পিংক বাস : শুধু গোলাপি রং নয়, চাই নতুন গণপরিবহনের স্বপ্ন

সাইফুল ইসলাম

মতামত

ঢাকার গণপরিবহন নিয়ে নতুন করে কোনো স্বপ্ন দেখানো কঠিন। প্রতিদিনের যানজট, দুর্ঘটনা, বাসের অনিয়ম, যাত্রী হয়রানি, অতিরিক্ত ভাড়া, চালকের বেপরোয়া

2026-08-20T23:21:33+00:00
2026-08-20T23:21:33+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬,
৫ ভাদ্র ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
মতামত
পিংক বাস : শুধু গোলাপি রং নয়, চাই নতুন গণপরিবহনের স্বপ্ন
সাইফুল ইসলাম
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ১১:২১ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ঢাকার গণপরিবহন নিয়ে নতুন করে কোনো স্বপ্ন দেখানো কঠিন। প্রতিদিনের যানজট, দুর্ঘটনা, বাসের অনিয়ম, যাত্রী হয়রানি, অতিরিক্ত ভাড়া, চালকের বেপরোয়া আচরণ, পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন—সব মিলিয়ে নগরবাসীর কাছে গণপরিবহন অনেকটা নিত্যদিনের দুর্ভোগের নাম। এর মধ্যেই নারীদের জন্য ‘পিংক বাস’ চালুর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী ভাবনা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই উদ্যোগ কি সত্যিই ঢাকার নারী যাত্রীদের জন্য একটি নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা তৈরি করবে, নাকি পুরনো বাসে নতুন রং লাগিয়ে আরেকটি সাময়িক প্রকল্পের জন্ম দেবে?

এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি বাসের গায়ে গোলাপি রং করলেই সেটি নারীবান্ধব গণপরিবহন হয়ে যায় না। নারীবান্ধব পরিবহনের জন্য প্রয়োজন নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা, নির্দিষ্ট সময়সূচি, নির্দিষ্ট স্টপেজ, প্রশিক্ষিত কর্মী, পরিচ্ছন্নতা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং সর্বোপরি যাত্রীর প্রতি মর্যাদাপূর্ণ আচরণ।

পিংক বাসের ধারণার সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো—নারীদের জন্য গণপরিবহনে একটি আলাদা, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরির চেষ্টা। ঢাকার বিপুলসংখ্যক নারী প্রতিদিন কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পারিবারিক প্রয়োজনে গণপরিবহনের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা, ভিড়ের মধ্যে হয়রানি, আসনসংকট এবং অনিশ্চিত যাত্রাসূচি দীর্ঘদিনের সমস্যা। ফলে নারীদের জন্য পরিকল্পিত পরিবহন ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রয়োজন পূরণের পদ্ধতি নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

পুরনো বাসে শুধু নতুন রং লাগিয়ে যদি পিংক বাস চালানো হয়, তাহলে সেটি কতটা টেকসই হবে? ঢাকার গণপরিবহনের অন্যতম বড় সমস্যা হলো পুরনো যানবাহন। বছরের পর বছর ব্যবহৃত, অপরিচ্ছন্ন, যান্ত্রিকভাবে দুর্বল বাসকে রং করে নতুনের মতো দেখানো যায়; কিন্তু রং দিয়ে ইঞ্জিনের বয়স কমানো যায় না, ব্রেকের দুর্বলতা দূর করা যায় না, যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। বাহ্যিক সৌন্দর্য কোনোভাবেই আধুনিক গণপরিবহনের বিকল্প নয়।

এই জায়গাতেই পিংক বাস প্রকল্পের দর্শনে আরও বড় পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল। পুরনো বাসের রং পরিবর্তনের পরিবর্তে নতুন, আধুনিক ও নিরাপদ বাস কেনা উচিত ছিল। সম্ভব হলে শুরু থেকেই বৈদ্যুতিক বাসকে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার ছিল। কারণ ঢাকার বায়ুদূষণ, জ্বালানি ব্যয় এবং পরিবেশগত সংকটের কথা বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতের গণপরিবহনকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ধীরে ধীরে বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবস্থায় নিয়ে যেতে হবে। সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও ঢাকার পুরনো বাস ধীরে ধীরে ইলেকট্রিক বাস দিয়ে প্রতিস্থাপনের উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। ফলে পিংক বাসকে সেই বৃহত্তর পরিবহন রূপান্তরের পরীক্ষামূলক মডেল করা যেত।

কথা হলো একটি আদর্শ পিংক বাস কেমন হবে?

প্রথমত, বাসটি হতে হবে সম্পূর্ণ নতুন ও নিরাপদ। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হলে ভালো, তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, পরিচ্ছন্নতা, আরামদায়ক আসন এবং সহজে ওঠানামার ব্যবস্থা। প্রবীণ, শিশু ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের কথাও বিবেচনায় রাখতে হবে। বাসে থাকতে হবে সিসিটিভি ক্যামেরা, জরুরি অ্যালার্ম, জিপিএস এবং ডিজিটাল ডিসপ্লে। যাত্রী যেন মোবাইল ফোনে দেখতে পারেন—বাসটি এখন কোথায়, পরবর্তী বাস কখন আসবে এবং কোন কোন স্টপেজে থামবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্দিষ্ট রুট ও নির্দিষ্ট সময়সূচি। ঢাকার গণপরিবহনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতার একটি হচ্ছে অনিশ্চয়তা। যাত্রী জানেন না বাস কখন আসবে, কখন পৌঁছাবে কিংবা আদৌ বাসটি নির্ধারিত রুটে যাবে কি না। পিংক বাস এই সংস্কৃতি বদলাতে পারে। একটি অ্যাপের মাধ্যমে বাসের লাইভ অবস্থান, সময়সূচি ও আসনসংক্রান্ত তথ্য দেওয়া গেলে নারী যাত্রীদের আস্থা অনেক বেড়ে যাবে।

ই-টিকিটিং ব্যবস্থাও চালু করা উচিত। এতে ভাড়া নিয়ে চালক-হেলপারের সঙ্গে যাত্রীর বিরোধ কমবে, নগদ লেনদেনের ঝুঁকি কমবে এবং সরকারের পক্ষেও আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব রাখা সম্ভব হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনবল। নারী বাসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত দক্ষ ও প্রশিক্ষিত নারী কর্মী। নারী চালক, নারী সহকারী এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নারী নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করা যেতে পারে। তবে শুধু নারী কর্মী নিয়োগ করলেই হবে না; তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, সম্মানজনক বেতন, কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত উন্নতির সুযোগ দিতে হবে।

এখন আসে অর্থের প্রশ্ন। পিংক বাসের জন্য পৃথকভাবে কত টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে—এ বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ্যে স্পষ্ট নয়। তবে পরিকল্পনাগতভাবে হিসাব করলে বোঝা যায়, একটি আধুনিক পিংক বাস প্রকল্পে কতটা বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে।

ধরা যাক, প্রথম পর্যায়ে ১০০টি নতুন বাস কেনা হলো। বাসের ধরন ও প্রযুক্তি অনুযায়ী প্রতি বাসের আনুমানিক মূল্য যদি ১ থেকে ২ কোটি টাকা ধরা হয়, তাহলে শুধু বাস কেনার ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১০০ থেকে ২০০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে ডিপো, ওয়ার্কশপ, চার্জিং স্টেশন, জিপিএস, সিসিটিভি, ই-টিকিটিং, প্রশিক্ষণ এবং প্রাথমিক রক্ষণাবেক্ষণ যোগ করলে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রকল্পে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। ২০০টি বাস দিয়ে শুরু করলে এই বিনিয়োগ ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

এটি কোনো সরকারি ঘোষিত বাজেট নয়; বরং একটি সম্ভাব্য প্রাক্কলিত হিসাব। প্রকৃত ব্যয় নির্ভর করবে বাসের প্রযুক্তি, স্থানীয়ভাবে উৎপাদন না আমদানি, ব্যাটারি ও চার্জিং অবকাঠামো এবং অন্যান্য প্রকল্প ব্যয়ের ওপর।

এবার প্রশ্ন হলো—এই অর্থ কি ব্যয় করা উচিত? আমার উত্তর—হ্যাঁ, যদি এটি কেবল বাস কেনার প্রকল্প না হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গণপরিবহন সংস্কার প্রকল্প হয়।

কারণ নারী যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের বিনিয়োগ কোনো বিলাসিতা নয়। বরং এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিনিয়োগ। একজন নারী নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্যভাবে কর্মস্থলে যেতে পারলে তার কর্মজীবন স্থিতিশীল হয়। একজন ছাত্রী নিরাপদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারলে তার শিক্ষার সুযোগ বাড়ে। একজন নারী উদ্যোক্তা শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারলে তার অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ে। অর্থাৎ ভালো গণপরিবহন শুধু যাতায়াতের সুবিধা নয়; এটি নারীর ক্ষমতায়নের অবকাঠামো।

তবে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা সতর্ক করে দেয়। ঢাকায় এর আগেও পুরনো বাসকে গোলাপি রং করে নারী যাত্রীদের জন্য পরিবহনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই উদ্যোগের শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা ও ব্যবস্থাপনায় ভাটা পড়ে। বাসের রং মলিন হয়েছে, ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়েছে, আর যাত্রীরা ফিরে গেছেন সেই পুরনো অনিশ্চিত পরিবহন ব্যবস্থায়। ফলে এবার যদি একই মডেল অনুসরণ করা হয়, তাহলে নতুন পিংক বাসও একসময় পুরনো সমস্যার নতুন সংস্করণে পরিণত হতে পারে।

এই ঝুঁকি এড়াতে পিংক বাসকে ঢাকার সামগ্রিক বাস রুট সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একটি নির্দিষ্ট রুটে নির্দিষ্ট সংখ্যক বাস, নির্দিষ্ট সময়সূচি, নির্দিষ্ট স্টপেজ এবং নির্ধারিত ভাড়া—সবকিছু একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অধীনে আনতে হবে। বাস মালিকানা, পরিচালনা ও রুট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে হবে। যাত্রীসেবা ও নিরাপত্তার জন্য পরিমাপযোগ্য কর্মদক্ষতা সূচক বা KPI নির্ধারণ করা যেতে পারে। মাসে মাসে প্রকাশ করা যেতে পারে—কতটি ট্রিপ সময়মতো হয়েছে, কতটি অভিযোগ এসেছে, কতটি দুর্ঘটনা ঘটেছে, কত যাত্রী সেবা নিয়েছেন এবং আয়-ব্যয়ের অবস্থা কী।

পিংক বাসের ভবিষ্যৎ তাই নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর—বাসের মান, ব্যবস্থাপনার মান এবং রাজনৈতিক-প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা।

শুধু উদ্বোধন করে ছবি তোলা, বাসের গায়ে গোলাপি রং করা এবং কয়েকদিন প্রচার চালালে কোনো প্রকল্প সফল হয় না। সফলতা আসে নিয়মিত সেবা, জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থেকে।

আমরা চাই না পিংক বাস কয়েক বছর পর ঢাকার রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটি বিবর্ণ সরকারি প্রকল্পের প্রতীকে পরিণত হোক। আমরা চাই, পিংক বাস হয়ে উঠুক ঢাকার গণপরিবহন সংস্কারের একটি সফল উদাহরণ।

আজ ১০০টি বাস দিয়ে শুরু হলে কাল তা ৩০০ বা ৫০০ বাসে বিস্তৃত হতে পারে। সফল হলে একই মডেলে কর্মজীবী নারী, শিক্ষার্থী, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য বিশেষায়িত পরিবহন ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে পুরো ঢাকার বাস ব্যবস্থাকেই আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও বৈদ্যুতিক পরিবহনে রূপান্তরের একটি পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

তাই প্রশ্নটি শুধু—পিংক বাস কেমন? এখানে থামলে চলবে না। প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা কেমন ঢাকা চাই?

যদি উত্তর হয়—নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, সময়নিষ্ঠ, পরিবেশবান্ধব ও মানবিক ঢাকা, তাহলে পিংক বাসও সেই স্বপ্নেরই অংশ হতে হবে।

পিংক বাসের সাফল্য গোলাপি রঙে নয়; সাফল্য হবে সেই দিন, যেদিন ঢাকার একজন নারী নিশ্চিন্তে বাসস্টপে দাঁড়িয়ে বলতে পারবেন—‘বাস কখন আসবে জানি, কোথায় যাব জানি, কত ভাড়া দেব জানি, আর সবচেয়ে বড় কথা—আমি নিরাপদ।’

সেই দিনই পিংক বাস সত্যিকার অর্থে সফল হবে।

সময়ের আলো/কেআই


  বিষয়:   পিংক বাস  গোলাপি রং  গণপরিবহন  সময়ের আলো  মতামত 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: