শিক্ষকদের নিজেদের অবস্থান নিয়েও আত্মজিজ্ঞাসার প্রয়োজন আছে। আমরা রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে নানা দাবি করি। কিন্তু নিজেদের দায়িত্ব কতটা পালন করছি, সেটিও আলোচনায় আসা দরকার। একজন শিক্ষক যখন পরিচয় দিতে গিয়ে নিজের নাম, পদবি ও প্রতিষ্ঠান বলতে সংকোচবোধ করেন, তখন বিষয়টি ভাবার মতো। প্রশাসনের কর্মকর্তারা সাধারণত নাম ও পদবি পরিচয়সহ কোথা থেকে কথা বলছেন, তা স্পষ্টভাবে জানান। শিক্ষকদের মধ্যেও পেশাগত আত্মবিশ্বাস ও পরিচয়ের সংস্কৃতি গড়ে ওঠা দরকার।
আইএলও ও ইউনেস্কো ১৯৬৬ সালে শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য যে সুপারিশ করেছিল তার ৬০ বছর পূর্ণ হচ্ছে এ বছর। বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন শুরু হয় ১৯৯৪ সালে। বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে ২০০৩ সাল থেকে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য— ‘শিক্ষকদের সঙ্গে থাকা : এই পেশার সুরক্ষা, সম্মান এগিয়ে নেওয়া এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গঠনের ৬০তম বছর।’ প্রতিপাদ্যটি ভবিষ্যৎ নির্মাণে বিশ্বজুড়ে উপযুক্ত শিক্ষকের তীব্র সংকটের বিষয়টি সামনে এনেছে।
বিশ্বের শতাধিক দেশে ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়। তবে একেক দেশ ও সমাজে শিক্ষকতার অবস্থা ও সমস্যা একেক রকম। তাই নিজ নিজ দেশের বাস্তবতা সামনে রেখেই দিবসটির তাৎপর্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। আমাদের দেশে অনেক শিক্ষক মনে করেন, এটি তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দাবি জানানোর দিন।
আবার কেউ মনে করেন, এদিন রাষ্ট্র শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদা বাড়ানোর ঘোষণা দেবে। অন্যদিকে সমাজের একটি অংশ এদিন শিক্ষকদের ভুল ধরার এবং তাদের কী করা উচিত সে বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখে। ইদানীং বিভিন্ন পেশার মানুষও এমনভাবে শিক্ষকদের নীতিকথা শোনান, যেন শিক্ষকরা সমাজের অন্য সবার চেয়ে আলাদা কোনো শ্রেণির মানুষ। তাদের কোনো ব্যক্তিগত চাহিদা, অধিকার বা সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে না। অথচ শিক্ষকও এই সমাজেরই মানুষ।
শিক্ষা প্রশাসনে শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। একসময় একজন শিক্ষা সচিব বলেছিলেন, শিক্ষকরা কেন অধ্যক্ষ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক কিংবা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হবেন? তারা শিক্ষক, তাদের কাজ শুধু পড়ানো ও শিক্ষার্থী তৈরি করা। শিক্ষা প্রশাসনের কাজ প্রশাসনের লোকজন করবেন। এ ধরনের ধারণা শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো থেকে শিক্ষকদের দূরে সরিয়ে রাখার প্রবণতাকে প্রকাশ করে।
শিক্ষা প্রশাসনের পদগুলোতে শিক্ষকদের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। তবে সেখানে বসে শিক্ষকসুলভ আচরণ, দক্ষতা ও শিক্ষার প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পদ দাবি করলেই হবে না; পদে গিয়ে শিক্ষকতার মর্যাদা ও দায়িত্বও রক্ষা করতে হবে।
শিক্ষকদের নিজেদের অবস্থান নিয়েও আত্মজিজ্ঞাসার প্রয়োজন আছে। আমরা রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে নানা দাবি করি। কিন্তু নিজেদের দায়িত্ব কতটা পালন করছি, সেটিও আলোচনায় আসা দরকার। একজন শিক্ষক যখন পরিচয় দিতে গিয়ে নিজের নাম, পদবি ও প্রতিষ্ঠান বলতে সংকোচ বোধ করেন, তখন বিষয়টি ভাবার মতো। প্রশাসনের কর্মকর্তারা সাধারণত নাম ও পদবি পরিচয়সহ কোথা থেকে কথা বলছেন, তা স্পষ্টভাবে জানান। শিক্ষকদের মধ্যেও পেশাগত আত্মবিশ্বাস ও পরিচয়ের সংস্কৃতি গড়ে ওঠা দরকার।
একইভাবে কোনো শিক্ষক দুর্নীতি বা গুরুতর অপরাধে জড়ালে তারও প্রচলিত আইনে বিচার হতে হবে। একজন প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আর্থিক অনিয়মে জড়ালে তার প্রভাব শুধু ব্যক্তির ওপর পড়ে না, পুরো শিক্ষক সমাজের ভাবমূর্তিতে পড়ে।
বর্তমান সময়ে শিক্ষকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের কারণে কোনো শিক্ষককে প্রতিষ্ঠানে যেতে না দেওয়া, চেয়ার থেকে সরিয়ে দেওয়া বা হেনস্থা করা গ্রহণযোগ্য নয়। আবার কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার বিচার হবে নিয়ম অনুযায়ী। উচ্ছৃঙ্খলতা বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শিক্ষকদের অপমান করার অধিকার কারও নেই। এটি বন্ধ করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।
একই সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারও আমাদের শিক্ষা ও সামাজিকব্যবস্থার দুর্বলতার একটি দিক সামনে আনে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র— সবার দায়িত্ব ছিল এসব কিশোরকে সময়মতো শৃঙ্খলা ও সঠিক পথে আনা। বিদ্যালয়ে যখন শিক্ষার্থীদের আচরণ সংশোধনের সুযোগ থাকে, তখন শিক্ষক ও অভিভাবকদের সেই দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সমস্যা বড় হয়ে যাওয়ার পর শুধু পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
যিনি যে পেশাতেই থাকুন, জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিয়েছেন। তাই শিক্ষককে সমাজের অভিভাবক বলা হয়। শিক্ষকরা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করেন।
এ জন্য শিক্ষকতার পেশায় মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে পেশাগত স্বাধীনতা, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও উপযুক্ত বেতন কাঠামো নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একজন মেধাবী তরুণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে যদি যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে পরিচালক, মহাপরিচালক, সচিব কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার সুযোগ পান, তা হলে তার সামনে অগ্রগতির পথ খোলা থাকবে। এতে শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের ধরে রাখা সহজ হবে।
একেক দেশে শিক্ষকতার সংকট একেক ধরনের। আফ্রিকার সমস্যা আর উন্নত দেশের সমস্যা এক নয়। ব্রুনেই দারুস সালাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ কে এম আহসান উল্লাহ বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে পূর্ণকালীন স্থায়ী বা স্থায়ী হওয়ার পথে থাকা শিক্ষকের অনুপাত ১৯৮৭ সালের ৫৩ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ৩১ দশমিক ৮ শতাংশে নেমেছে। আর্থিক চাপ, শিক্ষার্থী ভর্তি ও গবেষণা অর্থায়নের অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘমেয়াদি নিয়োগে সতর্ক হচ্ছে। ফলে তরুণ শিক্ষকদের স্থায়ী পদে যাওয়ার পথও সংকুচিত হচ্ছে। এটি উন্নত দেশের শিক্ষকতার সমস্যার একটি দিক। তাই আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবসের আলোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথ বের করতে হবে।
এ বছর প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ, মাদরাসা, কারিগরি ও বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী বিভিন্ন পর্যায় থেকে ১০০ জন শিক্ষককে জাতীয় পর্যায়ে গুণী শিক্ষক সম্মাননা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নির্বাচিত প্রত্যেকে এক লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননা সনদ পাবেন।
এটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে প্রকৃত শিক্ষকদের চিহ্নিত করতে শুধু ফরম পূরণ ও কাগজপত্র যাচাই যথেষ্ট নয়। একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে কী পড়াচ্ছেন, কীভাবে পড়াচ্ছেন, শিক্ষার্থীরা কতটা শিখছে এবং তিনি কতটা নতুনত্ব আনছেন— এসবও মূল্যায়নের অংশ হওয়া প্রয়োজন। একজন ভালো শিক্ষককে উৎসাহ দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই নিয়মিত ইতিবাচক ও সংশোধনমূলক মতামতের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
শিক্ষকদের গবেষণা ও সমাজে অবদানও নিয়মিতভাবে মূল্যায়িত হওয়া দরকার। পাঠ্যবই বা গবেষণাপত্র রচনা, শিক্ষা ক্ষেত্রে নতুন ধারণা, সমাজ সংস্কারে অবদান কিংবা বৈজ্ঞানিক গবেষণার স্বীকৃতি কোনো একটি দিবসের জন্য অপেক্ষা করে থাকা উচিত নয়। আমাদের কৃষিবিজ্ঞানীরা নতুন জাতের শস্য, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল উদ্ভাবন করছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও শিক্ষক ও গবেষকরা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন। এসব অবদান জাতীয়ভাবে চিহ্নিত ও স্বীকৃত হওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস তাই শুধু শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া কিংবা তাদের ভুলত্রুটি নিয়ে আলোচনা করার দিন নয়। এটি শিক্ষকতার মর্যাদা, অধিকার, দায়িত্ব, পেশাগত স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে ভাবার দিন। শিক্ষককে সম্মান করতে হলে শুধু বক্তৃৃতা নয়, বাস্তব ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদেরও নিজেদের দায়িত্ব, পেশাগত আচরণ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গাগুলো শক্ত করতে হবে। রাষ্ট্র, সমাজ, অভিভাবক ও শিক্ষক— সবার সম্মিলিত দায়িত্বেই একটি মর্যাদাপূর্ণ ও কার্যকর শিক্ষকতা পেশা গড়ে উঠতে পারে।
লেখক : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে