টাউন হল ও জিয়া হল বিতর্কে লাভ-ক্ষতি

রফিউর রাব্বি

মতামত

ইতিহাসকে পক্ষে নেওয়ার রাজনৈতিক প্রয়াস নতুন নয়। কালে কালে দেশে দেশে তা হয়েছে। তবে আমরা সম্ভবত এই চর্চায় সবচেয়ে বেশিই

2026-09-30T05:07:42+00:00
2026-09-30T05:07:42+00:00
 
  বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৫ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
টাউন হল ও জিয়া হল বিতর্কে লাভ-ক্ষতি
রফিউর রাব্বি
প্রকাশ: বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:০৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ইতিহাসকে পক্ষে নেওয়ার রাজনৈতিক প্রয়াস নতুন নয়। কালে কালে দেশে দেশে তা হয়েছে। তবে আমরা সম্ভবত এই চর্চায় সবচেয়ে বেশিই অগ্রসর। কিন্তু রাজনৈতিক মিথ্যাচার সাময়িক বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারলেও আখেরে তা টেকে না। জিয়া হল নিয়ে একটা সময় শামীম ওসমান মিথ্যা ইতিহাস তৈরি করতে চেয়েছেন। একে ‘৬ দফার আঁতুড়ঘর’ বলে চালাতে চেয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জের ‘জিয়া হল’কে ‘৬ দফা ভবন’ করার দাবি জানিয়ে কিছু ভুল তথ্য হাজির করেছিলেন। 

তিনি তখন দাবি করেন, ‘নারায়ণগঞ্জের বালুরমাঠটি ৬ দফার জন্য বিখ্যাত হয়ে আছে, পরে জিয়াউর রহমান বা খালেদা জিয়া সে ইতিহাস মুছে দেওয়ার জন্য সেখানে “জিয়া হল” নির্মাণ করেছেন।’ সে সময় আমি তার এই ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে সংবাদপত্রে কিছু তথ্য তুলে ধরে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছিলাম। শামীম ওসমান সংবাদ সম্মেলন করে পরে আবার নিজের বক্তব্যের পক্ষে সাফাইও গেয়েছিলেন। 

‘ইতিহাস বিস্মৃত জাতি’ হিসেবে আমাদের একটি অপবাদ রয়েছে। আর তাই সে সময়ের প্রতিবাদ ও ৬ দফাতে এই মাঠের ভূমিকা এবং হল নির্মাণের প্রেক্ষাপটটি নতুন প্রজন্মের জানার প্রয়োজনে তুলে ধরছি। এই হল দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক চক্রে আষ্টেপৃষ্ঠে আবদ্ধ থেকেছে। কখনো ‘মুক্তিযোদ্ধা মিলনায়তন’ কখনো ‘জিয়া হল’ আবার ‘৬ দফা ভবন’ নামে পরিচিতির গ্যাঁড়াকলে পড়ে যুগের পর যুগ এই হলটি জরাজীর্ণ হয়ে থেকেছে।

৬ দফার সঙ্গে এই বালুর মাঠের সম্পর্ক কতটুকু? আদৌ এই মাঠটি ৬ দফার আঁতুড়ঘর কি না? প্রথমে এর সত্যটি জানা প্রয়োজন। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান লাহোরে চৌধুরী মোহাম্মদ আলির বাসবভনে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক সমাবেশে প্রথম ৬ দফা দাবি তুলে ধরেন। পরে ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে তিনি ৬ দফা ব্যাখ্যা করেন। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে তিনি প্রথম প্রকাশ্য জনসভায় ৬ দফা তুলে ধরেন। ১৮ মার্চ ঢাকার ইডেন হোটেলে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে ১৬ পৃষ্ঠার পুস্তিকা আকারে তা বিলি করা হয়। নারায়ণগঞ্জের বালুরমাঠে শেখ মুজিবের সমাবেশটি হয় সে বছর ৮ মে। সেখানে তিনি ৬ দফার পক্ষে বক্তৃতা করেন এবং ঢাকায় ফিরে ওই রাতেই তিনি গ্রেফতার হন। শামীম ওসমান দাবি করেন সে সময় বালুরমাঠে অনুষ্ঠিত সভায় তার বাবা একেএম শামসুজ্জোহা সভাপতিত্ব করেছেন। 

কিন্তু এ দাবিটিও সর্বৈব অসত্য। বালুর মাঠের ৮ মের সে সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন মোস্তফা সারোয়ার। সে সভায় ৬ দফার পক্ষে ৬টি সাদা কবুতর ওড়ানো হয়। মোস্তফা সারোয়ার তখন আওয়ামী লীগের শহর কমিটির সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মহিউদ্দিন আহাম্মদ খোকা। এর কিছুদিন আগে নবাবজাদা নসরুল্লাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি) গঠিত হয়। নারায়ণগঞ্জে এর কমিটি গঠন করে সে সময় একেএম শামসুজ্জোহা আওয়ামী লীগ ছেড়ে ‘পিডিপি’তে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ মুজিবুর রহমান কারাগার থেকে মুক্তি পেলে শামসুজ্জোহা আবার আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন। যার ফলে এই বালুরমাঠটিতে ৬ দফার পক্ষে সভা হয়েছিল সত্য কিন্তু এটি ৬ দফার আঁতুড়ঘর তা সত্য নয়।

নারায়ণগঞ্জের নাট্যকর্মীরা নাটক মঞ্চায়ন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য নারায়ণগঞ্জে স্থায়ী একটি মিলনায়তন নির্মাণের দাবি তুলেছিলেন ১৯৫৬ সালে। তৎকালীন স্থানীয় মহকুমা প্রশাসক আবদুস সাত্তার এ দাবির সঙ্গে একাত্ম হয়ে নারায়ণগঞ্জে একটি টাউন হল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। চাষাঢ়ার এই বালুরমাঠে টাউন হল নির্মাণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। অর্থায়নের জন্য দুই নম্বর রেল গেটের কাছে ডায়মন্ড সিনেমা হলে সপ্তাহব্যাপী নাটক প্রদর্শিত হয়। সাত দিনে তিনটি বাংলা ও একটি উর্দু নাটক প্রদর্শিত হয়। নাটকগুলো পরিচালনা করেন কাজী খালেক, আলী মনসুর, জলিল আফগানী ও আলী কাওসার। এতে অভিনয় করেন কাজী খালেক, ইনাম আহমেদ, মফিজুল ইসলাম, আবদুর রউফ, বিলকিস বারী, আনোয়ারা, পূর্ণিমা, মিনতি, নিনা হামিদ, নূর জাহানসহ পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েকজন শিল্পী। এ প্রদর্শনী থেকে ৯৬ হাজার টাকা সংগৃহীত হয়। 

এ নাট্য সপ্তাহ আয়োজনের উদ্যোক্তা ছিলেন আবদুর রউফ, স্মৃতিময় বন্দ্যোপাধ্যায়, বশির আহমেদ প্রমুখ নাট্যকর্মী। আর সে সময় টাউন হল নির্মাণের জন্য উদ্যোগী ভূমিকা রাখেন প্রশাসনের পক্ষ থেকে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক, কয়েকজন ম্যাজিস্ট্রেট এবং নারায়ণগঞ্জের হাবিব করিম, কফিলউদ্দিন আহাম্মদ, তৈয়ব কাপাটিয়া, গোলাম রব্বানী, রেজাউর রহমান প্রমুখ। কিন্তু টাউন হল নির্মাণের কাজ শুরু করা যায়নি। পরে ষাট দশকের শুরুতে আবার টাউন হল নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হয়। তবে সে সময়ও তা কার্যকর হয়নি। তখন শুধু জায়গা ক্রয়ের জন্য ডিআইটিকে ৫০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। 

স্বাধীনতার পর আবার নতুন করে টাউন হল নির্মাণের তৎপরতা শুরু হয়। ১৯৭৬ সালে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক আবদুল হাই সরকার পাঁচ লাখ টাকার তহবিল সংগ্রহ করে টাউন হলের কাজ শুরু করেন। ১৯৭৭ সালের ৮ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নারায়ণগঞ্জ পৌর মিলনায়তনে এলে নারায়ণগঞ্জের মানুষ চাষাঢ়া বালুরমাঠে ‘টাউন হল’ নির্মাণ এবং একটি হাসপাতাল তৈরির দাবি জানান। সে সভাতেই জিয়াউর রহমান এই প্রতিষ্ঠান দুটি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন এবং তখনই তিনি প্রশাসনকে টাউন হল নির্মাণের নির্দেশ দেন। 

সে বিষয়ে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক এএফএম ইমাম হোসেন, জেলা প্রশাসক এএম শওকত আলী, বিভাগীয় কমিশনার এম খানে আলম খান এবং নারায়ণগঞ্জ শহর উন্নয়ন কমিটির সদস্যদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। জিয়াউর রহমান সে বছরই টাউন হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২৫ লাখ ২০ হাজার ৯২০ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। 

এ ছাড়া আনুষঙ্গিক অন্যান্য ব্যয়ের জন্য আরও ১০ লাখ ৩৫ হাজার ৬৫৯ টাকা ছাড় করা হয়। ১৯৮১ সালের ১৯ জুলাই তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার মিলনায়তনটি উদ্বোধন করেন। কিন্তু সে বছর ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহিদ হলে এ মিলনায়তনে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ও অবদানের কথা বিবেচনা করে সরকার মিলনায়তনটির নাম ‘শহিদ জিয়া হল’ করে। হল নির্মাণ বা পরে এর নামকরণ নিয়ে কখনো কোনো প্রতিবাদ হয়নি। 

জিয়া হলটি শুরু থেকে স্থানীয় মহকুমা ও পরে জেলা প্রশাসক দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। বিগত দেড় দশক এ হলটি সম্পূর্ণ ব্যবহারের অনুপযোগী। কিন্তু কখনোই এই হলটি সাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত ছিল না। উদ্বোধন হওয়ার পর থেকে এরশাদের শাসনামলে দীর্ঘদিনই বলা চলে এটি সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ থেকেছে। পরে এরশাদ শাসনের অবসান হলেও এটি স্থানীয় সংস্কৃতিচর্চার জন্য উন্মুক্ত হয়নি। বিভিন্ন সময় সরকারি অনুষ্ঠান ব্যতীত শুরু থেকেই এই হলটি ছিল সাধারণের অধিকারের বাইরে। নামের কারণে আওয়ামী লীগের বিশ বছরের শাসনামলে এটি উপেক্ষিত থেকেছে। 

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে এই হলটিকে ‘মুক্তিযোদ্ধা মিলনায়তন’ নামে সরকারের প্রয়োজনে কখনো ব্যবহার করলেও এটি স্থানীয় সংস্কৃতিচর্চার জন্য উন্মুক্ত ছিল না। শুরু থেকে এই হলটি রাজনৈতিক বৃত্তের চক্রে যেভাবে আবদ্ধ হয়েছে তা নারায়ণগঞ্জের মানুষের জন্য মঙ্গলজনক হয়নি। শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনীতির দুষ্ট চক্র থেকে মুক্ত করা না গেলে এর সুফল সাধারণ জনগণ কখনো পায় না।

লেখক, সাংস্কৃতিক সংগঠক
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 
  বিষয়:   টাউন হল  জিয়া হল  বিতর্ক 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: