রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ড। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকার মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলার ঘটনা এই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে দুই শতাধিক ব্যক্তি সেখানে হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে ওষুধ, ভ্যাকসিন, চিকিৎসার সরঞ্জাম ও অন্যান্য সামগ্রী লুট করা হয়। পরে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবন ভেঙে ফেলা হয়।
এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারলে অপরাধীদের সাহস বাড়ে। তাই শুধু হামলাকারীদের গ্রেফতার করাই যথেষ্ট নয়। দায়িত্বে অবহেলা বা যোগসাজশের অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধেও নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, সরকার এ ব্যাপারে যথেষ্ট নজরদারি রাখছে। এরপরও বিভিন্ন মহলে এ বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে।
মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকায় প্লট দখলের চেষ্টা, আদাবরে একটি বাড়ি দখলের অভিযোগ এবং ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে রাজধানীতে এ ধরনের একাধিক ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নাগরিকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের ভেতরে আত্মশুদ্ধির উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেছে। টিআইবির বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। তবে কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু তদন্ত। তার আগে অভিযোগকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা চলে না।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর যেকোনো চেষ্টা কঠোরভাবে দমনের কথা বলেছে সরকার। সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির যে অভিযোগ করা হয়েছে সেটাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘ঢালাও মন্তব্য’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের কথা জানিয়েছেন।
মব সহিংসতার রাজনৈতিক রূপও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের মতে, সাম্প্রতিক মব সহিংসতার ধরনে পরিবর্তন এসেছে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সাম্প্রতিক হামলা, দখল ও লুটপাটের প্রতিটি ঘটনার দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। তদন্তের ভিত্তিতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পুলিশের দায়িত্ব পালনে গাফিলতি থাকলে তারও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কিশোর গ্যাং ও অপরাধে তরুণদের ব্যবহার বন্ধে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে।
দখল ও চাঁদাবাজিকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে দেওয়া যাবে না। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনে কঠোর হতে হবে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কালো টাকার প্রভাবও খতিয়ে দেখা জরুরি। বিগত সরকারের সময় অনেকে কালো টাকার মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এখন সেই কালো টাকা রাজনৈতিক বা অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক মনে করেন, এ ধরনের অর্থ সরকারকে অস্থিতিশীল করার কাজেও ব্যবহার হতে পারে। এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সুষ্ঠু তদন্ত করা ও সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।