দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট নিয়ে প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হচ্ছে। সামাজিকমাধ্যমে চলছে নানা অলোচনা-সমালোচনা। দেশে বর্তমানে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, বিপরীতে সরবরাহ নেমেছে প্রায় ২,১০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। এ ছাড়া বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ঘাটতি বা লোডশেডিং ৩,০০০ মেগাওয়াটের বেশি ছাড়িয়েছে। ফলে তীব্র গরমে অব্যাহত লোডশেডিংয়ে সাধারণের জীবনের ওপর প্রভাব যেমন অনেক, তেমনি দেশের শিল্প-কারখানাও তাদের স্বাভাবিক উৎপাদন সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী অনেক কারখানা তাদের উৎপাদন ও কর্মঘণ্টা কমাচ্ছে বা বন্ধ করার উপক্রম হচ্ছে। এর ফলে দেশীয় বাজারে যেমন পণ্য সরবরাহ কমবে, তেমনি রফতানিতেও ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হবে। পেট্রোল পাম্পগুলোতে দেখা যায় শত শত গাড়ির দীর্ঘ সারি, কয়েক ঘণ্টা লাগে তেল বা গ্যাস পেতে। এর প্রভাব পড়ছে জনপরিবহন ও পণ্য পরিবহনের ওপর। এ সুযোগে ভাড়া বাড়ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা।
আমাদের দেশে জ্বালানি সংকট নতুন নয় কিন্তু এর প্রভাব পড়ছে নতুন একটি সরকারের ওপর। সরকারের পক্ষ থেকেও খুশি হওয়ার মতো কোনো সংবাদ নেই, ফলে সাধারণ মানুষের হতাশা তীব্রতর হচ্ছে।
বরং সরকার নতুন করে শপিংমল ও দোকান রাত ৮টায় বন্ধ রাখার নির্দেশ জারি করেছে। কিন্তু বিগত সময়েও এ রকম নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল কিন্তু তা কতটা সফল হয়েছে তা ভেবে দেখা দরকার। অতীতে দেখা গেছে, প্রথম দিকে পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার যতটা ভূমিকা থাকে, সময়ের সঙ্গে সেটা কমে যায়।
আবার সাধারণ মানুষের মধ্যেও নির্দেশনা না মানার প্রবণতাও লক্ষ করা যায়। ফলে তাতে যে খুব বেশি ফল পাওয়া যায় তা বলা যায় না। অতীতে সরকারি দফতরে এসি ব্যবহার বিষয়ে নানা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বরং নির্দেশনা ও আইন ভঙ্গ করার প্রতিই সাধারণ মানুষ ও সরকারি অফিসে যেন অলিখিত আইন। সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে জ্বালানির ব্যবহার কমানো যাতে বর্তমান পরিস্থিতিতে একটা ভারসাম্য তৈরি করা যায়। অনেক দেশ এটা করছে কিন্তু আমরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অপচয় করছি।
সরকারের কৌশল সহজ, জ্বলানির ব্যবহার সীমিত করে সংকট মোকাবিলা করা। কিন্তু এর বিপরীতে আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অপচয় নিয়ে আমরা খুব কম ভাবি। বরং যদি কোনো গবেষণা করা যায় তা হলে হয়তো দেখা যাবে, উল্লেখযোগ্য অংশ অনাবশ্যকভাবে অপচয় করা হয়। উৎপাদনশীল কাজে জ্বালানির ব্যবহার হলে অন্তত বলা যায় যে আমরা কিছু পাব। কিন্তু অপচয় হয়ে গেলে তা কেবল নষ্ট করা নয় বরং একই সঙ্গে বিদ্যমান পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করা হয়। আবার এমন অনেক কাজে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার হচ্ছে যা না করলেও উৎপাদন বা বাজারজাতকরণের জন্য ব্যাপক কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনাও কম বলা যায়।
যেমনÑ দেশে হাজার হাজার বিলবোর্ড ও আলোকসজ্জা প্রতিদিন প্রচুর বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে যা সংকটকালীন ক্ষেত্রে বিলাসিতার মতো। যদিও সরকারি নির্দেশনায় এগুলো পরিহার করার কথা বলা হয়েছে কিন্তু সাফল্য নির্ভর করছে প্রয়োগের ওপর। নিকট অতীতেও এর ব্যত্যয় দেখা গেছে। তাই অতি আবশ্যক নয়, এমন সব ধরনের বিলবোর্ডের ব্যবহার সংকটের সময়ে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এমনকি সামাজিক, সরকারি ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও আলোকসজ্জার ব্যবহার সীমিত রাখা প্রয়োজন।
বরং জ্বালানি সাশ্রয় করার সঙ্গে এর অপচয়ের দিকগুলোও বিবেচনায় নিয়ে সামাজিক সচেতনতা তৈরিতেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। আমরা দৈনন্দিন জীবনে অনেকভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অপচয় করি যা চাইলে রোধ করা যায়। দেখা যায় বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে দোকান, সরকারি অফিসে রাতে নিরাপত্তার জন্য বাতি জ্বালিয়ে রাখা হয় যা দিনের আলো ফোটার পরও জ্বলতে থাকে।
এমনও দেখা যায়, অনেক অফিসে সাপ্তাহিক ছুটির কারণে বাতিগুলো একটানা জ্বলতেই থাকে। এভাবে প্রতিদিন কত কোটি বাতি সারা দেশে সকাল ৮-৯টা অবধি অহেতুক জ্বলতে থাকে তা কি ভাবছি? পোশাকের দোকানগুলোতে দেখা যায় প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল বাতি জ্বালানো থাকে, এটাও অপচয়। অনেক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বাতি ও পাখা সকাল থেকে অনবরত চলতে থাকে। এমনকি কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফটোকপি মেশিন ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র সকালে চালু হলে অফিস শেষ হওয়ার আগে আর বন্ধ হয় না। অথচ এ সময়ে এগুলোর ধারাবাহিক ব্যবহার হয় না। চাইলে বন্ধ বা সিøপ মোডে রাখা যায়। কেননা চালু রেখে ব্যবহার না করলেও বিদ্যুৎ খরচ হয়। এ অপচয়গুলো দৃশ্যমান নয় কিন্তু অত্যন্ত ক্ষতিকর। দুপুরের বিরতিতেও অফিসগুলোতে একই দৃশ্য বিরল নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেখা যায় ক্লাস না থাকলেও শ্রেণিকক্ষে বাতি, ফ্যান, প্রজেক্টর, এমনকি এসিও চলমান থাকে।
আবার যানজটে আটকা পড়া গাড়িগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা সচল থাকে। ফলে জ্বালানির অপচয়ের সঙ্গে পরিবেশেরও ক্ষতি হচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইঞ্জিন চালু থাকা অবস্থায় একটি গাড়ি প্রতি ঘণ্টায় ০.৮ লিটার তেল খরচ করে। শহরে এ খরচ ১৭৫ শতাংশ বেড়ে যায়। স্বাভাবিক যানজটে গাড়ি বন্ধ করা জরুরি না হলেও দীর্ঘ জটে বন্ধ না রাখলে জ্বালানির ব্যাপক অপচয় হয়। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, অসহনীয় যানজটের কারণে প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন মোড়ে যানজটের কারণে প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা। আর জ্বালানি পুড়ছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার।
আবার অনেকে স্বল্প দূরত্বে যেতেও পরিবহন ব্যবহার করেন। অথচ হেঁটে বা সাইকেল ব্যবহার করলে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের উন্নতি এবং জ্বালানি সাশ্রয় হতো। তাই সাইকেল ব্যবহারের বিষয়ে উৎসাহদানে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। বিশ্বের অনেক দেশে সাধারণ মানুষ নিয়মিত সাইকেল ব্যবহার করে।
অন্যদিকে অনেক প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেখা যায় প্রাইভেট গাড়ির দীর্ঘ সারি অথচ বিদ্যালয়ের নিজস্ব বাস বা পরিবহন থাকলে সময়, শ্রম, অর্থ, জ্বালানি ও পরিবেশদূষণ কমানো যেত। হয়তো ওইসব বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কোনো প্রভাব ফেলে না, কিন্তু সামগ্রিকভাবে সাধারণ মানুষের জীবনকে তীব্রভাবে প্রভাবিত করে সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।
এখন স্মার্টফোনের যুগ এবং ঘরে ঘরে এর ব্যবহার ও অপব্যবহার চলছে। আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই গণহারে ব্যবহার করছেন এবং সেগুলো অনেক বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। সামাজিকমাধ্যম থেকে শুরু করে গেম খেলা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যবহার করা হয়। আমাদের এ আচরণ পরিবর্তন আবশ্যক। এর ফলে কেবল বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে তা নয়, সময় ও মেধার চূড়ান্ত বিনাশ হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সংকট অতীতে ছিল এবং ভবিষ্যতেও আমাদের এটা মোকাবিলা করতে হবে। তাই কেবল জ্বালানি সাশ্রয়ে উদ্যোগ নিলে হবে না, একই সঙ্গে মানুষকে জ্বালানির অপচয় ও অপব্যবহার কমানোর জন্য সামাজিক শিক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে।
অপচয় কেবল অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর নয়, এটা পাপও। মহান রব বলেছেন, তোমরা খাও, পানাহার করো কিন্তু অপচয় করো না। তাই আমাদের নীতিনির্ধারকদের বর্তমান সময়ের সঙ্গে ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে অপচয় রোধে সামাজিক শিক্ষা ও সচেতনতা উন্নয়নে নীতিমালা ও নির্দেশনা এবং প্রচারের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করলে সামগ্রিকভাবে দেশের জন্য কল্যাণকর হবে।
অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ
শাবিপ্রবি, সিলেট
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রন্ট/টিকে