প্রকৃতি কখনো পূর্বঘোষণা দিয়ে তার শক্তি প্রদর্শন করে না। মুহূর্তের একটি কম্পনেই বদলে যেতে পারে একটি শহরের চেহারা, থমকে যেতে পারে জনজীবন, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে মানুষের স্বপ্নের ঠিকানা। সম্প্রতি কলম্বিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প সেই নির্মম বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। ১০ থেকে ১৫ আগস্টের ওই দুই দেশে ভূমিকম্পে দেশ দুটির বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি, ভবনধস ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উদ্ধারকাজে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে হাজারো মানুষকে, পরবর্তী সময়ে শতাধিক আফটার শকও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
কলম্বিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ৩৪৫ জন নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় শনিবার ভোরে ইন্দোনেশিয়ার ইস্ট নুসা তেনগারা প্রদেশের ফ্লোরেস দ্বীপের কাছে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এতে বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই দুই দেশের দুর্যোগ বাংলাদেশের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা।
কারণ বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের বাইরে নয়। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ভবন, সরু সড়ক, ঘনবসতি এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা যে কত ভয়াবহ হতে পারে তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা নতুন নয়। কিন্তু দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের তৎপরতা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো ভবনের নিরাপত্তা। ভূমিকম্পে শুধু ভূকম্পনের তীব্রতাই ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করে না; ভবনের নির্মাণমান, মাটির প্রকৃতি, জনঘনত্ব, জরুরি সেবার সক্ষমতা এবং মানুষের প্রস্তুতিও বড় ভূমিকা রাখে। তাই ভবন নির্মাণ বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা এবং পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এখন আর ঐচ্ছিক বিষয় নয়। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি, নিয়মিত কাঠামোগত পরিদর্শন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কার বা অপসারণের উদ্যোগ নিতে হবে।
তবে শুধু সরকারি প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়। ভূমিকম্প মোকাবিলায় জনগণের গণসচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ানো, লিফট ব্যবহার করা কিংবা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা বিপজ্জনক। বরং ঘরের ভেতরে থাকলে ‘ড্রপ, কভার অ্যান্ড হোল্ড’, অর্থাৎ নিচু হয়ে বসা, মজবুত টেবিল বা আসবাবের নিচে আশ্রয় নেওয়া এবং তা ধরে থাকা- এ ধরনের নিরাপদ আচরণ সম্পর্কে মানুষকে প্রশিক্ষিত করতে হবে। বিদ্যালয়, কলেজ, অফিস, কারখানা ও আবাসিক এলাকায় নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া চালু করা প্রয়োজন।
প্রতিটি পরিবারকেও নিজেদের প্রস্তুতি নিতে হবে। জরুরি যোগাযোগের নম্বর, পরিবারের সদস্যদের মিলিত হওয়ার নির্দিষ্ট স্থান, প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী, প্রয়োজনীয় ওষুধ, পানি, শুকনো খাবার, টর্চ, অতিরিক্ত ব্যাটারি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের নিরাপদ সংরক্ষণ- এসব বিষয়ে আগে থেকেই পরিকল্পনা থাকা উচিত। শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা উদ্ধার পরিকল্পনাও থাকা জরুরি।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও ব্যাপক। ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স, হাসপাতাল, পুলিশ, স্থানীয় সরকার ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে। উদ্ধারকারী দলের আধুনিক সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ও দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার। বড় ভূমিকম্পের পর বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে, তাই বিকল্প ব্যবস্থা ও দ্রুত পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনাও আগেই প্রস্তুত রাখতে হবে।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দুর্যোগের সময় গুজব নয়, যাচাই করা তথ্য প্রচার করতে হবে। ভূমিকম্পের পূর্বাভাস নিয়ে অবৈজ্ঞানিক প্রচার কিংবা আতঙ্ক ছড়ানো থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে জনসচেতনতামূলক প্রচারকে নিয়মিত কর্মসূচিতে পরিণত করা প্রয়োজন।
কলম্বিয়ার সাম্প্রতিক বিপর্যয় আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে- ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব নয়, কিন্তু এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। প্রস্তুতির সময় দুর্যোগের পর নয়, দুর্যোগের আগেই। তাই ভূমিকম্পকে কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে জাতীয় নিরাপত্তা, নগর পরিকল্পনা ও জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
আজ যে প্রস্তুতি নেব, সেটিই হয়তো আগামী দিনের একটি জীবন বাঁচাবে। তাই আতঙ্ক নয়, চাই গণসচেতনতা; গুজব নয়, চাই বিজ্ঞানভিত্তিক প্রস্তুতি; দুর্যোগের পর তৎপরতা নয়, চাই দুর্যোগের আগেই কার্যকর পরিকল্পনা।
কলম্বিয়ার মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশকে এখনই প্রস্তুত হতে হবে, কারণ ভূমিকম্পের ঘড়ি কখন বাজবে তা কেউ জানে না।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও সমাজচিন্তক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/এসএকে