নিজের সন্তানের শিক্ষার জন্য প্রতিটি পরিবার যখন সবচেয়ে যোগ্য শিক্ষক খোঁজেন, তখন নিজ এলাকার উন্নয়ন ও সেবার দায়িত্ব একজন অনভিজ্ঞ ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন মানুষের হাতে তুলে দেওয়া কোনো সুবিবেচনা হতে পারে না। স্থানীয় নেতৃত্বে শিক্ষার মানদণ্ড নিশ্চিত করা নাগরিককে বঞ্চিত করা নয়, বরং তৃণমূলের গণতন্ত্র ও জনগণের করের টাকাকে অপচয় ও ছায়া প্রশাসন থেকে মুক্ত রাখার কার্যকর আত্মরক্ষা।
পবিত্র কুরআনের প্রথম যে বাণী রাসুলুল্লাহর (সা.) ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল, তার মূল নির্দেশনাই ছিল ‘পড়ো’— ইকরা। সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টার এই প্রথম আহ্বানটি কেবল জ্ঞানচর্চার তাগিদ নয়, যেকোনো সমাজ বিনির্মাণের মৌলিক শর্ত। যুগ যুগ ধরে দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরাও একই কথা বলে গেছেন। আব্রাহাম লিংকনের মতে, অজ্ঞতা মানুষকে কখনোই সুরক্ষা দেয় না; বরং প্রতিটি পদক্ষেপে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। রাজা রামমোহন রায়ের চিন্তার মূল সুরও ছিল এটি— শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
অথচ আমাদের রাষ্ট্রকাঠামোয় জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সেই শিক্ষাকে ঠিক কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম স্পষ্ট জানিয়ে দেন— ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ও চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা পরিষদ কিংবা সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য কোনো ধরনের শিক্ষাগত যোগ্যতার আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তো দূরের কথা, কেবল স্বাক্ষরজ্ঞানহীন কোনো ব্যক্তিও আইনত কোটি নাগরিকের স্থানীয় অভিভাবক হতে পারেন।
রাষ্ট্র যখন বলে জনপ্রতিনিধি হতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জরুরি নয় তখন এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই— আমরা কি তৃণমূলের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করছি, নাকি আধুনিক সেবা ব্যবস্থাপনাকে অদক্ষতার ঝুঁকিতে ফেলছি?
অনেকে যুক্তি দেন, জাতীয় সংসদে সাংসদ হতে সংবিধানে কোনো সুনির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত নেই; তা হলে স্থানীয় সরকারে কেন তা চাপানো হবে? সর্বজনীন ভোটাধিকার যেখানে গণতন্ত্রের মূল কথা, সেখানে শিক্ষার শর্ত জুড়ে দিলে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
তাত্ত্বিকভাবে যুক্তিটি গণতান্ত্রিক মনে হলেও, মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন। একটি ইউনিয়ন পরিষদের সচিব, প্রকৌশলী বা হিসাবরক্ষক পদে নিয়োগ পেতে নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন হয়। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানের যিনি শীর্ষ নীতিনির্ধারক, যার স্বাক্ষরে সরকারি বরাদ্দ বা উন্নয়ন বাজেট ছাড় হয়, তার যদি প্রশাসনিক নথি বা অডিট আপত্তি বোঝার মতো ন্যূনতম প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান না থাকে, তবে ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার নিছক কোনো রাজনৈতিক আলঙ্কারিক পদ নয়। সাড়ে চার হাজারের বেশি ইউনিয়ন পরিষদ, প্রায় ৫০০ উপজেলা, ৬৪টি জেলা পরিষদ এবং শহর এলাকার পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন সরাসরি নাগরিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত। ডিজিটাল জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, বয়স্ক ও বিধবা ভাতার তালিকা তৈরি, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা ই-টেন্ডারিংয়ের মতো কাজগুলো এখন আর গতানুগতিক কাগুজে ফাইলে সীমাবদ্ধ নেই।
এর বাইরে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের ‘গ্রাম আদালত’ পরিচালনা করতে হয়। স্থানীয় পর্যায়ের দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিরোধ নিষ্পত্তিতে বিচারকের ভূমিকায় বসেন চেয়ারম্যান। যিনি দেশের আইন, নাগরিকের মৌলিক অধিকার বা সাক্ষ্যপ্রমাণের নথিপত্র নিজে পড়ে মূল্যায়ন করতে পারেন না, তার পক্ষে সুবিচার নিশ্চিত করা কতটা বাস্তবসম্মত? ঠিক এই জায়গা থেকেই স্থানীয় সরকারে জন্ম নেয় এক ধরনের ‘ছায়া প্রশাসন’।
বাস্তবতা হলো, একজন অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত জনপ্রতিনিধি যখন জটিল সরকারি নীতিমালা ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেন না, তখন নীতিনির্ধারণের রাশ চলে যায় একশ্রেণির অসৎ কর্মচারী কিংবা স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। নির্বাচিত প্রতিনিধির অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে নথিপত্রে কারচুপি এবং বরাদ্দের নয়ছয় ঘটে। ফলে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কার্যত কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের কাছেই জিম্মি হয়ে পড়ে।
অনেকে পাল্টা যুক্তি দিতে পারেন, ডিগ্রি থাকলেই মানুষ সৎ হয় না; বহু উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিও তো দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত। কথাটি সত্য হলেও এটি পুরো চিত্র নয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সততার নিশ্চয়তা না-ও দিতে পারে, তবে তা কার্যকর জবাবদিহির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। একজন শিক্ষিত জনপ্রতিনিধি অন্তত উন্নয়ন বাজেটের খুঁটিনাটি বুঝতে পারেন, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ফাঁকফোকর ধরতে পারেন এবং কর্মচারীদের ওপর অন্ধ নির্ভরতা এড়াতে পারেন।
উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য বা কানাডায় স্থানীয় সরকারে শিক্ষাগত যোগ্যতার আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।
কারণ সেখানকার রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীল পদে অভিজ্ঞ ও যোগ্য ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেয়, আর ভোটাররাও যাচাই-বাছাই ছাড়া ভোট দেন না।
কিন্তু আমাদের দেশে যখন সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নির্বাচনি বাছাই প্রক্রিয়া গড়ে ওঠেনি, তখন রাষ্ট্রকেই যোগ্যতার একটি প্রাথমিক মানদণ্ড নির্ধারণের উদ্যোগ নিতে হবে।
ডিজিটাল রূপান্তর ও নাগরিক সেবার আধুনিকায়নে রাষ্ট্র যখন প্রতি বছর বিপুল বরাদ্দ দিচ্ছে, প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত উপবৃত্তি ও প্রণোদনা দিচ্ছে, তখন স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ পদের যোগ্যতাকে অর্ধশতক আগের বাস্তবতায় আটকে রাখা আত্মঘাতী।
এই স্থবিরতা কাটাতে স্থানীয় সরকার আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা যেতে পারে :
১. ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদের জন্য ন্যূনতম এসএসসি বা সমমান এবং চেয়ারম্যান ও মেয়র পদের জন্য ন্যূনতম এইচএসসি পাস বাধ্যতামূলক করা যায়।
২. নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জন্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব লোকাল গভর্নমেন্টের (এনআইএলজি) মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন, বাজেট ব্যবস্থাপনা ও গ্রাম আদালতের ওপর বাধ্যতামূলক সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা জরুরি।
নিজের সন্তানের শিক্ষার জন্য প্রতিটি পরিবার যখন সবচেয়ে যোগ্য শিক্ষক খোঁজেন, তখন নিজ এলাকার উন্নয়ন ও সেবার দায়িত্ব একজন অনভিজ্ঞ ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন মানুষের হাতে তুলে দেওয়া কোনো সুবিবেচনা হতে পারে না। স্থানীয় নেতৃত্বে শিক্ষার মানদণ্ড নিশ্চিত করা নাগরিককে বঞ্চিত করা নয়, বরং তৃণমূলের গণতন্ত্র ও জনগণের করের টাকাকে অপচয় ও ছায়া প্রশাসন থেকে মুক্ত রাখার কার্যকর আত্মরক্ষা।
লেখক : সাহিত্যকর্মী
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে