একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার জনগণ। আর সুস্থ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিকল্প নেই। দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকট চলছে।
গতকাল সময়ের আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের ১ লাখ ২৭ হাজার ১০১টি অনুমোদিত পদের মধ্যে প্রায় ৩৬ শতাংশই শূন্য। এর মধ্যে মাঠ পর্যায়ের ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে সংকট আরও প্রকট। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, কোনো কোনো চিকিৎসাকেন্দ্রে একজন স্বাস্থ্য সহকারীকে একাধিক ওয়ার্ডের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। মেডিকেল টেকনোলজিস্টের অভাবে কোনো কোনো চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগীর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। এসব কারণে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ছে।
দেশের অনেক হাসপাতালে নতুন ভবন হয়েছে, আধুনিক যন্ত্রপাতি এসেছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ হয়নি। এমনও দেখা যায় যে, হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা আছে কিন্তু অ্যানেসথেসিস্ট নেই। অ্যানেসথেসিস্টের অভাবে অস্ত্রোপচার করা যাচ্ছে না। অনেক হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ের জন্য মূল্যবান যন্ত্রপাতি রয়েছে; কিন্তু প্রয়োজনীয় টেকনোলজিস্টের অভাবে সেসব যন্ত্র কাজে লাগানো যাচ্ছে না। আবার হয়তো অ্যাম্বুলেন্স আছে, কিন্তু চালক নেই। এসব কারণে জনগণের করের টাকায় তৈরি নির্মিত অবকাঠামো বা স্থাপিত যন্ত্রপাতির সুফল মানুষ পাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের এসব বিনিয়োগ অনেক ক্ষেত্রে অপচয়ের ঝুঁকিতে পড়ে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ১১ থেকে ১৬তম গ্রেডে প্রায় ৩৭ শতাংশ পদে জনবল নেই। ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডের অবস্থা আরও খারাপ। এ চার গ্রেডে অর্ধেকের বেশি পদে জনবল নেই। এই স্তরের কর্মীরাই মূলত টিকাদান, স্বাস্থ্যশিক্ষা, রোগ নির্ণয়, প্যাথলজি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন।
মাঠ পর্যায়ের সামগ্রিক চিত্রও উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবারকল্যাণ সহকারীর বহু পদ খালি রয়েছে। টিকাদান, মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবার পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির বড় অংশ নির্ভর করে এসব কর্মীর ওপর। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকলে শুধু অবকাঠামো তৈরি করে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া যায় না।
সম্প্রতি সহকারী সার্জন ও সহকারী ডেন্টাল সার্জন নিয়োগের জন্য বিশেষ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। প্রায় পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে কেবল চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে স্বাস্থ্যসেবার সংকট মিটবে না। চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্স, মিডওয়াইফ, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, অ্যানেসথেসিস্ট, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারসহ বিভিন্ন ধরনের দক্ষ কর্মীও প্রয়োজন। দক্ষ চিকিৎসক আছে কিন্তু প্রয়োজনীয় সহায়ক জনবল নেই— এমন পরিস্থিতিতে সেবাপ্রত্যাশীদের পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়া সম্ভব হবে না।
দেশের কোন চিকিৎসাকেন্দ্রে কত জনবল প্রয়োজন, কোন পদে কী ধরনের দক্ষতা দরকার তার বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে। জনবল নিয়োগের পর তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি দ্রুত বদলাচ্ছে। ফলে কর্মীদের জ্ঞান ও দক্ষতা হালনাগাদ রাখা জরুরি। একই সঙ্গে দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় কাজ করা স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ, আবাসন ও অন্যান্য সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শূন্যপদ দ্রুত পূরণের নির্দেশ দিয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যেসব প্রশাসনিক, আইনি বা বাজেট-সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে, সেগুলো দ্রুত সমাধানের কথাও বলা হয়েছে। এই নির্দেশ যেন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তি থেকে নিয়োগ ও পদায়ন পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। স্বাস্থ্য খাতের মতো জরুরি সেবায় এমন দীর্ঘসূত্রতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। স্বাস্থ্য খাতে নিয়োগের প্রশ্নে যোগ্যতা ও দক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রশিক্ষিত ও যোগ্য বেকার স্বাস্থ্যকর্মীদের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। জনবল সংকট দূর না করে এ খাতে উন্নত সেবার প্রত্যাশা করা যায় না। একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আসল শক্তি তার দক্ষ ও পর্যাপ্ত মানবসম্পদ। তাই জনবল সংকট কাটানো স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে নিতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে