পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের উদ্দেশ্যেই ফুটপাথ তৈরি করা হয়। বাস্তবে রাজধানী ঢাকার ফুটপাথজুড়ে দোকানপাট। কোথাও কোথাও ফুটপাথ হয়ে ওঠে গাড়ি-মোটরসাইকেল পার্কিংয়ের স্থান। নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখার প্রবণতাও আছে। আক্ষরিক অর্থেই অনেক স্থানে পথচারীদের ফুটপাথে হাঁটার জায়গাই মেলে না। অনেক সময় ঝুঁকি নিয়ে তাদের ব্যস্ত সড়কে নামতে হচ্ছে। এতে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
ফুটপাথ দখলমুক্ত করতে মাঝেমধ্যেই অভিযান চালানো হয়। ভাঙা হয় অবৈধ স্থাপনা। মালামাল জব্দ করা হয়। জরিমানা ও মামলা হয়। কখনো কখনো দখলদারদের গ্রেফতারও করা হয়। সমস্যা হচ্ছে, উচ্ছেদ অভিযান শেষ হওয়ার দিনকয়েক পর ফুটপাথ আবার দখল হয়ে যায়। অভিযান শেষে একদিক দিয়ে বুলডোজার চলে যায়, আরেক দিক দিয়ে ফুটপাথে দখলদাররা ফিরে আসে। আবার ফুটপাথে দোকান বসে, পথচারী সড়কে নামেন। এভাবে বছরের পর বছর অভিযান চালিয়েও সমস্যার টেকসই সমাধান হচ্ছে না।
রাজধানীর মিরপুরে ফুটপাথ থেকে হকার উচ্ছেদের ঘটনার ভয়াবহতা আবারও সামনে এসেছে। ফুটপাথ উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে সেখানে হকার, সিটি করপোরেশনের কর্মী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। সিটি করপোরেশনের গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকের ওপর হামলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযানে সমন্বয়ের ঘাটতির কথা বলেছেন।
উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে মিরপুরে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে সেটা কাম্য নয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় থাকলে হয়তো অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাত এড়ানো যেত। পথচারীদের নির্বিঘ্নে চলাচলের স্বার্থে ফুটপাথ দখলমুক্ত করা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। তাদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া চলে না। তারপরও অভিযান নিয়ে কারও কোনো উদ্বেগ থাকলে সেটা আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু কোনোভাবেই হামলা করা চলে না।
উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে অতীতেও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করার আগে তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্কতার সঙ্গে পরিকল্পিতভাবে পদক্ষেপ নিতে হয়। হকারদের বিষয়টিও মানবিকভাবে দেখতে হবে। অনেক মানুষের জীবিকার প্রধান অবলম্বন ফুটপাতের ছোট ব্যবসা। তাদের উচ্ছেদ করলেই সরকারের দায় শেষ হয়ে যায় না। বিকল্প কর্মসংস্থান বা ব্যবসার জায়গা না থাকলে তারা আবার ফুটপাথে ফিরে আসবেন। অতীতে এমনটাই ঘটেছে। কাজেই শুধু এক-দুদিনের অভিযান চালিয়ে সাময়িক উচ্ছেদ করে সমস্যার টেকসই সমাধান করা যাবে না। হকারদের পুনর্বাসনের কথা ভাবতে হবে।
আবার পুনর্বাসনের নামে ফুটপাথেই হকার বসানোর ব্যবস্থা করলেও পথচারীর অধিকার নিশ্চিত হবে না। এ জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট হকার ব্যবস্থাপনা নীতি। ঢাকার সব ফুটপাথের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করা যেতে পারে। কোথায় কতটুকু ফুটপাথ আছে এবং পথচারীর জন্য ন্যূনতম কতটুকু জায়গা খালি রাখতে হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। প্রকৃত হকারদের তালিকা তৈরি করে তাদের পরিচয় যাচাই করতে হবে। একই ব্যক্তি একাধিক জায়গায় ব্যবসা করছেন কি না, সেটিও দেখতে হবে। ফুটপাথের বাইরে উপযুক্ত বিকল্প স্থানে তাদের পুনর্বাসন করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে শুধু জায়গা বরাদ্দ করলেই হবে না। সেখানে ক্রেতা আসার সুযোগ, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে।
ফুটপাথ দখলমুক্ত করার পর নিয়মিত তদারকি করা অত্যন্ত জরুরি। ফুটপাথ দখলের সঙ্গে চাঁদাবাজির যোগসূত্র আছে। এর সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। ফুটপাথ দখলের নেপথ্যের গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। না হয় ফুটপাথ দখলের অপসংস্কৃতির স্থায়ী অবসান হবে না। আমরা জোড়াতালির এমন কোনো ব্যবস্থা চাই না, যেখানে আবার ফুটপাথ দখল হয়ে যাবে, আবার তাদের উচ্ছেদ করার জন্য বুলডোজার নিয়ে হাজির হতে হবে। আমরা চাই, রাজধানীর ফুটপাথ নিয়ে দখল-উচ্ছেদের ইঁদুর-বিড়াল খেলার ইতি ঘটুক।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা