজন দালালকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার টেবিল থেকে সরকারি সিল নিয়ে ব্যবহার করতে দেখা গেছে। একজন দালাল কীভাবে সরকারি কার্যালয়ের ভেতরে এমন কর্তৃত্ব নিয়ে কাজ করেন, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ আছে, বিআরটিএতে সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া জটিল। সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে তথ্যের ঘাটতি আরেকটি সমস্যা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অসহযোগিতার কারণে সেবাপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষ নিরুপায় হয়ে দালালের শরণাপন্ন হন। অভিযোগ রয়েছে যে, যেসব সেবাপ্রত্যাশী নিয়ম মেনে কাজ করতে যান তাদের এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরতে হয়। কখনো কখনো দিনের পর দিন ঘুরেও কাজ হয় না। অথচ একই কাজ দালালরা ঘণ্টাখানেকের মধ্যে করে দিচ্ছেন। ফলে বাড়তি টাকা দিয়ে দ্রুত কাজ করিয়ে নেওয়ার দিকে ঝুঁকছেন অনেক সেবাপ্রত্যাশী।
ব্যাংকে বিআরটিএর ফি জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে দালালদের উপস্থিতি। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সেবাপ্রত্যাশীদের কাছে গিয়ে দালালরা দ্রুত টাকা জমা দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, বাড়তি অর্থের বিনিময়ে লাইনে না দাঁড়িয়েই টাকা জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ব্যাংকের বুথে ধীরগতিতে কাজ করার অভিযোগও করেছেন সেবাপ্রত্যাশীরা। এসব অভিযোগ সত্য হলে সেবা দানকারী সংশ্লিষ্ট সংস্থার সব পক্ষের জবাবদিহি আদায় করতে হবে। কারণ একটি সেবাব্যবস্থায় কোথাও অব্যবস্থাপনা দেখা দিলে তার সুযোগ নেয় মধ্যস্বত্বভোগীরা। অব্যবস্থাপনার কারণে অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘সেবা খাতে দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ প্রতিবেদন বিআরটিএর দুর্নীতির কথা উঠে এসেছে। টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিআরটিএর সেবা নিতে গিয়ে ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ খানা ঘুষের শিকার হয়েছে। এই পরিসংখ্যান বিআরটিএর সেবাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার সংকটের বিষয়টিও স্পষ্ট করে।
বিআরটিএতে সেবাপ্রত্যাশীদের কেন কোন পরিস্থিতিতে দালালের ওপর নির্ভর করতে হয় সেটি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সেখানকার সেবাপ্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নিতে হবে। কোন সেবার জন্য কী কাগজ লাগবে, সরকারি ফি কত টাকা, কতদিনে কাজ সম্পন্ন হবে, কোন কাজের জন্য কোন কর্মকর্তার কাছে যেতে হবে— সেসব তথ্য সেবাস্থলে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান রাখতে হবে। সম্ভব হলে সব সেবা অনলাইনে সম্পন্ন করতে হবে। তা হলে সেবাপ্রত্যাশীকে অকারণে এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ছুটতে হবে না। বিআরটিএর ফি জমা দেওয়ার ব্যবস্থাও ডিজিটাল করা দরকার। সেবা নিয়ে কারও কোনো অভিযোগ থাকলে সেটা আমলে নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিআরটিএ কার্যালয়ের ভেতরে দালালের প্রবেশ ও অবাধ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করা জরুরি। দালালের হাতে সরকারি সিল কীভাবে গেল, তিনি কর্মকর্তাদের কক্ষে ঢুকে কীভাবে সরকারি কাজ করলেন— সেটা জানা দরকার। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কেন দালালকে অন্যায় কাজে বাধা দিলেন না তারও সুষ্ঠু তদন্ত হতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে কয়েক দিনের অভিযান চালিয়ে বা দুয়েকজন দালাল গ্রেফতার করে সমস্যার টেকসই সমাধান হবে না। দালালদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিআরটিএকে এমন একটি সেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সেবাপ্রত্যাশীরা নিয়ম মেনেই দ্রুত সেবা পাবেন, তাদের দালালের কাছে যেতে হবে না।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা