হিন্দি, বাংলা, তামিল, তেলেগু সিনেমায় আমরা প্রায়ই এমন দৃশ্য দেখি— প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে কারও বাড়ি বা জায়গা দখল করছে। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে উপেক্ষা করে বুলডোজার, এস্কেভেটর দিয়ে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অস্ত্রের মহড়া দিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এলাকা বা বাড়িঘর দখল করে নেওয়া হচ্ছে। সিনেমার সেই দৃশ্য এখন বাস্তবেও দেখতে হচ্ছে আমাদের। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, দখল ও চাঁদাবাজির ঘটনায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সম্প্রতি ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া, আদাবরে বাড়ি দখলের চেষ্টা এবং ইসিবি চত্বরে একটি হাউজিংয়ে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওসহ কয়েকটি স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, ডাকাতি ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধ নিয়ে জনমনে যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে, এসব ঘটনা তার সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মিরপুর-১-এর রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি হঠাৎ গড়ে ওঠা কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। ১৯৭৪ সাল থেকে এটি সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করে আসছে। মধ্যরাতে এক দল দুর্বৃত্ত এস্কেভেটর এনে কেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেয়। অভিযোগ রয়েছে, হামলাকারীরা নিরাপত্তাকর্মীদের বেঁধে রেখে কয়েক ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব ও লুটপাট চালায়। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটির চিকিৎসা সরঞ্জাম, জেনারেটর, এসি, ফ্রিজ, ওষুধ ও টিকা লুট করা হয়েছে। শিশুদের টিকাদানের রেকর্ড রাখা ট্যাব ও রেজিস্টার খাতাও নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনাটি আরও উদ্বেগজনক এ কারণে যে, হামলাটি রাজধানীর একটি থানার কাছাকাছি এলাকায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে ঘটেছে। কেন্দ্রের পক্ষ থেকে পুলিশকে খবর দেওয়ার পরও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি। প্রাথমিক তদন্তে দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়ায় শাহ আলী থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে শুধু একজন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করলেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হতে পারে না। কেন পুলিশ সময়মতো ঘটনাস্থলে গিয়ে হামলা বন্ধ করতে পারেনি তা নিরপেক্ষ তদন্তে বের করে আনতে হবে।
এই ঘটনায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছে। এখন পর্যন্ত যাদের আটক করা হয়েছে, তাদের মধ্যে অনেকে অর্থের বিনিময়ে ভাঙচুর ও লুটপাটে অংশ নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি ও একজন সংসদ সদস্যসহ যাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে, তদন্তের মাধ্যমে তা যাচাই করতে হবে। অভিযোগ সত্য হলে দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনা না করে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনায় শুধু একটি ভবন বা কিছু সরঞ্জাম নষ্ট হয়নি; এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবায়। টিকার সংরক্ষণ ও রেকর্ড নষ্ট হলে শিশুদের পরবর্তী টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে। আলট্রাসনোগ্রামসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ায় দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের গর্ভবতী নারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির সময়ের সঙ্গে ঘটনাটি মিলে যাওয়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা করে সংশ্লিষ্ট এলাকার শিশু ও মায়েদের সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
এ ধরনের ঘটনা মিরপুরেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীর ইসিবি চত্বরে একটি হাউজিংয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদির তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে তার স্টুডিওর চেয়ার, টেবিল, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন আসবাব ও সরঞ্জাম ভাঙচুরের চিত্র দেখিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে হামলা হয়েছে।
পুলিশ অবশ্য বলেছে, এর পেছনে চাঁদাবাজি নয়, জমি নিয়ে বিরোধ ছিল। বিষয়টি যে কারণেই ঘটুক, কোনো বিরোধের সমাধান সন্ত্রাস, ভাঙচুর বা জোরপূর্বক দখলের মাধ্যমে হতে পারে না। এ ধরনের ঘটনায় নাগরিকের সম্পদ ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশি ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মব সহিংসতাও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নাগরিকরা স্বাভাবিকভাবেই আশা করেছিলেন, পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে। সরকারের প্রথম দিকের অগ্রাধিকারের মধ্যেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির কথা বলা হয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও মব সহিংসতার অবসানের কথা বলেছিলেন। সে ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া, বাড়ি দখলের চেষ্টা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার মতো ঘটনা কীভাবে ঘটছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
একটি গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে আইন নিজের হাতে তুলে নিলে তা রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের বিষয়। কোথাও কোনো দলীয় নেতা বা জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি বা হামলার অভিযোগ উঠলে দলীয় শাস্তির পাশাপাশি আইনি তদন্তও নিশ্চিত করতে হবে। কোনো নেতাকে বহিষ্কার করা বিচারের বিকল্প হতে পারে না। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে অপরাধের ধরন অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াই হবে যথাযথ পথ।
সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনাও একই প্রশ্ন সামনে আনে। একজন নাগরিক নিজের উদ্যোগে ব্যবসা বা সৃজনশীল কাজ করতে গিয়ে যদি চাঁদাবাজ বা সন্ত্রাসীদের ভয় পান, তা হলে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। রাজনৈতিক পরিচয় বা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির আশ্রয় ছাড়া একজন নাগরিকের নিজের সম্পদ ও প্রতিষ্ঠান রক্ষা করতে না পারা কোনো সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল জবাবদিহি, আইনের শাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও যদি দখলদারি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও বিচারহীনতার অভিযোগ অব্যাহত থাকে, তা হলে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু নাগরিকের নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং অপরাধের বিচার নিয়ে কোনো আপসের সুযোগ থাকা উচিত নয়।
সরকারের সামনে তাই কয়েকটি জরুরি প্রশ্ন রয়েছে। কেন রাজধানীর মতো এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা চলল? কেন পুলিশ সময়মতো তা বন্ধ করতে পারল না? দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না? একই ধরনের অভিযোগ দেশের অন্য এলাকাতেও থাকলে সেগুলোর তদন্ত কীভাবে হবে? আর রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দ্রুত কীভাবে পুনরায় চালু করা হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু বক্তব্য বা দলীয় বিবৃতিতে মিলবে না। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা এবং প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা। অপরাধী যে দলেরই হোক, তার রাজনৈতিক পরিচয় যেন অপরাধের ঢাল না হয়। একই সঙ্গে পুলিশ ও প্রশাসনের কোনো সদস্য দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
মানুষ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনের প্রত্যাশা করে। তারা চায় নিজের বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সম্পদের নিরাপত্তা, চায় সন্তানদের নিরাপদ পরিবেশ, চায় বিরোধের সমাধান আইনের মাধ্যমে। এই মৌলিক প্রত্যাশাগুলো পূরণ করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
দেশের মানুষ এমন একটি বাংলাদেশ চায়, যেখানে ক্ষমতাবান কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না, দুর্বলের সম্পদ দখল করা যাবে না এবং রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধের সুরক্ষা হয়ে উঠবে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো— দখলদারি, চাঁদাবাজি, হামলা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে। এই পরীক্ষায় সাফল্যের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি কার্যকর প্রশাসন, জবাবদিহি এবং আইনের সমান প্রয়োগ জরুরি।
সাবেক ব্যাংকার
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি