বর্তমানে বিশ্বের অনেক উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে জন্মহার হ্রাস এবং গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে শিশুদের তুলনায় প্রবীণ বা বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। জাতিসংঘের জনসংখ্যা প্রতিবেদন ও ইউএস সেন্সাস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালের পর থেকে বিশ্বে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা ৫ বছরের কম বয়সি শিশুর সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে।
জাতিসংঘ ১৯৯০ সালে প্রতি বছর ১ অক্টোবর বিশ্ব প্রবীণ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রবীণদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা এবং বার্ধক্যের সমস্যা ও এর প্রতিকার সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে ১৯৯১ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
বিশ্ব প্রবীণ দিবস প্রবীণদের অধিকার সুরক্ষা, তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং সমাজে তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। বর্তমানে বিশ্বে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা এক বিলিয়নের বেশি। ২০৫০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়নে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান আমাদের সমাজ ও জীবনের অমূল্য সম্পদ। দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে তারা পরিবার ও সমাজকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারেন। তারা আমাদের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও পারিবারিক ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেন। সংকটের সময়ে প্রবীণরা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে বিচক্ষণ পরামর্শ এবং নৈতিক শক্তি দিতে পারেন। বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরিতেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
প্রবীণদের প্রধান সমস্যা
বার্ধক্যজনিত নানা রোগ, যেমন— উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্মৃতিভ্রম ও হাড়ের ক্ষয়জনিত সমস্যায় প্রবীণরা ভোগেন। বিশেষায়িত ও সুলভ স্বাস্থ্যসেবার অভাব এ সংকট আরও বাড়িয়ে তোলে। একাকিত্ব ও মানসিক কষ্টও প্রবীণদের বড় সমস্যা। কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের ব্যস্ততার কারণে অনেক প্রবীণ একাকিত্ব ও অবহেলার শিকার হন।
আর্থিক অনিশ্চয়তা, নিয়মিত আয়ের উৎসের অভাব এবং সামাজিক সুরক্ষার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক প্রবীণ দারিদ্র্য ও পরনির্ভরশীলতার মুখে পড়েন। আমাদের দেশের অবকাঠামো, যাতায়াত ব্যবস্থা, হাসপাতাল ও অন্যান্য জনসেবামূলক স্থানও অনেক ক্ষেত্রে প্রবীণবান্ধব নয়। ফলে স্বাভাবিক চলাফেরা ও সেবা গ্রহণে তাদের নানা বাধার মুখে পড়তে হয়।
বিশ্ব প্রবীণ দিবসের গুরুত্ব
বার্ধক্যের সমস্যা ও এর প্রতিকার সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে বিশ্ব প্রবীণ দিবসের গুরুত্ব অনেক। এ দিবস প্রবীণদের মৌলিক অধিকার, আইনি সুরক্ষা ও উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা ও উদ্যোগকে উৎসাহিত করে। সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রে প্রবীণদের আজীবন অবদানের প্রতি সম্মান জানানো এবং তাদের জন্য উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা ও বয়স উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে নীতিনির্ধারকদের উদ্বুদ্ধ করাও এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশে প্রবীণ দিবসের গুরুত্ব
পারিবারিক মূল্যবোধ রক্ষায় প্রবীণদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী যৌথ পরিবারব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ায় সাম্প্রতিক অনেক প্রবীণ একাকিত্ব ও অবহেলার শিকার হচ্ছেন। বিশ্ব প্রবীণ দিবস তাদের প্রতি পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়।
প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বয়স্ক ভাতা, চিকিৎসা সহায়তা ও অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। তবে মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন রোধ এবং নিরাপদ চলাচলের পরিবেশ তৈরি করা শুধু সরকারের নয়, সমাজের সবার দায়িত্ব।
৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সি জনসংখ্যার অনুপাত ছিল ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ, যা এক বছর আগে ছিল ৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের নির্ভরতা অনুপাতও ২০২২ সালের ৮ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ৯ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এ সমস্যা মোকাবিলায় মানসম্মত শিক্ষা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। সময়ের সঙ্গে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসছে। তাই প্রবীণদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা বাড়াতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে সর্বজনীন পেনশন স্কিমও চালু করেছে সরকার।
বাংলাদেশে বয়স্ক জনগোষ্ঠী বৃদ্ধির ফলে অন্তত তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ সামনে আসছে। প্রথমত তরুণ জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে পাওয়া ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা। দ্বিতীয়ত জনসংখ্যার একটি বড় অংশের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতির স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি এবং জনস্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণ করা। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের হিসাবে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছাতে পারে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশ। এই পরিবর্তন অর্থনীতি ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশ প্রবীণ সমাজে পরিণত হবে এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে জাপানের মতো অতি প্রবীণ সমাজে পরিণত হবে। কোনো দেশের মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশ বা তার বেশি প্রবীণ হলে তাকে প্রবীণ সমাজ বলা হয়। গড় আয়ু বৃদ্ধির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সি জনগোষ্ঠীর অংশ আরও বাড়বে। তাই এই জনগোষ্ঠীকে যতটা সম্ভব কর্ম ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রাখার উপায় খুঁজে বের করতে হবে। তাদের স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ ব্যবস্থা নিয়েও এখন থেকেই পরিকল্পনা করতে হবে।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়লে সরকারের বাজেটের ওপরও চাপ বাড়বে। বিশেষ করে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি এর সঠিক ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে।
চলতি অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট বরাদ্দ ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। বর্তমানে প্রবীণদের মাসিক বয়স্ক-ভাতা ৭০০ টাকা এবং সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৬২ লাখ। বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অনুপাতও ক্রমেই বাড়ছে। আগামী বছরগুলোতে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণ জনগোষ্ঠীর অনুপাত কমবে এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অনুপাত বাড়বে। ফলে কর্মক্ষম মানুষের অনুপাতও ধীরে ধীরে কমে আসবে। এ কারণে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
আমাদের দেশে এমন অনেক প্রবীণ রয়েছেন, যাদের সন্তান বিদেশে চাকরি করেন কিংবা দেশের অন্য শহরে বসবাস করেন। ফলে বৃদ্ধ বাবা-মা অনেক সময় নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। গ্রামাঞ্চলেও নিঃসঙ্গ প্রবীণের সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৩ সালে সরকার প্রবীণদের জন্য জাতীয় নীতি প্রণয়ন করে। একই বছর পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন প্রণয়ন করা হয়, যেখানে সন্তানের ওপর পিতা-মাতার দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রবীণদের আবাসন ও অন্যান্য সুবিধা দিতে বেসরকারি খাত ও এনজিওগুলোরও বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে সরকারের তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন। বর্তমান সরকার নির্বাচনি ইশতেহারে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টিও এ উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া প্রয়োজন।
সরকারি পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ ভোগ করছে। তবে এ সুযোগ কমে গেলে নির্ভরশীলতার অনুপাত বাড়বে। পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ অনুযায়ী সক্ষম সন্তানদের পিতা-মাতার ভরণপোষণ ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে। এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে আইনে শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে।
প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশে নীতি ও আইন রয়েছে। এখন প্রয়োজন সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন। সরকারি হাসপাতালে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য বিশেষ চিকিৎসাসেবা ও অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ আরও কার্যকর করতে হবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেওয়া বিভিন্ন অনুদান ও সহায়তার পরিধিও বাড়ানো প্রয়োজন।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে— এটি জনমিতিক পরিবর্তনের একটি স্বাভাবিক ফল। এই পরিবর্তনকে সংকট হিসেবে না দেখে পরিকল্পিতভাবে মোকাবিলা করতে হবে। প্রবীণরা শুধু সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধাভোগী নন; তাদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও দক্ষতাও দেশের সম্পদ। তাই তাদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ গড়তে রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজকে এখনই সমন্বিত প্রস্তুতি নিতে হবে।
লেখক : অতিরিক্ত সচিব (অব.)
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে