হৃদ‌‌স্বাস্থ্যে সচেতনতা : দেহঘড়ি সন্ধান করি

ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ

মতামত

হৃদ‌‌যন্ত্র থেমে গেলে থেমে যায় জীবনের ছন্দ। অথচ হৃদ‌‌রোগের ঝুঁকি অনেক সময় নীরবে তৈরি হয়। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, তামাক ব্যবহার,

2026-09-29T06:34:25+00:00
2026-09-29T06:34:25+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
বিশ্ব হৃদ‌রোগ দিবস ২০২৬
হৃদ‌‌স্বাস্থ্যে সচেতনতা : দেহঘড়ি সন্ধান করি
ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৩৪ এএম 
সময়ের আলো গ্রাফিক
হৃদ‌‌যন্ত্র থেমে গেলে থেমে যায় জীবনের ছন্দ। অথচ হৃদ‌‌রোগের ঝুঁকি অনেক সময় নীরবে তৈরি হয়। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, তামাক ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, বায়ুদূষণ কিংবা বংশগত কারণ ধীরে ধীরে হৃদ‌‌যন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে। আবার কিছু হৃদ‌‌রোগ জন্মের সময় থেকেই থাকতে পারে। তাই হৃদ‌‌রোগকে শুধু বয়স্ক মানুষের সমস্যা মনে করার সুযোগ নেই। শিশু, নারী ও পুরুষ— সব বয়সের মানুষের হৃদ‌‌স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতা প্রয়োজন।

প্রতি বছর ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হৃদ‌‌রোগ দিবস পালিত হয়। এ দিবস হৃদ‌‌রোগের ঝুঁকি, সতর্কসংকেত, প্রতিরোধ এবং সময়মতো চিকিৎসার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির সুযোগ করে দেয়। বিশ্ব হৃদ‌‌যন্ত্র ফেডারেশনের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে হৃদ‌‌যন্ত্র ও রক্তনালির রোগে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যান। হৃদ‌‌রোগের ঝুঁকি কমাতে তাই ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।

বাংলাদেশেও অসংক্রামক রোগ বড় স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশের সঙ্গে অসংক্রামক রোগের সম্পর্ক রয়েছে এবং এসব মৃত্যুর অর্ধেকেরও বেশি অকালমৃত্যু। হৃদ‌‌রোগ ও স্ট্রোক এ বোঝার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হৃদ‌‌যন্ত্র বা হৃদ‌‌যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত রক্তনালির গঠন ও কার্যক্রমে সমস্যা হলে তাকে সাধারণভাবে হৃদ‌‌রোগ বলা হয়। এটি কোনো একক রোগ নয়; বিভিন্ন রোগ ও অবস্থার সমষ্টি। কোনো হৃদ‌‌রোগ ধীরে ধীরে তৈরি হয়, আবার কোনো কোনো সমস্যা হঠাৎ গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে।

করোনারি হৃদ‌‌রোগে হৃদ‌‌যন্ত্রে রক্ত সরবরাহকারী ধমনিতে চর্বি ও অন্যান্য পদার্থ জমে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ কারণে হৃদ‌‌-আক্রমণ হতে পারে, যা জরুরি চিকিৎসার বিষয়। হৃদ‌‌যন্ত্র শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত রক্ত পাম্প করতে না পারলে হৃদ‌‌যন্ত্রের অকার্যকারিতা দেখা দিতে পারে। হৃদ‌‌স্পন্দন খুব দ্রুত, খুব ধীরে বা অনিয়মিত হলে তাকে হৃদ‌‌ছন্দের সমস্যা বলা হয়। হৃদ‌‌যন্ত্রের কপাটিকা ঠিকমতো খোলা বা বন্ধ না হলে রক্ত চলাচলে সমস্যা হতে পারে। হৃদ‌‌পেশির রোগেও হৃদ‌‌যন্ত্রের পাম্প করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে।

জন্মের সময় থেকেই হৃদ‌‌যন্ত্র বা বড় রক্তনালির গঠনগত ত্রুটি থাকলে তাকে জন্মগত হৃদ‌‌রোগ বলা হয়। শিশুদের হৃদ‌‌স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব হৃদ‌‌যন্ত্র ফেডারেশনের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রতি বছর আনুমানিক ২৩ থেকে ২৫ লাখ নবজাতক জন্মগত হৃদ‌‌রোগ নিয়ে জন্মায়। ২০২৩ সালে বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ জন্মগত হৃদ‌‌রোগ নিয়ে বসবাস করছিলেন। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এ রোগের বোঝা তুলনামূলক বেশি।

শিশুর জন্মগত হৃদ‌‌রোগের লক্ষণ হিসেবে দুধ খাওয়ানোর সময় দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, বারবার শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, বয়স অনুযায়ী ওজন বা শারীরিক বৃদ্ধি না হওয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে ঠোঁট বা ত্বক নীলচে হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তবে সব শিশুর ক্ষেত্রে একই লক্ষণ দেখা যায় না। কোনো কোনো ছোট হৃদ‌‌যন্ত্রের ত্রুটি উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে এবং অন্য কোনো পরীক্ষা করতে গিয়ে তা ধরা পড়তে পারে। তাই সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।

পুরুষদের ক্ষেত্রে তামাক ব্যবহার, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে ক্ষতিকর চর্বির মাত্রা বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস হৃদ‌‌রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কাজের চাপ ও অনিয়মিত জীবনযাপনও অনেকের স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলার পথে বাধা সৃষ্টি করে। তাই শুধু অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরিবর্তে নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তে চর্বির মাত্রা পরীক্ষা করা দরকার।

নারীর হৃদ‌‌স্বাস্থ্যকেও আলাদা গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। হৃদ‌‌রোগের ক্ষেত্রে নারীদের উপসর্গ সবসময় একই রকম নাও হতে পারে। বুকের অস্বস্তির পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা, পিঠ বা চোয়ালে অস্বস্তির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা ও গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ভবিষ্যতের হৃদ‌‌স্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আগে থেকে হৃদ‌‌রোগ বা জন্মগত হৃদ‌‌রোগ থাকা নারীর গর্ভধারণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বিশেষভাবে প্রয়োজন।

হৃদ‌‌রোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে ক্ষতিকর চর্বির মাত্রা বৃদ্ধি, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত লবণ ও চিনি গ্রহণ, অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার, বায়ুদূষণ এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ। এসব ঝুঁকির অনেক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও তামাক ব্যবহার, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও বায়ুদূষণকে অসংক্রামক রোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছে।

বুকে হঠাৎ চাপ বা অস্বস্তি শুরু হয়ে কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী হলে, অথবা এর সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ঘাম, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা বা বমি বমি ভাব থাকলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। ব্যথা বা অস্বস্তি শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়লেও দেরি করা উচিত নয়। হৃদ‌‌রোগ অনিয়ন্ত্রিত থাকলে হৃদ‌‌যন্ত্রের অকার্যকারিতা, গুরুতর হৃদ‌‌ছন্দের সমস্যা, মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলের সমস্যা, কিডনির ক্ষতি কিংবা ফুসফুসে তরল জমার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। কিছু হৃদ‌‌রোগে রক্ত জমাট বেঁধে মস্তিষ্কে পৌঁছানোর ঝুঁকিও বাড়তে পারে। ফলে হৃদ‌‌রোগের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ ও
যথাযথ চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্ট্রোকও জরুরি চিকিৎসার বিষয়। মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, এক হাত বা পা দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া এবং কথা জড়িয়ে যাওয়া বা কথা বলতে সমস্যা হওয়া— এসব স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। এমন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। স্ট্রোকের ধরন ও কারণ নির্ণয়ে চিকিৎসকরা রোগীর লক্ষণ ও ইতিহাসের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী মস্তিষ্কের ইমেজিং, রক্ত পরীক্ষা, ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাম বা ক্যারোটিড ডপলারসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করতে পারেন।

হৃদ‌‌রোগের সব কারণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে জীবনযাপনের মাধ্যমে অনেক ঝুঁকি কমানো যায়। তামাক বর্জন, খাবারে অতিরিক্ত লবণ ও চিনি কমানো, অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার সীমিত করা, শাকসবজি, ফলসহ সুষম খাবার গ্রহণ, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা জরুরি।

একই সঙ্গে রক্তচাপ, রক্তে শর্করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তে চর্বির মাত্রা পরীক্ষা করতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। শিশুদের ক্ষেত্রে জন্মগত হৃদ‌‌রোগের সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞ বা হৃদ‌‌রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নারীদের গর্ভাবস্থায় রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং আগে থেকে হৃদ‌‌রোগ থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। হৃদ‌‌রোগ প্রতিরোধকে শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসকের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে হবে না। পরিবারে স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস তৈরি করা, শিশুদের খেলাধুলায় উৎসাহ দেওয়া, কর্মজীবীদের নিয়মিত হাঁটা বা শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করা, তামাকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সহজলভ্য স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করা— সবকিছু মিলেই হৃদ‌‌স্বাস্থ্য সুরক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

হৃদ‌‌রোগ কোনো নির্দিষ্ট বয়স, লিঙ্গ বা শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিশুর জন্মগত হৃদ‌‌রোগ, পুরুষের জীবনযাপন ও বিপাকীয় ঝুঁকি এবং নারীর বিশেষ শারীরবৃত্তীয় ও গর্ভকালীন ঝুঁকি— সবকিছুকেই হৃদ‌‌স্বাস্থ্যের সামগ্রিক আলোচনায় আনতে হবে।

বিশ্ব হৃদ‌‌রোগ দিবস ২০২৬ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, হৃদ‌‌যন্ত্রের যত্ন শুরু করতে অসুস্থ হওয়ার অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। আজ থেকেই তামাক বর্জন, পরিমিত ও সুষম খাবার, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। বুকের অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো গুরুতর সতর্কসংকেত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। সচেতন পরিবার, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং সময়মতো চিকিৎসা হৃদ‌‌রোগের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। হৃদ‌‌যন্ত্রের প্রতিটি স্পন্দন মূল্যবান। তাই নিজের, পরিবারের এবং আগামী প্রজন্মের হৃদ‌‌স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আজ থেকেই সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে
  বিষয়:   হৃদ‌‌স্বাস্থ্যে সচেতনতা  দেহঘড়ি  বিশ্ব হৃদ‌রোগ দিবস ২০২৬  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: