ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশ জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে লেপ্টে থাকা এক উজ্জ্বল নাম শওকত আলী। পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সমস্ত আন্দোলনের অন্যতম সূতিকাগার ছিল এই ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের ১৫০ মোগলটুলির বাড়িটি। শেখ মুজিবুর রহমান তখনও খুব একটা আলোচনায় আসেননি, সেই সময় থেকেই তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন শওকত আলী। তবে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, দেশ ও জাতির জন্য শওকত আলীর অপরিসীম আত্মত্যাগের কথা তরুণ প্রজন্ম খুব একটা জানে না। ১৮ আগস্ট এই কিংবদন্তি রাজনীতিকে প্রয়াণ দিবস।
১৯১৮ সালের ২০ এপ্রিল পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শওকত আলী। ঢাকা গভ. মুসলিম হাইস্কুলে পড়াকালীন রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। এক সময় গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্য লাভ করেন।
তরুণ বয়সে শওকত আলী চলে আসেন পুরান ঢাকার ১৫০ চক মোগলটুলীতে এবং সেখানে বসবাস শুরু করেন। বাড়িটি ছিল ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মী বাহিনীর মিলনক্ষেত্র। রাজনীতি চর্চার সূতিকাগার, প্রগতিশীল মুসলিম লীগ ও মুসলিম ছাত্রলীগ কর্মীদের পার্টি হাউস, পাকিস্তান আন্দোলনের ঘাঁটি। পরে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই ভবনের ভূমিকা ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
দেশভাগের পর শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতা থেকে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় এসে প্রথমেই উঠেছিলেন বন্ধু শওকত আলীর ১৫০ চক মোগলটুলীর বাড়িতে এবং বছর কয়েক সেই বাড়িতেই তিনি অবস্থান করেন।
প্রথম যেদিন শেখ মুজিবুর রহমান এই বাড়িতে আসেন, সেদিনের ঘটনা তার বয়ানেই শোনা যাক—‘১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে প্রথমে উঠব ঠিক করলাম। শওকত মিয়া মোগলটুলী অফিসের দেখাশোনা করে। মুসলিম লীগের পুরানা কর্মী। আমার বন্ধুও। শামসুল হক সাহেব ওখানেই থাকেন। শামসুল হক সাহেব ও শওকত সাহেব আমাকে পেয়ে খুবই খুশি। শওকত আমাকে নিয়ে কী যে করবে ভেবে পায় না। তার একটা আলাদা রুম ছিল। আমাকে তার রুমেই জায়গা দিল। আমি তাকে শওকত ভাই বলতাম। সে আমাকে মুজিব ভাই বলত।’ (অসামাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-৮৩)।
তৎকালে লীগ অফিস নামে অধিক পরিচিত ছিল বাড়িটি। শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, শামসুল হক, অলি আহাদ, কমরুদ্দিন আহমেদ, মো. তোয়াহা, খালেক নেওয়াজ খাঁন, এম এ ওয়াদুদ প্রমুখ নেতারা শওকত আলীর এই বাড়িতে বসবাস করতেন। ভাষা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক কার্যক্রম এখান থেকেই পরিচালিত হতো।
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলিস্থ রোজ গার্ডেন প্যালেসে নতুন দল গঠনে কর্মী সম্মেলনের আহবান করা হয়। এই সম্মেলনকে সামনে রেখে ১৫০ চক মোগলটুলিতে প্রস্তুতিমূলক কর্মতৎপরতা শুরু হয়। ২৩ জুনের সম্মেলনের আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন শওকত আলী।
‘কর্মী সম্মেলনের জন্য খুব তোড়জোড় চলছিল। আমরা জেলে বসে সেই খবর পাই। ১৫০ মোগলটুলীতে অফিস হয়েছে। শওকত মিয়া সকলের খাওয়া ও থাকার বন্দোবস্ত করত। সে ছাড়া ঢাকা শহরে কেইবা করবে? (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-১২০)।
২৩ জুনের সম্মেলনের আগে মওলানা ভাসানীকে গ্রেপ্তার করা হবে, এরকম একটা খবর লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে। নতুন দল গঠন হচ্ছে আর এ সময় যদি ভাসানীকে গ্রেপ্তার করা হয় তাহলে বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে। তখন রাতের অন্ধকারে কম্বল পেঁচিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে করে সম্মেলন শুরুর দুদিন আগে ভাসানীকে রোজ গার্ডেনে নিয়ে যাওয়ার মূল নায়ক ছিলেন এই শওকত আলী।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত নানা বৈরিতার ভেতর দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করতে সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করেছেন শওকত আলী। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রথম হরতাল হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ। এই হরতাল সফল করতে শওকত আলীর অবদান অনস্বীকার্য।
পিকেটিংয়ের একপর্যায়ে পুলিশের আইজিকে সচিবালয়ে ঢুকতে বাধা দেওয়ায় পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন মারাত্মকভাবে। আটক হয়ে জেলেও ছিলেন। ১৯৫২ সালের সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সদস্য ছিলেন। একই সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে যে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল, শওকত আলী সে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
ভাষা আন্দোলন করার সময় সবচেয়ে বেশি পুলিশি নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন শওকত আলী। ১৯৪৮ সালে রাজপথে আন্দোলনরত অবস্থায় পুলিশের বেধড়ক লাঠিচার্জে তিনি গুরুতর আহত হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। বন্ধু শওকতকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে তৎক্ষণাৎ শেখ মুজিবুর রহমান তাকে রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে মিছিল, জনসভা, ছাত্রসভা, পিকেটিংসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে শওকত আলী সক্রিয়ভাবে যোগ দিয়েছেন এবং বিভিন্ন জনসভায় বক্তব্য রেখেছেন। ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদানের অপরাধে শওকত আলী ২ মার্চ ১৯৫২ তারিখে গ্রেপ্তার হন এবং বহুদিন জেলে আটক ছিলেন।
লোভ লালসার ঊর্ধ্বে থেকে পরোপকারী এই মানুষটি আজীবন সাধারণ মানুষের পাশে থেকে রাজনীতি করে গেছেন। বড় পদ বা ক্ষমতার জন্য তিনি রাজনীতি করেননি। শওকত আলী জাতির একজন গর্বিত সন্তান।
৪০-এর দশকের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় শওকত আলী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। চরম দুঃসময়ে তিনি সার্বক্ষণিক দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের পাশে ছিলেন এবং সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। সেই সময় সবার মুখে মুখে তিনি ‘দুর্ভিক্ষ শওকত’ নামেই বেশি পরিচিতি পান। বয়োজ্যেষ্ঠ পুরান ঢাকাবাসী এখনো তাকে ‘দুর্ভিক্ষ শওকত’ নামেই চেনে। ১৯৭৫ সালের ১৮ আগস্ট শওকত আলী ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
ভাষা আন্দোলনে শওকত আলীর কৃতিত্বপূর্ণ ও গৌরবময় অবদানের জন্য ২০১১ সালে তাকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। ঢাকা সিটি করপোরেশন ২০১০ সালে জাতির এই গর্বিত সন্তানের নামে ধানমন্ডিস্থ ৪/এ সড়কটির নামকরণ করে।
লেখক : শওকত আলীর সন্তান
সময়ের আলো/কেআই